সারা বছর ঘুরে এক মাসের জন্য পবিত্র রোজার সওগাত নিয়ে হাজির হয় মাহে রমজান। যে ব্যক্তি রোজা রাখে, তার জন্যই কল্যাণের বার্তা রয়েছে। কারণ নিজেকে নিজের সঙ্গে শপথ করার মাধ্যমে দেহ, মন ও চিন্তাচেতনার আসল শুদ্ধি শুধু রোজার মাধ্যমেই সম্ভব। অন্য কোনো বাহ্যিক ইবাদতের সঙ্গে রোজার এখানেই আসল পার্থক্য বিরাজমান। তাই একজন সৎ মানুষ তথা আসল মুমিন হওয়ার বিকল্প নেই।
কিন্তু সৎ মানুষের সংকটে রোজার আসল উদ্দেশ্য থেকে মুসলমানরা অনেক দূরে সরে গেছেন। অতি মুনাফালোভী, মজুতদার ও সৎ মানুষের সংকটে রমজান আসার আগেই প্রতিবছর বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রতি রমজানে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করা যেন একটা কুৎসিত নেশা।
বলা হয়ে থাকে, রমজান শুরু হলে শয়তানকে এক মাসের জন্য শিকলবন্দি করে রাখা হয়; যাতে সে মানুষকে ইবাদত থেকে বিচ্যুত করতে না পারে। তা ঠিক। কারণ, রমজানের আগমনে মানুষের মনের মধ্যে বিরাট পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। রোজা রাখার জন্য প্রস্তুতি চলে বেশ জোরেশোরে। সারা দিন রোজা রাখার পর ইফতারি করা, তারাবি নামাজ আদায় করা, শেষরাতে সেহরি খাওয়া সবকিছুতেই একটা ধর্মীয় আমেজ চলে আসে। মুমিনরা তাদের সৎভাবে উপার্জিত আয়ের অর্থ দিয়ে এসব ধর্মীয় কাজের খরচ বহন করে থাকেন। তবে তাতে অনেকেই বাদ সাধেন, বিশেষ করে যারা সৎ-অসৎ ও হারাম-হালাল আয় ও দ্রব্যের মধ্যে পার্থক্য সূচিত করতে ভুলে যান অথবা জেনেশুনে মোটেও পার্থক্য করেন না। অথবা যারা হেঁয়ালি করে ভালো-মন্দ সবকিছু মাখামাখি তথা একাকার করে নিজের মূল্যবান জীবনটাকে অসততার মাঝে সঁপে দিয়ে ইহকাল ও পরকালের জন্য অর্থহীন করে ফেলেন।
রমজানে শয়তান ইবলিস শিকলবন্দি থাকলেও মানুষরূপী শয়তানরা বেশ তৎপর ও বেপরোয়া থাকে। যেসব মানুষরূপী শয়তান তাদের কথা, কর্ম ও পরিবেশের মধ্যে ইবলিস শয়তানের আদর্শ চর্চা করে, নিজেকে গড়ে তুলে পাপসংকুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে; তাদের শিকলবন্দি করে রাখা হয়নি। কিছু লোভী ও স্বার্থপর মানুষের মধ্যে এ ধরনের শয়তানি প্রভাব থেকে শুরু হয়েছে বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। দেশে কৃষি উৎপাদনের কমতি নেই। পাশাপাশি আমদানিও করা হয় প্রচুর। তাই বাজারে কোনো পণ্যের সরবরাহ স্বল্পতা নেই। তবে কেন নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট? তবে কেন বাসি-পচা ইফতার পরদিন বিক্রি করার জন্য ডালায় সাজানো হয়?
মানুষের সঙ্গে ভেজাল দ্রব্য দিয়ে প্রতারণা করা ও অতি মুনাফা করাই এসব সংকটের জন্য বিশেষভাবে দায়ী। আরও রয়েছে একশ্রেণির কাঁচা পয়সাধারী উঠতি বিত্তশালী ভোগবাদী মানুষের অপরিণামদর্শী কেনাকাটার উন্মত্ত আচরণ। এরা দরিদ্র ও সীমিত সৎ আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে সম্মান করে না; বরং বাহাদুরি করে কেনাকাটায় বেহুঁশ হয়ে বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিকে উসকে দেয়। ফলে বাজার হয়ে পড়ে অস্থিতিশীল। আমাদের দেশে ঘুস-দুর্নীতিবাজরা কাঁচা পয়সা হাতে পেয়ে কোথাও দরিদ্রদের পাত্তা দেয় না। স্বভাবতই নিু আয়ের মানুষ তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হেরে বাজারে ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
বর্তমানে বাজারে পাঁচশ টাকায় দেশি মুরগি, সাড়ে ছয়শ টাকায় গরুর মাংস এবং নয়শ টাকায় খাসির মাংস কেনার সামর্থ্য কতজন সীমিত আয়ের মানুষের আছে? অথচ অবৈধভাবে হঠাৎ বনে যাওয়া বিত্তশালীদের বাড়িতে কয়েকটি ডিপ ফ্রিজে প্রয়োজনের অতিরিক্ত আমিষ দীর্ঘদিন হিমে পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যায়। উন্নত দেশে, বিশেষ করে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলোয় খাদ্য অপচয়ের মাত্রা সীমাহীন। সারা বিশ্বে বছরে একশ কোটি টন রান্না করা খাবার নষ্ট হয়ে যায়!
আমাদের দেশেও মানুষে-মানুষে আয়-ব্যয়ের বিস্তর ফারাক। খাদ্যপণ্য ভোগের ক্ষেত্রেও চরম বৈষম্য লক্ষণীয়। বাজারে সবকিছু থরে থরে সাজানো দ্রব্যের কমতি নেই। লাগামহীন মূল্যস্ফীতিতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিুমুখী। আমার এক বন্ধু আক্ষেপ করে লিখেছেন-‘সামনে রোজা আসছে। দেখবেন, রোজার আগমনে অন্যান্য মুসলিম দুনিয়া শান্ত হয়ে আসছে। মানুষের মধ্যে একটা ভাবগম্ভীর পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে শুরু হবে কেনাকাটার মচ্ছব। যার দুই কেজি পেঁয়াজ দরকার, সে কিনবে বিশ কেজি। যার এক কেজি চিনি দরকার, সে কিনবে দশ কেজি। এমন করে খাবার মজুত করা শুরু হবে-যেন সারা বছর না খেয়ে ছিল। রোজার পরেও আর খাবার খাবে না। দুনিয়ার সব খাবার এই ত্রিশ দিনেই খেয়ে শেষ করতে হবে। এ সুযোগে পবিত্র রমজানের ব্যানার টাঙিয়ে দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়িয়ে ব্যবসায়ীরাও অপবিত্র কাজ করা শুরু করে দেবে।’
নকল ও ভেজাল খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করা রমজানের সময় একটি ভয়ংকর সংকট। মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যের তারিখ পরিবর্তন করে বিক্রি করার প্রবণতা ব্যাপক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে প্রাণঘাতী করোনার ভয়ে মানুষ যখন বাড়ি থেকে বের হওয়ার সাহস হারিয়ে ঘরে বসে কেনাকাটা করতে চান, তখন একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অনলাইনে কেনাকাটার ফাঁদ পেতে বসেছেন। অনলাইনে কেনাকাটার জন্য ব্যাপকভাবে বিজ্ঞাপন দিয়ে নিরীহ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। গুদামের পচা খাদ্যশস্য, দোকানের ছেঁড়াফাটা কাপড়, ভেজাল তেল-ঘি, নকল জুস, হোটেল-রেস্তোরাঁর বাসি-পচা খাবার ইত্যাদি এখন অনলাইনে কেনাকাটার পণ্যদ্রব্য। বস্তুত মানুষকে নিত্য প্রতারিত হতে হচ্ছে অনলাইন কেনাকাটায়।
একশ্রেণির নীতিজ্ঞানবিবর্জিত মানুষের স্বভাব হলো-শুধু নিজে খাব, কাউকে দেব না। এজন্য তারা অন্যের রিজিকের ওপর হাত দিতে কসুর করে না। কেউ যেন অন্যায়ভাবে অপরের রিজিক কেড়ে না নেয়, সেজন্য মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। রমজানে মানুষের আত্মশুদ্ধি ও আত্মোপলব্ধি জাগ্রত হোক। পাপ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবার আত্মা জেগে উঠুক। রোজার মহিমায় অতি মুনাফালোভী, মজুতদার ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিকারীদের ভণ্ডামি নস্যাৎ হয়ে যাক। শয়তানের প্রভাবে বিচ্যুত সব মানুষ সিয়াম সাধনার মাধ্যমে ইমান মজবুত করে ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ লাভ করুক।
ড. মো. ফখরুল ইসলাম : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান