শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:১৪ পূর্বাহ্ন

করোনা অর্থনীতি

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২০
  • ৪৪ জন নিউজটি পড়েছেন

বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ কোন স্তরে পৌঁছেছে, সেটা একনজরে দেখার জন্য মঙ্গলবার ১৪ জুলাই একটি দৈনিকে চমৎকার একটি মানচিত্র ছাপানো হয়েছে। এ মানচিত্রে দু’ধরনের তথ্য আছে। ১. কোন জেলায় কত আক্রান্ত ২. এক সপ্তাহে রোগী বৃদ্ধির হার। মানচিত্রের দিকে তাকালে বোঝা যায় বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা করোনাভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত। তবে রোগীর সংখ্যা এবং রোগী বৃদ্ধির হারে তারতম্য রয়েছে। যেমন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ৯৭.০২ শতাংশ হারে ১ সপ্তাহে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পাশের জেলা রাজশাহীতে রোগী বৃদ্ধির হার হচ্ছে ৪৩.২৭ শতাংশ।

নেত্রকোনা জেলায় রোগী বৃদ্ধির হার হল ২.২১ শতাংশ। ঢাকা জেলায় মহানগরী বাদে সংক্রমণ বৃদ্ধির হার ৬ শতাংশ। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশ একটি ক্ষুদ্র জনবহুল দেশ, এখানে মনুষ বাস করে বেশ ঠাসাঠাসি করে, এ কারণে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত ঘটতে পারে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুধু বাংলাদেশে হয়নি। এ সংক্রমণ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ঘটেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশও এর আক্রমণ থেকে রেহাই পায়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষতিগ্রস্ত রাজ্যগুলো ব্যাপক হারে সংক্রমণের থাবার মধ্যে পড়েছে। প্রযুক্তির দিক থেকে মার্কিন চিকিৎসাব্যবস্থা খুবই উন্নত হওয়া সত্ত্বেও অনেক রোগীর মৃত্যু ঠেকাতে পারেনি। রোগটি বিশ্বময় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ফলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে Global Pandemic ঘোষণা করেছে।

পৃথিবীর সব দেশই চাইছে এ মহামারী দ্রুত অপসারিত হোক। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, আমাদের এই গ্রহের বাসিন্দারা এ মহামারীর আগ্রাসন থেকে কবে পরিপূর্ণভাবে মুক্তি পাবে বোঝা যাচ্ছে না। গবেষক বিজ্ঞানীরা এ রোগটির ওপর গভীর গবেষণা চলাচ্ছেন। তাদের লক্ষ্য হল করোনাভাইরাসের আক্রমণ থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য টিকা আবিষ্কার করা। টিকা আবিষ্কার খুব সহজ কাজ নয়। এটি একটি সময়সাপেক্ষ, প্রক্রিয়া। সুতরাং আগামী ৩ মাসের মধ্যে একটি কার্যকর টিকা মানুষের হস্তগত হবে এমনটি আশা করা যায় না। এর আগে যেসব ভইরাস পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকায় সংক্রমণ বিস্তার করেছিল সেগুলোরও কার্যকর টিকা আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান করোনাভাইরাসটি তার Strain পরিবর্তন করে।

খুব সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বিজ্ঞানী দেখতে পেরেছেন ভাইরাসটি আরও শক্তি অর্জন করেছে। এটি এখন কিছুদিন আগের তুলনায় আরও দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। তবে এখন এ ভাইরাসটি আগের মতো ক্ষতি করার শক্তি খানিকটা হারিয়ে ফেলেছে। মুশকিলটা হল, যে ভাইরাস তার Strain পরিবর্তন করে, সেই ভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকা আবিষ্কার করলে খুব ফলপ্রসূভাবে এর ব্যবহার সম্ভব হবে সে রকম নিশ্চয়তা দিয়ে কোনো কিছু বলা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশে যেভাবে এ রোগের পরিসংখ্যান সংগ্রহ করা হচ্ছে তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি খুব গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। বাংলাদেশে করোনাভাইরাস কোন স্তরে আছে এবং বিভিন্ন স্থান ও বিভিন্ন পেশার মানুষের মধ্যে কীভাবে এবং কতটা সংক্রমণ বিস্তার করেছে তার জন্য একই দিনে একই সময়ে সারা বাংলাদেশে একটি জরিপ চালানো হোক। আমরা পরিসংখ্যান বিজ্ঞান থেকে জানি, কোনো বিষয়ের ওপর জরিপ করতে হলে পরিপূর্ণ শুমারি করা সম্ভব হয় না। একমাত্র আদমশুমারির জন্য শতকরা ১০০ ভাগ শুমারি করা হয়।

এছাড়া অন্যান্য জরিপের ক্ষেত্রে নমুনা বা স্যাম্পল সার্ভে করতে হয়। বাংলাদেশে প্রতি ৫ বছর পরপর একটি আয়-ব্যয়ের জরিপ করা হয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য দারিদ্র্য নিরূপণ করা। বেশ ক’বছর ধরে এ জরিপের স্যাম্পল সাইজ ছিল ১২ হাজার। সাম্প্রতিক সময়ে এর সংখ্যা বাড়িয়ে ১৭ হাজার করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো থেকে এ পরিসংখ্যান ফ্রেমটি নিয়ে একটি জরিপ চালালে আমরা বুঝতে পারতাম, যা ১৭ হাজার স্যাম্পলের ক্ষেত্রে সত্য তা পুরো বাংলাদেশের জন্য সত্য। হ্যাঁ, এ সত্য প্রকৃত বাস্তবতা থেকে খুবই সামান্যভাবে ভিন্ন হতে পারে। এ রকম একটি জরিপ আমাদের অনেক কিছু বোঝাতে সাহায্য করত।

জনগোষ্ঠীর মধ্যে কারা করোনা সংক্রমণের মুখে খুবই নাজুক এবং কারা তুলনামূলকভাবে কম নাজুক তা নির্ণয় করা সম্ভব হতো। এ ছাড়া আয়-ব্যয় পরিস্থিতি, কর্মসংস্থান পরিস্থিতি, শিক্ষা পরিস্থিতি, করোনা ছাড়া অন্য কোনো ক্রনিক রোগের পরিস্থিতি- মোট কথা, রোগের সঙ্গে আর্থসামাজিক চলকগুলোর সম্পর্ক বোঝা অনেক সহজসাধ্য হতো। কেন যে ডাক্তার সাহেবরা এ রকম একটি জরিপ করলেন না! যেসব বিশেষজ্ঞ কোন বিষয়ে কেমন ধরনের জরিপ করতে হয় তা বুঝতে পারেন এবং জানেন, তাদের সাহায্য গ্রহণ করা উচিত ছিল।

এখন যা করা হচ্ছে সেটা থেকে পূর্ণ তথ্য বের হয়ে আসে না। কারণ সংক্রমণের হার যেভাবে নির্ণয় করা হচ্ছে তাতে অনেক সংক্রমিত ব্যক্তির হিসাব থাকছে না। যখন বলা হয় করোনার লক্ষণ নিয়ে কোনো একটি স্থানে কিছু সংখ্যক লোকের মৃত্যু হচ্ছে, এ যে করোনার কারণে হচ্ছে তা কী করে বুঝব? সংবাদপত্রে আমরা খবর পড়ি, এতজনের মৃত্যু হয়েছে করোনার লক্ষণ নিয়ে, তাদের সংক্রমণ সম্পর্কে জানার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর যদি করোনার লক্ষণ নিয়ে জেলা বা উপজেলাওয়ারি তথ্য পৃথকভাবে দিত, তাহলে সমস্যার ভয়াবহতা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা করা যেত।

এছাড়া আমরা তো সংবাদপত্র থেকেই জেনেছি ল্যাবরেটরিতে কোনোরকম পরীক্ষা ছাড়াই একদল মানুষ সম্পর্কে বলা হয়েছে এরা করোনা পজিটিভ এবং আরেক দল মানুষ সম্পর্কে বলা হয়েছে এরা করোনা নেগেটিভ। পরিসংখ্যান নিয়ে এ ধরনের জচ্চুরি অমার্জনীয় অপরাধ। আরও পরিতাপের বিষয় হল, যারা এসব করেছে তারা অর্থের জন্য সরকারের কাছে বিল পাঠিয়েছে। আমি বুঝতে পারি না এ লোকগুলো কী করে করোনাভাইরাসের মতো দুর্যোগ নিয়ে চুরিচামারির আশ্রয় নিতে পারে। এ অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিটি টেলিভিশনের টকশোতে নীতিনৈতিকতা এবং সুস্থ রাজনীতি নিয়ে শ্রোতাদের হেদায়েত করতেন। বাংলাদেশে কিছু বহুরূপী মানুষ আছে, এরা যখন যা প্রয়োজন, সেভাবে ভেক ধারণ করতে পারে।

পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন এই ছদ্মবেশী দুর্বৃত্তরা বাংলাদেশটাকে নিজেদের চারণভূমিতে পরিণত করবে। বাংলাদেশের জনগণকে এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে কীভাবে চলতে ফিরতে হয়, স্বাস্থ্য বিধিগুলো জানতে হয় এবং মানতে হয় এসব বার্তা ভালোভাবে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। যে ধরনের বার্তা সাধারণ মানুষ বুঝতে সক্ষম সে রকম ভাষাতেই করোনাকালের রীতিনীতিগুলো মানুষকে বুঝিয়ে দিতে হবে। শুধু বোঝাতে পারাই যথেষ্ট নয়, আচার-আচরণের মধ্যেও এর প্রতিফলন থাকতে হবে। করোনাভাইরাস মহামারী কবে নাগাদ স্তিমিত হয়ে শক্তিহীন হয়ে যাবে তা আমরা জানি না। ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য নানা ধরনের জীবাণুনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে জীবাণুনাশক খাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। মহামারীটি না থাকলে এ অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হতো না। এ অতিরিক্ত খরচ অন্য কোনো জরুরি প্রয়োজনে ব্যয় করা যেত। আমরা অসুখ-বিসুখের লক্ষণগুলো দূর করা এবং এগুলো থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য নানা ধরনের ওষুধ সেবন করি। আমাদের প্রত্যেকের আকাক্সক্ষা হল শারীরিকভাবে সুস্থ থাকা।

কিন্তু আমরা বুঝতে পারি শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি মানসিক অসুস্থতাও আমাদের পেয়ে বসে। একটু সীমিত আকারে জরিপ করলে জানা যাবে মানসিকভাবে অসুস্থতার ব্যাপ্তি কত বিশাল। শিশুরা বাসায় বসে দিন কাটিয়ে স্থূল হয়ে যাচ্ছে। তারা বইপত্র পড়তে চায় না। কারণ তারা স্কুলের পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন। একইভাবে বিভিন্ন পেশার লোকজন কাজ করার উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। তাদের কোনো কাজে মন বসতে চায় না। যারা আমলাতন্ত্রের সদস্য, তারাও একটি প্রজ্ঞাপন বা বিজ্ঞপ্তি রচনা করতে গিয়ে ভাষাবিভ্রাট সৃষ্টি করেন। কারণ একটাই- এখন কোনো কাজে মনোযোগী হওয়া সম্ভব নয়। সবচেয়ে শঙ্কাময় পরিস্থিতি হচ্ছে মৃত্যুচিন্তা। বয়স যাই হোক না কেন, এখন দেশের প্রত্যেক নাগরিক প্রায় সর্বক্ষণ মৃত্যুচিন্তায় মনমরা হয়ে থাকেন। ফলে তারা কোনো কাজকর্ম সুষ্ঠুভাবে করতে পারেন না। অর্থনৈতিকভাবে এ রকম পরিস্থিতিতে উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়।

বিশ্বব্যাংক ও এডিবি বিভিন্ন দেশের জিডিপি সম্পর্কে যে হিসাব করেছিল, করোনা পেন্ডেমিক দেখা দেয়ার পর সেসব হিসাব পরিত্যাগ করেছে এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি কতটা সংকুচিত হবে তার হিসাব উপস্থাপন করেছে। করোনাভাইরাসের ফলে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেবে বলে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এ আশঙ্কা একেবারেই অমূলক নয়। ১৯৩০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে মন্দার সূচনা হয়েছিল, সেই মন্দা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল। এ অবস্থা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। তখন জনগণের হাতে নানা প্রক্রিয়ায় বিশেষ করে রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা কাজকর্মের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করা হয়েছিল। অর্থাৎ ভোক্তা বা কনজুমারদের চাহিদা চাঙ্গা করার পলিসি নেয়া হয়েছিল। এবার করোনাকেন্দ্রিক মন্দা ১৯৩০ সালের প্রক্রিয়ায় সমাধান করা সম্ভব হবে না।

এবার প্রয়োজন হবে সাপ্লাই বা সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা। সাপ্লাই বাড়ালে মানুষের কর্মসংস্থান অবশ্যই বাড়বে এবং চাহিদাও সৃষ্টি হবে। অর্থনীতির একটি পুরনো কিন্তু যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হচ্ছে, Supply creates its own demand. আমার মতো অর্থনীতির একজন সাধারণ ছাত্রের এ বক্তব্য জাঁদরেল অর্থনীতিবিদরা ডিসমিস করে দিতে পারে। হয়তো করবেনও। তারপরও মনে রাখতে হবে, সাধারণরা অনেক সময় অসাধারণ কিছু করে ফেলেন।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English