চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৬০১ জন নারী ও শিশু। এর মধ্যে একক ধর্ষণের শিকার ৪৬২ জন এবং দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৩৪ জন। এই সময়ে দেশে নারী নির্যাতনের বিচারের হার মাত্র ৩ শতাংশ। সোমবার আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চলতি বছরের ছয় মাসের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংখ্যাগত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘গত ছয় মাসে দেশে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন আরও ১০৩ জন নারী।’
এদিকে নারী-শিশু নির্যাতক, ধর্ষক ও হত্যাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করাসহ ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্র।
পঁচিশতম নারী নির্যাতন প্রতিরোধ (ইয়াসমিন হত্যা) দিবস উপলক্ষে সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাব ও দিনাজপুর প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তারা এ আহ্বান জানান।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের সদস্য শরিফা আক্তারের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ ঢাকা নগর শাখার সদস্য সচিব জুলফিকার আলী, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল কাদেরী জয়, সদস্য সুস্মিতা মরিয়ম প্রমুখ। পরিচালনা করেন সংগঠনের সদস্য মুক্তা বাড়ৈ।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, ‘১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট রাজধানী ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার পথে দিনাজপুরের কিছু বিপথগামী পুলিশের হাতে পৈশাচিকভাবে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় চৌদ্দ বছর বয়সী কিশোরী ইয়াসমিন আক্তার। তার পরই এর প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে দিনাজপুরসহ সারাদেশের মানুষ। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের আন্দোলনের মুখে ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় হয়। এর পর ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়। ইয়াসমিন হত্যার পর ২৪ বছর কেটে গেলেও নারী নির্যাতন-ধর্ষণ-হত্যা কমেনি, বরং ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।’
নারীর মর্যাদা ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে শক্তিশালী করার দাবি জানিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত নারীমুক্তি কেন্দ্রের সমাবেশে বক্তব্য দেন সংগঠনের সভাপতি সীমা দত্ত, অর্থ সম্পাদক নাঈমা খালেদ মনিকা, দফতর সম্পাদক তৌফিকা লিজা প্রমুখ।
ইয়াসমিন হত্যার পর কেটে গেছে ২৪টি বছর। নারীর প্রতি সহিংসতা বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই করোনা মহামারির মধ্যে নারী নির্যাতন বেড়েছে ভয়াবহভাবে; নারীকে নির্যাতনের ধরনও বেড়েছে। ত্রাণ দেওয়ার কথা বলে বাড়িতে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ, করোনা রোগী তল্লাশির নামে কিশোরী মেয়েকে অপহরণ করে গণধর্ষণ, ফেসবুকে লাইভ করে স্ত্রীকে হত্যা, নানাভাবে নারীর প্রতি সহিংসতা ঘটানো হচ্ছে! কিন্তু অপরাধীরা বরাবরের মতোই পার পেয়ে যাচ্ছে বিচারের হাত থেকে। আর এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই দিন দিন নারী নির্যাতনকে বাড়িয়ে চলেছে। সেইসঙ্গে যুক্ত আছে নারীর প্রতি পুরুষতান্ত্রিকতার দৃষ্টিভঙ্গি।
বক্তারা আরও বলেন, ‘ধর্ষণ, গণধর্ষণ, পিটিয়ে হত্যা, যৌতুকের কারণে হত্যা, এসিডে ঝলসে দেওয়া, ইন্টারনেটে ছবি ছড়িয়ে ব্ল্যাকমেইল করাসহ বর্তমানে নির্যাতনের ধরন বেড়েছে। ছয় বছরের শিশু থেকে ৬০ বছরের বৃদ্ধা, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র, সমতল বা পাহাড়ের আদিবাসী, সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু কেউই এ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যাসহ অন্যান্য নির্যাতনের হারও অন্য সময়ের চেয়ে বেশি।’
এ প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, ‘ধর্ষণের ঘটনা ঘটার পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মামলা হয় না। যেসব ক্ষেত্রে মামলা হয় সেগুলোও বছরের পর বছর ঝুলতে থাকে। সহজে নিষ্পত্তি হয় না। দেখা যায়, যে মামলাগুলোর নিষ্পত্তি হয়েছে, তার মাত্র ৩ শতাংশের সাজা হয়েছে। এসব অপরাধীর বিচার না হওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় কারণ ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসক দলের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় ও সংশ্লিষ্টতা।’
দিনাজপুর প্রেস ক্লাবে আয়োজিত মহিলা পরিষদের মানববন্ধনে বক্তব্য দেন দিনাজপুর নাগরিক উদ্যোগের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ, উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের নির্বাহী সদস্য রেজাউর রহমান রেজু, কলেজিয়েট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হাবিবুল ইসলাম বাবুল, মহিলা পরিষদ দিনাজপুর শাখার সভাপতি কানিজ রহমান, সাধারণ সম্পাদক ড.মারুফা বেগম, জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক বদিউজ্জামান বাদল, জেলা জাসদের সাধারণ সম্পাদক সহিদুল ইসলাম প্রমুখ।
১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় আন্দোলনরত জনতার ওপর গুলি চালিয়ে ৭ জনকে হত্যা করে পুলিশ। এ সময় আহত হয় আরও শতাধিক মানুষ। এরপর থেকেই ২৪ আগস্ট দেশব্যাপী নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।