করোনার সময়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী বহু শ্রমিক কাজ হারিয়েছে। অনেক কারখানার শ্রমিক মজুরিসহ অন্যান্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়েছে কিংবা কম পেয়েছে। যেসব কারখানার শ্রমিক এ ধরনের উপায়ে পাওনা বঞ্চিত হয়েছে, ঐসব কারখানা থেকে পণ্য নেওয়া আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। ইউরোপভিত্তিক আন্তর্জাতিক শ্রমিক অধিকার প্ল্যাটফরম ক্লিন ক্লথস ক্যাম্পেইন (সিসিসি) গতকাল থেকে ‘পে ইওরস ওয়ার্কার’ নামে একটি প্রচারণা শুরু করেছে। বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড এইচঅ্যান্ডএম, প্রাইমার্ক এবং নাইকিকে শুরুতে এ বিষয়ে টার্গেট করা হয়েছে। এসব ব্র্যান্ডের পণ্য সরবরাহকারী কারখানার শ্রমিকরা যাতে পুরো পাওনা পায়, তা নিশ্চিত করতে এই প্রচারণা শুরু করেছে। বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ডগুলোর ওপর শ্রমিক অধিকার রক্ষায় কাজ করা গ্রুপ হিসেবে সিসিসির প্রভাব রয়েছে। তাদের মতামত কিংবা আন্দোলনকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ও ব্র্যান্ডগুলো। সম্প্রতি সিসিসি এক হিসাবে দেখিয়েছে, করোনার শুরুর প্রথম তিন মাসে বিশ্বব্যাপী গার্মেন্টস খাতের শ্রমিকরা প্রায় ৫৮০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৪৯ হাজার কোটি টাকা।
দেশে গত মার্চ থেকে করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার পর এক মাসের বেশি সময় গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ ছিল। এই সময়ে বহু কারখানার শ্রমিক চাকরি হারায়। আবার অনেক কারখানা শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ করেনি বলেও অভিযোগ রয়েছে। সরকারের শ্রম মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) হিসাবে, প্রায় ২৬ হাজার পোশাকশ্রমিক কাজ হারিয়েছে। অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, এই সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। এর মধ্যে অনেকেই তাদের পাওনা পায়নি। আবার কেউ কেউ কম পেয়েছে। করোনার সময়ে বন্ধ থাকা কারখানার শ্রমিকরা মোট বেতনের ৬০ শতাংশ পেয়েছে।
ঐ সময়ে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইনে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। একের পর এক বাতিল হতে থাকে রপ্তানি আদেশ। তৈরি পোশাকশিল্প-মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর হিসাবে, প্রায় ৩২০ কোটি ডলারের রপ্তানি আদেশ স্থগিত হয়েছিল। এসব কারণে অনেক কারখানা শ্রমিকদের পাওনা অর্থ পরিশোধ করতে পারেনি। যদিও অর্থ পরবর্তী সময়ে স্থগিত রপ্তানি আদেশের বেশির ভাগই ফেরত এসেছে বলে খোদ বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক জানিয়েছেন। অন্যদিকে শ্রমিকদের অর্থ পরিশোধে সরকারও কয়েক দফায় এ খাতের উদ্যোক্তাদের ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রণোদনার আওতায় ঋণসহায়তা দিয়েছে।
এইচঅ্যান্ডএম, প্রাইমার্ক ও নাইকির নাম উল্লেখ করে সিসিসির পক্ষ থেকে বলা হয়, করোনা অতিমারির সময়ে আলোচ্য ব্র্যান্ডগুলোর সরবরাহ চেইনে বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ শ্রমিক কাজ হারিয়েছে এবং তাদের পুরো পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এসব শ্রমিকের পাওনা পরিশোধে ব্র্যান্ডগুলোকে দায়িত্ব নিতে হবে। কেননা ব্র্যান্ডগুলোর অনেকেই ক্রয়াদেশ প্রত্যাহার করেছে। কিছু দেশে মোট বেতনের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার অনুমতি দিয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে অর্থাত্ শ্রমিকদের পাওনা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরবরাহ চেইনে টেকসই ব্যবস্থা রাখার দাবিও রয়েছে সিসিসির প্রচারণায়। ঐ সময়ে এইচঅ্যান্ডএমসহ আরো দুই-একটি ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে ক্রয়াদেশ প্রত্যাহার করেনি। শুধু তাই নয়, তারা রপ্তানি আদেশের পণ্যের দামেও ডিসকাউন্ট চায়নি এবং পরবর্তী ক্রয়াদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রেও সব সরবরাহকারী কারখানাকে বিবেচনায় নিয়েছে বলে জানা গেছে; কিন্তু প্রাইমার্কসহ বাদবাকি বেশির ভাগই করোনাকালের কঠিন পরিস্থিতিতে তাদের দায় এড়িয়ে গেছে।