শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:২৪ পূর্বাহ্ন

ইহসান মানব চরিত্রের অমূল্য সম্পদ

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২০
  • ৫৫ জন নিউজটি পড়েছেন

মানব চরিত্রে ইহসান একটি অনন্য গুণ হিসেবে বিবেচিত। ইহসানই মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাতের মর্যাদা দান করেছে। ব্যক্তিগত, সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে ইহসানের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। ইহসানের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায়। ইহসান অবলম্বনকারী লোকদের আল্লাহ তায়ালা অধিক পছন্দ করেন। কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে, ‘তোমরা ইহসান করো। কেননা আল্লাহ ইহসানকারীদের ভালোবাসেন।’ (সূরা বাকারা : ১৯৫) তোমরা এহসান করো’Ñ এখানে সব ধরনের ইহসান
অন্তর্ভুক্ত। কেননা এটি বিশেষ কোনো বস্তুর সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া হয়নি। অতএব সম্পদের ক্ষেত্রে ইহসান, সম্মানের ক্ষেত্রে ইহসান ও শাফায়াতের ক্ষেত্রে ইহসান সবই শামিল। (তাফসিরে সা’দী, পৃ: ৭৪)
‘ইহসান’ শব্দের অর্থ : ভালোভাবে কোনো কাজ সম্পন্ন করা, উত্তমরূপে আদায় করা, ভালো আচরণ করা ইত্যাদি। ইহসান হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভের চরম শিখর ও পরম অবস্থা।
আবু হুরায়রা রা: বর্ণনা করেন, ‘একদা রাসূল সা: জনসমক্ষে বসা ছিলেন, এমন সময় তাঁর কাছে এক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করল, ‘ঈমান কী?’ তিনি বললেন, ঈমান হলো, আপনি বিশ্বাস করবেন আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাগণের প্রতি, কিয়ামতের দিবসে তাঁর সাথে সাক্ষাতের প্রতি এবং তাঁর রাসূলের প্রতি। আপনি আরো বিশ্বাস রাখবেন মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের প্রতি। আগন্তুক জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইসলাম কী?’ তিনি বলেন, ইসলাম হলো, আপনি আল্লাহর ইবাদত করবেন এবং তাঁর সাথে শরিক করবেন না, সালাত কায়েম করবেন, জাকাত প্রদান করবেন এবং রমজান মাসে রোজা পালন করবেন। ওই ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইহসান কী?’ তিনি বললেন, আপনি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবেন, যেন আপনি তাঁকে দেখছেন, আর যদি আপনি তাঁকে নাও দেখতে পান, তবে নিশ্চয় আল্লাহ আপনাকে দেখছেন। (সহিহ বুখারি : ৪৮)

কুরআন ও হাদিসে ইহসানের তিনটি রূপ পাওয়া যায়। এক. আল্লাহ ও বান্দার মাঝে ইহসান। দুই. বান্দা ও অন্যদের মাঝে ইহসান। তিন. বান্দার প্রতিটি কর্মের মাঝে ইহসান।
আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে ইহসান হচ্ছে দ্বীনের সর্বোচ্চ মান। বান্দার ও আল্লাহর অন্যান্য সৃষ্টির মধ্যে ইহসানের বিভিন্ন পর্যায় রয়েছ। কোনো কোনো ইহসান বান্দার অবশ্য করণীয় কর্তব্য হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, আর তার সাথে কিছুই শরিক করো না। সদয় আচরণ করো মাতা-পিতার প্রতি, আত্মীয়স্বজন, ইয়াতিম, বিত্তহীন, আত্মীয় প্রতিবেশী ও অনাআত্মীয় প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব, সঙ্গী-সাথী, মুসাফির ও তোমাদের মালিকানাধীন ক্রীতদাস-দাসীদের প্রতি।’ (সূরা নিসা : ৩৬)
ওই আয়াতে মুমিনদের প্রতি মাতা-পিতার প্রতি ইহসান বা সদয় আচরণ করা অত্যাবশ্যকীয় ঘোষণা করে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া অনাথ অসহায় ও আর্তপীড়িতের প্রতি সাহায্য-সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে ইহসান করার জন্য মুমিনদের বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। এমনকি মানুষের সাথে সুন্দর ও শালীন ভাষায় কথোপকথনের গুরুত্ব দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা মানুষের উদ্দেশে সুন্দরভাবে কথা বলো।’ (সূরা বাকারা : ৮৩) এ বিষয়ে রাসূল সা: বলেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের সাথে সাক্ষাতের সময় মুচকি হাসি দেয়াও তোমার জন্য সাদাকার সওয়াব নিশ্চিত করে।’ (বুখারি ও মুসলিম)
প্রতিটি কাজকর্মে ইহসান প্রসঙ্গে প্রিয়নবী সা: বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করলে সেখানেও ইহসান অবলম্বন করতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব এবং কম কষ্ট দিয়ে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে। শুধু মানুষ নয়, এমন কি প্রয়োজনের কারণে যখন পশু কোরবানি বা জবাই করতে হয়, তখন তাদের প্রতি সদয় হতে বলা হয়েছে। কষ্ট দিয়ে সময়ক্ষেপণ করে ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে কোনো পশু জবাই করা শরিয়তসম্মত নয়। কোনো প্রাণী জবাই করতে গেলে ইহসানের সাথে জবাই করতে হবে। তোমরা তোমাদের ছুরিটাকে অবশ্যই ধারালো করে নেবে, যাতে জবাইকৃত প্রাণীর কষ্ট কম হয়।’ (মুসলিম)
ইহসান অর্থ সদাচরণ, ক্ষমা ও মাফ করা, অনুগ্রহ করা। ওয়াজিব (প্রাপ্য) অধিকারের চেয়ে বেশি দেয়া বা ওয়াজিব (কর্তব্য) কাজের অধিক করা। যেমন কোনো শ্রমিকের পারিশ্রমিক ঠিক হয়েছে ১০০ টাকা, কিন্তু দেয়ার সময় একশত দশ বা বিশ টাকা দেয়া। একশত টাকা দেয়া এটি ওয়াজিব (প্রাপ্য) অধিকার, আর এটাই সুবিচার, আরো ১০-২০ টাকা বেশি দেয়া এটাই হলো ইহসান বা অনুগ্রহ। সুবিচার দ্বারা সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু সদাচরণ ও অনুগ্রহ প্রদর্শন দ্বারা সমাজে অধিক সৌন্দর্য, সৌহার্দ্য ত্যাগ-তিতিক্ষার স্পৃহা সৃষ্টি হয়। অনুরূপভাবে ফরজ কাজ সম্পাদন করার সাথে সাথে নফল কাজে আগ্রহী হওয়া কর্তব্যের চেয়ে বেশি আমল। যার দ্বারা আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য লাভ হয়। এহসানের অন্য অর্থ হলো ইবাদত একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা ও তা সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা। কেননা হাদিসে এসেছে ‘আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে করো, যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ’ বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। (আহকামুল বয়ান)
ওই আয়াতে আল্লাহ তিনটি কাজের আদেশ দিয়েছেন। যেমন : সুবিচার, সদাচার ও আত্মীয়স্বজনের প্রতি অনুগ্রহ করা । ইহসানের মাধ্যমে মানুষের মানসিক ও নৈতিক চরিত্রের উন্নতি হয়। ইহসানই মানুষকে সৃষ্টি জগতের মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব দান করে। ইহসানের বিনিময়ে আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ দান করেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘উত্তম কাজের জন্য উত্তম পুরস্কার ছাড়া আর কী হতে পারে?’ (সূরা রহমান : ৬০)।
প্রসিদ্ধ আলেমগণ বলেন, আমিত্ব ও অহঙ্কার বিসর্জন দেয়া ও নফসের গোলামি থেকে মুক্ত হওয়া ইহসান অর্জনের পূর্বশর্ত। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইহসানকারীদের সাথে আছেন। কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ইহসানকারীদের সাথে আছেন।’ (সূরা আনকাবুত : ৬৯) এক কথায় ‘ইহসান’ হলো আমি যেন আল্লাহকে দেখছি অথবা আল্লাহ আমাকে দেখছেন’ মনে করে প্রত্যেক সৎ কাজ আন্তরিকতার সাথে সম্পাদন করা। নবী সা:-এর তরিকা অনুযায়ী সে কাজ সম্পাদন করা। মন্দের প্রতিশোধে মন্দ না করে ভালো ব্যবহার প্রদর্শন করা। নিজের প্রাপ্য অধিকার ছেড়ে দেয়া এবং অন্যকে তার অধিকার অপেক্ষা অধিক দেয়া। এই সব কর্ম ইহসানের (সৎকর্মপরায়ণতা) অন্তর্ভুক্ত। (তাফসিরে আহকামুল বয়ান)
সুতরাং ইবাদতের চূড়ান্ত পর্যায় হলো ইহসান। ইহসান অবলম্বনকারী আল্লাহর ইবাদতের স্বাদ লাভ করতে সক্ষম হন, অপর দিকে আল্লাহর বান্দাদের প্রতিও তারা থাকেন সহানুভূতিশীল। ইহসান হলো মোমিন জীবনের চরম সাফল্য ও পরম পাওয়া। ইহসানের মাধ্যমে বান্দার প্রতি আল্লাহর করুণার সর্বোচ্চ প্রতিফলন ঘটে। তাই বান্দার উচিত আল্লাহর প্রেমে সর্বতোভাবে বিলীন হয়ে যাওয়া। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তার প্রিয় বান্দা হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করার তাওফিক দান করুন। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন। আমীন।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English