সাবেক মেয়রদের আমলে বিভিন্ন ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে অসম চুক্তিতে করা ৫টি মার্কেট নিয়ে বেকায়দায় রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। এই মার্কেট নির্মাণে ১০০ কোটি টাকার লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছে সংস্থাটিকে। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে নতুন করে চুক্তিতে সমতা আনতে চায় সিটি করপোরেশন।
জানা গেছে, মার্কেটগুলোর সঙ্গে চুক্তি করা ৫টি কোম্পানির সঙ্গে প্রাথমিক বৈঠক করেছে ডিএনসিসি। ডেভেলপার কোম্পানিগুলোকে করপোরেশনের পক্ষ থেকে পুনরায় চুক্তির প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। সুরাহ না হলে এ বিষয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যৌক্তিক হারে মার্কেটগুলোর শেয়ার পুনঃমূল্যায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে।
জানতে চাইলে ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, চুক্তিতে অনেক অসমতা রয়েছে। করপোরেশন কীভাবে এমন কম হিস্যা নিয়ে চুক্তি করেছিল বুঝতে পারছি না। চুক্তিতে যা ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি তলার ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ১৪ তলার চুক্তিতে ২৪ তলা করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমি ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে কথা বলেছি। তারা কীভাবে আমাদের শেয়ার বাড়িয়ে দেবে সে বিষয়ে জানাবে বলে আশ্বস্ত করেছে। তাদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে আমরা পরবর্তী ব্যবস্থা নেব। এক্ষেত্রে আগাম প্রস্তুতি হিসেবে আইনগত মতামত দিতে সংস্থার আইন কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট মঞ্জিল মোর্শেদ জানান, এই চুক্তিতে সিটি করপোরেশনের নাগরিক স্বার্থ বিসর্জন দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় বিষয়টি নিয়ে মামলা হতে পারে। আর নাগরিকদের স্বার্থ বিলিয়ে দেয়ার কারণে দুর্নীতি দমন আইনে দায়ীদের শাস্তি হতে পারে। কারণ ডেভেলপার কোম্পানি ও জমির মালিকের মধ্যে নিয়ম অনুয়ায়ী চুক্তি হয়নি। তিনি বলেন, এক্ষেত্রে চাইলে সিটি করপোরেশন চুক্তি বাতিলও করতে পারে। যেহেতু জমিতে ভবন হয়ে গেছে সে ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ আদালতে মামলা করতে পারে।
ডিএনসিসির আইন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সাকাপি ইবনে সাজ্জাদ বলেন, আমি নতুন এসেছি এ বিষয়ে তেমন কিছু জানি না। তবে ভবন মালিকদের সঙ্গে করপোরেশনের কথা হয়েছে। তারা সময় চেয়েছেন, পরিস্থিতি বুঝে আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে।
ডিএনসিসির কর্মকর্তারা জানান, পাঁচটি মার্কেট নির্মাণের জন্য ৫টি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে ডিএনসিসি। ভবনগুলো হচ্ছেÑ বনানী সুপার মার্কেট, গুলশান-২-এর গুলশান সেন্টার পয়েন্ট, গুলশান-১-এর গুলশান ট্রেড সেন্টার, রায়েরবাজার ডিসিসি কমার্শিয়াল কাম-অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স ও মোহাম্মদপুর টাউন হল কাঁচাবাজারের স্থানে বহুতল বাণিজ্যিক কাম আবাসিক ভবন (প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় পর্যায়)। সিটি করপোরেশন বিভক্ত হওয়ার পর এসব মার্কেট ডিএনসিসি এলাকায় পড়েছে।
সর্বশেষ ২০১৩-১৪ অর্থবছরের নিরীক্ষায় অডিট বিভাগ এসব চুক্তিতে নানা অসংগতি ও অনিয়ম চিহ্নিত করেছে। চুক্তির নমুনা দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যাবে ডেভেলপার কোম্পানিকে সুবিধা দিতেই এসব চুক্তি করা হয়েছে। খোদ সরকারের অডিট অধিদপ্তর এই চুক্তিতে অনিয়ম হয়েছে উল্লেখ করে আপত্তি জানিয়েছে। পাশাপাশি তদন্ত কমিটি গঠন করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তি নির্ধারণের সুপারিশও করেছে।
কর্মকর্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গুলশান এলাকায় ব্যক্তি মালিকানায় ডেভেলপার দিয়ে যেসব স্থাপনা হয় সেখানে ৫০ ভাগ মালিকানা ভাগাভাগি করা হয়। আবার জমির মালিক সাইনিং মানি হিসেবেও কাঠা প্রতি বিপুল পরিমাণ অর্থ পায়। কিন্তু সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো। গুলশান-১ এ বাণিজ্যিক এলাকার জমির মালিককে (উত্তর সিটিকে) মাত্র ৩৭ ভাগ দেয়া হয়েছে। এটা একেবারেই অযৌক্তিক। তবে ডেভেলপার কোম্পানির বক্তব্য এসব মার্কেটের চুক্তিগুলো যখন করা হয়েছিল তখন ৫০ ভাগ ভাগাভাগির নিয়ম ছিল না। তাছাড়া চুক্তিগুলো প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় হিসেবে স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমোদন নেয়ার কথা থাকলেও তা মানা হয়নি।
পলাতক চুক্তিকারী প্রকৌশলী : সূত্র জানায়, এসব মার্কেট নির্মাণের চুক্তি করেছেন সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মোজাফফর আহমদ। বর্তমানে এ প্রকৌশলী কানাডায় বসবাস করছেন। এসব প্রকল্পের চুক্তিতে সরকারের শত কোটি টাকা গচ্চা যাওয়ার মতো ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে দেশ ছাড়েন তিনি।
বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ : বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ ৪৪নং দাগের ৬০ কাঠা জমিতে ১৬তলা ফাউন্ডেশনসহ তিনতলা মার্কেট ভবন ও একটি বেইসমেন্টসহ ১৩তলা ভবন নির্মাণে ২০০৬ সালের ৭ মে বোরাক রিয়েল এস্টেট কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে। বরাদ্দযোগ্য এবং বিক্রয়যোগ্য আয়তনের মধ্যে ডিএনসিসির হিস্যা ৩০ শতাংশ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ৭০ শতাংশ পাবে।
গুলশান-১ এর গুলশান ট্রেড সেন্টার : বহুতল শপিং এবং কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স ‘সিটি ট্রেড সেন্টার’ নির্মাণের জন্য ২০০৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর আমিন এসোসিয়েটস ওভারসিস কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি সই করে সিটি করপোরেশন। এখানে ডিএনসিসির ৩৭ শতাংশ ও ডেভেলপার কোম্পানির ৬৩ শতাংশ।
গুলশান-২ এর গুলশান সেন্টার পয়েন্ট : গুলশান সেন্টার পয়েন্ট নির্মাণের জন্য ২০০৬ সালের ৩ মে বসুন্ধরা সিটি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি হয়। সেখানেও ৭০ ভাগের বেশি ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠান আর বাকিটা করপোরেশনের। এখানে ডিএনসিসির ২৫ শতাংশ আর ডেভেলপার কোম্পানির ৭৫ শতাংশ।
মোহাম্মদপুর টাউন হল সংলগ্ন কাঁচাবাজার : ডিসিসি মোহাম্মদপুর টাউন হল সংলগ্ন কাঁচাবাজারের ১০ বিঘা বা ২০০ কাঠা জমিতে বহুতল বিশিষ্ট কমার্শিয়াল কাম অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স নির্মাণে ২০১০ সালের ৪ এপ্রিল এম আর ট্রেডিং কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে। এতে ডেভেলপার কোম্পানির হিস্যা ৭০ শতাংশ এবং ডিএনসিসির ৩০ শতাংশ।
রায়েরবাজার ডিসিসি কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স : রায়েরবাজারে ডিসিসি মার্কেটের স্থলে বহুতল বিশিষ্ট ‘রায়েরবাজার ডিসিসি কমার্শিয়াল কাম অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স’ নির্মাণে ২০১১ সালের ২৪ নভেম্বর ডেভেলপার এম আর ট্রেডিং কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে। এতে এম আর ট্রেডিং কোম্পনি জমির মালিকানাসহ ৭৫ ভাগ জমির ওপর নির্মিত একটি ভবনের মালিক হবেন। অন্যদিকে ডিএনসিসি ১টি ভবনের মালিক হবেন।
ডিএনসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা (উপসচিব) মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ মিয়া বলেন, এ মার্কেটগুলোর চুক্তি অনেক আগেই হয়েছে। এ সবই সম্পত্তি বিভাগ থেকে প্রক্রিয়া করা হয়েছে। আমরা নথিপত্র ঘেঁটে দেখেছি, চুক্তিতে অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। আমরা সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানিয়েছি, দিকনির্দেশনা পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।