ছাতিম ফুলের সময় এখন। বাতাসে ছাতিমের ম ম সুবাস। প্রকৃতিতে বয়ে বেড়ানো হালকা বাতাসের সঙ্গে থেকে থেকে ভেসে আসে বুনো ফুল ছাতিমের মিষ্টি ঘ্রাণ।
বিকালের সূর্য যখন গোধূলিতে, তখন থেকেই যেন একটু একটু করে ছড়াতে থাকে মায়াবী এ ঘ্রাণ।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে দড়িকান্দি এলাকায় বাতাসে ছাতিমের গন্ধ। ছাতিম ফুলের সুবাসে মুগ্ধ হয় পথচারী।
শরতের এ শেষ বেলাতে গাছজুড়ে শুধু ফুল আর ফুল। সাদা ফুলে পুরো গাছ ঢেকে থাকে। বিশেষ করে সন্ধ্যা থেকেই রাতের পুরো সময়টায় এ গাছের ফুলের ঘ্রাণ ছড়িয়ে মৌ মৌ গন্ধে সুবাসিত হয়ে যায়।
ঝাঁকড়া পত্রপল্লব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা উঁচু এ গাছের শাখা-প্রশাখায় ভরা পাতা আর সাদার মধ্যে সবুজাভ রঙে থোকায় থোকায় অগুনতি ফুলে প্রকৃতির কি নিসর্গ তা না দেখলে অনুভব করা যায় না। ছাতিমগাছ যেন শিশি উপুড় করে সন্ধ্যার বাতাসে গন্ধ ঢেলে দেয়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তীব্র ও মাদকতাময় হয়ে ওঠে এই গন্ধ। দেখা যায় সারা গাছ ছেয়ে থাকা গুচ্ছ গুচ্ছ সাদা ফুল।
ছাতিমগাছের ডালের গঠন ও পাতার বিন্যাস এতই সুন্দর যে পথ চলতে যে কেউ মুগ্ধ হবে। আর এর ফুলের তীব্র গন্ধ অনেক দূর থেকেই পথিককে কাছে টানবে।
কাণ্ডগুলো ছাতার মতে বেষ্টিত হয়ে থাকে। হয়তো এ কারণেও গাছটির নাম ছাতিম। ছাতিম গাছ প্রায় ৪০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়।
চিরসবুজ দুধকষভরা সুশ্রী গাছ। পাতা প্রায় ১৮ সেমি লম্বা, মসৃণ, ওপর উজ্জ্বল সবুজ, নিচ সাদাটে। শরতের শেষে সারা গাছ ভরে গুচ্ছবদ্ধ, তীব্রগন্ধী, সবুজ-সাদা ছোট ছোট ফুল ফোটে। ফল সজোড়, থোকায় থোকায় ঝুলে থাকে। এর আদি আবাস ভারত, চীন ও মালয়েশিয়া। macrophylla জাতের ছোট ছাতিম বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জন্মে।
ফুল সাদা ও আকারে কিছুটা বড়। এ গাছের সংস্কৃত নাম সপ্তপর্ণী। অঞ্চলভেদে একে ছাতিয়ান, ছাইত্যানসহ নানা নামে ডাকা হয়। ছাতিম ঘিরে অনেক মিথও রয়েছে।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রিয় ফুলের মধ্যে এই ফুল অন্যতম। তাই শানি্তনিকেতনে অজস্র ছাতিম ফুলের গাছ আছে।
বর্তমানে খুব একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। দূর থেকে ভেসে আসা সুগন্ধ শুঁকে গাছটিকে খুঁজে নিতে হয়।
নির্বিচারে গাছ কেটে বিক্রি করা বা বসতবাড়ি নির্মাণের ফলে অন্যান্য গাছের সঙ্গে উজাড় হতে হতে এখন এই ছাতিমগাছ খুব একটা দেখা যায় না।
এলাকার লোকজন জানান, ছাতিমগাছ একসময় এ এলাকায় অনেক ছিল। পুরো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দু-পাশজুড়ে বিভিন্ন স্থানেই ছাতিম গাছের দেখা পাওয়া যেত।
সারা বছর এ গাছের কথা মনে না থাকলেও শরত্ এলেই ছাতিম ফুল নিজেই তার সুগন্ধে অসি্তত্ব জানান দেয়। বড় বড় গাছ সাদা ফুলে ঢেকে যায়।
তবে আজকাল তেমন একটা দেখা যায় না ছাতিমগাছ। দড়িকান্দি এলাকায় লাঙ্গলবন্দ ব্রিজের পূর্ব ও পশ্চিমপাশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৫টি গাছ এখনও আছে। এ গাছের
ফুলের ঘ্রাণে পুরো এক থেকে দুই কিলোমিটার পর্যন্ত ছেয়ে যায়। তবে হয়তো একসময় আর খুঁজে পাওয়া যাবে না অপূর্ব সুন্দর ফুলের সুগন্ধের এ গাছটি।
কয়েকটি নার্সারির মালিকের সঙ্গে কথা জানা গেছে, নার্সারিগুলোতে ছাতিম গাছের চারা কম পাওয়া যায়। কেননা এ গাছের চারা তেমন একটা বিক্রি হয় না।
আধো জ্যোত্স্না রাতে ছড়িয়ে পড়ে ছাতিম ফুলের মায়াবী গন্ধ। এ এক অপূর্ব মায়াময় ঘোর। বেশ ভালো লাগে এ সময়টায় ছাতিম ফুলের সুগন্ধ। কয়েকটি গাছ এখনও আছে, তবে হয়তো একসময় আর খুঁজে পাওয়া যাবে না অপরূপ ফুলের সুন্দর এ গাছটি।