পবিত্র কুরআন মজিদে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ^বাসীর জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ১০৭) আল্লাহ তায়ালা বিশ^নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে সারা জগতের জন্য শান্তির বাতাস প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে এ ধরায় পাঠিয়েছেন তা তাঁর বাণী থেকেই প্রমাণ পাওয়া যায়। আর বিশ^নবী সা:ও নিজের পরিচয় দিয়ে বলেছেন, ‘আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। আমি উত্তম আদর্শ শিক্ষা দেয়ার জন্য প্রেরিত হয়েছি।’ (বুখারি ও মুসলিম) সুতরাং ঠিক তাই তিনি করে গেছেন, যা তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য ছিল। যার প্রমাণ ছোট থেকেই লক্ষ করা যায়। আজ সর্বত্র সংস্কারের পরিকল্পনা থাকলেও নেই বাস্তবসম্মত কর্মপদ্ধতি। তাই তো কোনোভাবেই সমাজ মাদক, ধর্ষণ ও অপরাধমুক্ত হচ্ছে না। নিম্নে তার সমাজ পরিবর্তনের রূপরেখা দৃষ্টান্তমূলক আলোকপাত করা হলো।
দুধমাতার কোলে নিষ্ঠার শিক্ষা : বিশ^নবী সা: যখন মা হালিমার দুধ পান করেন তখনই নিজের দুধভাইয়ের প্রতি ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে নিষ্ঠার শিক্ষা দিয়েছেন। হজরত হালিমাতুস সাদিয়া রা: বর্ণনা করেন, বিশ^নবী সা: প্রথম দিন যে স্তন থেকে দুধ পান করেছিলেন, যত দিন দুধপান করেছেন ঠিক একই স্তন থেকে পান করেছেন। কখনো অপর স্তন থেকে দুধ পান করেননি। কারণ তার সাথে আরেকজন ভাই ছিল তার জন্য রেখে দিতেন। এভাবেই তিনি শিশুকালীন নিষ্ঠার শিক্ষা দিয়েছেন। (তারিখুল ইসলাম)
ঐতিহাসিক সমাধান : বিশ^নবী সা: মাত্র ৩৫ বছর দুই মাস বয়সে সমগ্র আরবের সব গোত্রের মধ্যকার আশু-রক্তক্ষয়ী সংঘর্র্ষের ঐতিহাসিক সমাধান করে সারা আরবে প্রশংসার পাত্রে রূপান্তরিত হন। অর্থাৎ সে সময় মক্কায় বন্যার কারণে কাবাঘর ভেঙে গিয়েছিল। তাই আরবের সব গোত্রের অংশগ্রহণের মাধ্যমে কাবাঘর পুনঃসংস্কারের কাজ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় এবং যথারীতি কাজ সম্পন্ন হয়ে যখন হাজরে আসওয়াদ নির্ধারিত স্থানে পুনঃস্থাপনের সময় হলো তখন বিবাদ শুরু হলো। কেননা, কাজটি ছিল অতি সম্মানের, আর সব গোত্র চাচ্ছিল এ সম্মানের কাজটি তারা করবে যার ফলে প্রায় সংঘর্ষ লাগার উপক্রম হলো। ইতোমধ্যে কুরাইশের একজন বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি ঘোষণা দিলেন, এই কাবাঘরের দরজা দিয়ে যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম প্রবেশ করবে সে যে সিদ্ধান্ত দেবে তা সবাইকে মেনে নিতে হবে। সবাই মোটামুটি রাজি হয়ে গেল। সবাই দৃষ্টি রাখল দরজার দিকে। হঠাৎ করে দেখা গেল প্রবেশ করছেন মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ। সবাই এবার একবাক্যে বলে উঠল, হ্যাঁ এই ব্যক্তির সিদ্ধান্ত মেনে নিতে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। বিশ^নবী সা: এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত দিয়ে সবার দিলে স্থান করে নিলেন। তা হলো বিশ^নবী সা: নিজের চাদর বিছিয়ে নিজ হাতে হাজরে আসওয়াদ উঠিয়ে চাদরের ওপরে রাখলেন। তারপর সব গোত্রের একেকজন প্রতিনিধিকে বললেন চাদর ধরে দেয়ালের কাছে নিয়ে যেতে। সবাই চাদর ধরে যথাস্থানে নিয়ে গেলে বিশ^নবী সা: নিজ হাতে তুলে নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করলেন। এক দিকে সব গোত্রের লোকের অংশগ্রহণের কারণে সবাই আনন্দিত হলো। অপর দিকে বিশ^নবী সা:-এর হাতে বিশে^র সম্মানিত পাথরখানা যথাস্থানে স্থাপিত হলো। আর আরব জাতি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ থেকে রক্ষা পেল। (তারিখুল ইসলাম)
শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য হিলফুল ফুজুল গঠন : বিশ^নবী সা: এমন সময় পৃথিবীতে আগমন করেন, যখন সারা আরব লুটতরাজ, খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ, মাদক আর নির্যাতনে ভরা ছিল। তিনি আদর্শ সমাজ গঠনের লক্ষ্যে বড় বড় গোত্রের নেতাদের সাথে নিয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি (সংগঠন) গঠন করেন, যা আজো হিলফুল ফুজুুল নামে পরিচিত। সে সময় এ সংগঠনে অংশ নেয়, বনু হাশিম, বনু মুত্তালিব, বনু আসাদ, বনু জাহরাহ ও বনু তামিমসহ আরো কিছু শক্তিশালী গোত্র। সবাই মিলে সংগঠনের লক্ষ্য স্থির করেÑ ১. আমরা দেশ থেকে নিরাপত্তাহীনতা দূরীভূত করব; ২. আমরা মুসাফিরদেরকে (পরদেশী) সংরক্ষণ করব; ৩. আমরা দরিদ্রদের সাহায্য করব; ৪. আমরা বড়দেরকে ছোটদের ওপর অন্যায় অত্যাচার করা থেকে বাধা দেবো। এভাবেই শুরু করেন বিধ্বংসী আরব জাতিকে আদর্শ জাতিতে রূপান্তরের কার্যক্রম। তারপর যখন তিনি নবুয়তপ্রাপ্ত হলেন তখন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ওহির মাধ্যমে আরব জাতির আমূল পরিবর্তন করে সোনার জাতিতে রূপান্তরিত করলেন। নবুয়তপ্রাপ্তির পরের কার্যক্রমের মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য বিষয় আলোচনা করার চেষ্টা করছি।
নারী ও শিশুর যথার্থ মর্যাদা প্রদান : তখন নারী ও শিশুদের সাথে করা হতো অমানবিক নির্যাতন, যা ইসলাম মুসলমান বা কোনো ধর্ম কেন, যেকোনো মানুষের কাছেই ছিল অন্যায়। কিন্তু তা ছিল তাদের জন্য সচরাচর সহজ ব্যাপার। অর্থাৎ নারীরা ছিল নিছক ভোগ্যসামগ্রী বা বিনোদনের বস্তু । আর কি আশ্চর্য যাদেরকে বিনোদনের জন্য ব্যবহার করবে তারাই যখন শিশু নারী হয়ে নিজের ঘরে জন্ম নেয় তাকে করে জীবন্ত হত্যা। এটি কোনো দিক থেকেই বিবেকে ধরে না এটি কতখানি অপরাধ। বিশ^নবী সা: ইসলাম নিয়ে নবী হিসেবে আগমন করার পরে উভয় প্রকারের নারীদের জন্য সর্বোচ্চ সম্মানের জায়গাটি দিলেন। বিশ^নবী ঘোষণা করলেনÑ যার তিনটি কন্যাসন্তান হবে সে খুশি মনে তাদের লালন পালন করে সঠিক পাত্রে বিয়ে দিলে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য তিনটি জান্নাত বরাদ্দ করে দেবেন।
সুদ প্রথা নিষিদ্ধকরণ : বিশ^নবী সা: যখন দেখলেন, আরবের সামাজিক অবস্থার অবনতির পেছনে মূল কারণ হলো, অর্থনৈতিক যথেচ্ছ ব্যবহার। আর তখনকার আরবের অর্থ উপার্জনের মূল মাধ্যম ছিল অবৈধ পদ্ধতিতে উপার্জন। তার মধ্যে সুদ প্রথার প্রচলন ছিল সব থেকে বেশি ব্যাপক। আর এই সুদের কারণে কেউ হয়ে যেত বড় ধনী আর কেউ শোষণের বেড়াজালে পড়ে নিঃশেষ হয়ে যেত। ইচ্ছেমতো জুলুম করত ধনীরা গরিবদের ওপর। তাই বিশ^নবী সা: দীপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করলেন, ‘মহান আল্লাহ তায়ালা সুদকে হারাম করেছেন আর ব্যবসাকে হালাল করেছেন।’ (সূরা আল বাকারা, আয়াত ২৭৫)
মাদক, জুয়া ও ব্যভিচার দমন : সমাজকে ঢেলে সাজাতে বিশ^নবী সা: লক্ষ করলেন, সব থেকে বেশি অপরাধ সংঘটিত হয় মদ ও জুয়ার আসরে। তাই বিশ^নবী সা: সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে ঘোষণা দিলেনÑ মহান আল্লাহর নির্দেশ। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘ওহে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা ও ভাগ্য নির্ণায়ক তীর এসব শয়তানের কারসাজি ঘৃণ্য বস্তু। সুতরাং এসব বর্জনে যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সূরা মায়িদা আয়াত ৯০) এক হাদিসে বিশ^নবী সা: ঘোষণা করেন, ‘নেশাজাতীয় যেকোনো দ্রব্যই মাদক। আর যাবতীয় মাদকই হরাম। যে ব্যক্তি দুনিয়াতে মাদক সেবন করে অতঃপর নেশা অবস্থায় মারা যায় তওবা করার সুযোগ না পায়, আখিরাতে সে শরাব পান করা থেকে বঞ্চিত হবে।
সৎপথে স্বাবলম্বী হওয়ার প্রতি উৎসাহ প্রদান : আরব সমাজ যত অন্যায়ের মধ্যে লিপ্ত ছিল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অপরাধ হলো লুটতরাজ। আর এই অপরাধকারীদের ধরন হলো, বেকার সমাজ। তাই বেকারত্বের অভিশাপ থেকে বাঁচতে কর্মমুখী হতে বিশ^নবী সা: সত্যবাদী ব্যবসায়ীদের ভূয়সী প্রশংসা করে জান্নাতি বলে ঘোষণা করলেন। যাতে সবাই কর্মমুখী হয় আর অপরের সম্পদের প্রতি লোভ না করে। আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, ‘সৎপথে ফকির ও মিসকিনদের জন্য উপার্জনকারী জিহাদরত ব্যক্তির মতো।’ (ইবনে মাজাহ) এ ছাড়াও কুরআন ও সুন্নায় হালাল উপার্জনের প্রতি ব্যাপকভাবে উৎসাহ দেয়া হয়েছে।
অপকর্ম রোধে ব্যক্তির ভূমিকা : সমাজে কোনো আইন বা কোনো গোষ্ঠীর দ্বারা এককভাবে কোনো অন্যায় দূর করা সম্ভবপর নয়। এখানে যেমন আইন দরকার তেমনি প্রত্যেকটি স্থান থেকে ব্যক্তিগত ভূমিকা খুবই প্রয়োজন। নিজ নিজ দায়িত্বে যদি সবাই অপকর্ম ছেড়ে দেয় তাহলে অতি সহজে সমাজ কলুষমুক্ত হয়ে যাবে। অন্যায়ের বিরোধিতা করা প্রত্যেকের দায়িত্ব। বিশ^নবী সা: বলেন, তোমরা প্রত্যেকেই জিম্মাদার এবং প্রত্যেককেই আল্লাহর দরবারে হিসাব দিতে হবে।’ (বুখারি ও মুসলিম) সুতরাং শুধু একটি গোষ্ঠীর ওপর সমাজ সংস্কারের দায়িত্ব দিয়ে রাখলে তা মোটেও যুক্তিসঙ্গত নয় । বরং সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সব ধরনের অন্যায়ের বিরোধিতা করে, ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি আদর্শ সমাজ গঠন করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সে তৌফিক দান করুন। আমিন।