শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:৪৭ অপরাহ্ন

জিলহজের প্রথম দশকের ফজিলত

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২০
  • ৬৯ জন নিউজটি পড়েছেন

কুরআন মাজিদে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, ‘ওয়াল ফাজরি ওয়া লায়ালিন আশর ওয়াশ শাফয়ি ওয়াল বিতরি’ অর্থাৎ শপথ ফজরের, শপথ ১০ রাতের, শপথ জোড় ও বেজোড়ের।
ব্যাখ্যা : জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন। এই দিনগুলোর বরকতময় হওয়ার বিষয়টি হাদিস শরিফ থেকে জানা যায়। জোড় বলতে সৃষ্টির সব বস্তু বা প্রাণী বোঝায়। কারণ আল্লাহ তায়ালা সব কিছু জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ নিজে এক ও একক অর্থাৎ বেজোড়। সুতরাং বেজোড় আল্লাহ নিজের সত্তাকে বুঝিয়েছেন। একটি হাদিস মতে জোড় হলো কোরবানির ঈদের দিন, আর বেজোড় হলো আরাফার দিন তথা হজের দিন। (নাসায়ি)
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা: নবী করিম সা: থেকে বর্ণনা করেন, ‘আল্লাহর কাছে এই ১০ দিনের চেয়ে অন্য কোনো দিন অধিক বড় নয় এবং আল্লাহর কাছে এই ১০ দিনের আমলের চেয়ে অন্যান্য দিনের আমল অধিক প্রিয় নয়। সুতরাং তোমরা এই দিনগুলোতে বেশি বেশি তাহলিল, তাকবির ও তাহমিদ পড়ো। অর্থাৎ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার ও আলহামদুলিল্লাহ বেশি বেশি জিকির করো।’ (মুসনাদে আহমাদ)

হজরত জাবের রা: নবী করিম সা: থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, ‘সব দিনের মধ্যে আফজাল তথা সর্বোত্তম দিন হচ্ছে আরাফাহর দিন।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান)
পবিত্র জিলহজ প্রথম ১০ দিনের মাসনুন আমলগুলো (হাদিস শরিফের আলোকে) :
১. হজ ও ওমরাহ আদায় করা। সব আমলের মধ্যে এটাই আফজাল বা সর্বোত্তম। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘এক ওমরাহ থেকে আরেক ওমরাহ পর্যন্ত, এ দুয়ের মধ্যবর্তী সময়ের (গুনাহ সগিরার) কাফফারাহ। তিনি বলেছেন, হজে মাবরুরের (মকবুল) প্রতিদান হচ্ছে একমাত্র জান্নাত। এ সংক্রান্ত বহু সহিহ হাদিস রয়েছে।
২. এই দিনগুলোতে (যতটা সম্ভব) নফল রোজা রাখা। বিশেষ করে আরাফাহর দিন। নিঃসন্দেহে রোজা অত্যন্ত উত্তম নেক আমল। এটি আল্লাহ পাক বিশেষভাবে নিজের জন্য খাস করে নিয়েছেন। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, রোজা আমার জন্য। আমিই এর প্রতিদান দেবো। কেননা রোজাদার আমারই জন্য লোভ-লালসা, কামনা-বাসনা, খাবার ও পানীয় পরিত্যাগ করে।
হজরত আবু সাঈদ খুদরি রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘কোনো বান্দাহ যদি আল্লøাহর রাস্তায় একদিন রোজা রাখে, তবে আল্লাহ তায়ালা ওই একদিনের রোজার বদৌলতে তার চেহারাকে জাহান্নাম থেকে ৭০ বছরের দূরত্বে রাখবেন। অর্থাৎ ৭০ বছরে অতিক্রম করা যায় এতটুকু পথের সমান দূরে রাখবেন।’ (বুখারি-মুসলিম)
আবু কাতাদাহ রা: নবী করিম সা: থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, ‘আরাফাহর দিনের রোজার সওয়াব হিসেবে আল্লাহ তায়ালা এক বছর আগের ও এক বছর পরের গুনাহ (সগিরাহ) মাফ করে দেবেন।’ ( মুসলিম)
৩. এই দিনগুলোতে বেশি বেশি তাকবির পড়া ও আল্লাহর জিকির করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ওয়া ইয়াজকুরুসমাল্লাহা ফি আইয়ামিন মালুমাত অর্থাৎ ‘নির্দিষ্ট দিনগুলোতে তারা আল্লাহর নাম জিকির করতে পারে।’ (সূরা হজ : আয়াত-২৮)
অবশ্যই নির্দিষ্ট দিনগুলো বলতে জিলহজের ১০ দিন বোঝানো হয়েছে। মুফাসসিরিন এই ব্যাখ্যাই করেছেন। এই কারণে ওলামারা এই দিনগুলোতে বেশি বেশি জিকির মুসতাহাব বলেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা: বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, ‘তোমরা এই দিনগুলোতে বেশি বেশি তাহলিল, তাকবির ও তাহমিদ করো।’ তারা এই হাদিস থেকে নির্দেশনা গ্রহণ করেছেন। ইমাম বুখারি রা: উল্লেখ করেছেন, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা: এবং হজরত আবু হুরায়রা রা: এই ১০ দিনে বাজারে বের হয়ে ঘুরতেন। আর তারা দু’জন তাকবির দিতেন। তাদের সাথে সাথে বাজারে উপস্থিত লোকেরাও তাকবির দিত। হজরত ইসহাক রহ: তাবেয়ি ফুকাহা রাহিমাহুমুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন, তারা জিলহজের প্রথম ১০ দিনে ‘আল্লাহু আকবার’ ‘আল্লাহু আকবার’ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার’ ‘ওয়া লিল্লাহিল হামদ’ বলতেন।
বাজারে, রাস্তায়, বাড়িঘরে ও মসজিদ ইত্যাদি জায়গায় উচ্চস্বরে তাকবির পাঠ করা মুসতাহাব। কেননা, আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ ফরমান (ওয়ালিতুকাব্বিরুল্লাহ আলা মা হাদাকুম) অর্থাৎ ‘যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো, এই জন্য যে, তিনি তোমাদের পথপ্রদর্শন করেছেন।’ (সূরা হজ : আয়াত-৩৭)
৪. সব রকমের সগিরাহ-কবিরাহ গুনাহ থেকে খালেছ অন্তরে তাওবা ও ইস্তেগফার করা।
৫. নফল ইবাদতসহ বেশি বেশি নেক আমল করা। যেমন নফল নামাজ, দরুদ শরিফ পাঠ দান-সদকা, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ, পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার ইত্যাদি। কেননা, এই সব আমলের সওয়াব বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়া হয়।
৬. সাধারণভাবে এই ১০ দিনে যেকোনো সময়ে দিনে-রাতে ঈদের নামাজ পর্যন্ত তাকবির পাঠ করা। বিশেষভাবে অহাজীদের জন্য ৯ জিলহজ ফজরের নামাজের ওয়াক্ত থেকে বা হাজীদের জন্য কোরবানির দিন জোহর থেকে আইয়ামে তাশরিকের শেষ দিন ১৩ জিলহজ আসরের ওয়াক্ত পর্যন্ত প্রত্যেক ওয়াক্তে জামাতের পরপর তাকবির পাঠ করা।
৭. কোরবানির দিন ও আইয়ামে তাশরিকের মধ্যে কোরবানি করা। যাদের ওপর ওয়াজিব, তারা তো করবেনই। ওয়াজিব না হলেও নফল কোরবানিও করা যায়। এটি মুসলিম উম্মাহর আদি পিতা ইবরাহিম আ:-এর সুন্নত। রাসূলুল্লাহ সা: নিজে দুটি খাসি অথবা দুম্বা কোরবানি দিয়েছেন। একটি নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে, অন্যটি সমস্ত উম্মতের পক্ষ থেকে। (বুখারি ও মুসলিম)
৮. উম্মুল মোমিনিন হজরত উম্মে সালামাহ রা: বর্ণনা করেন, নবী করিম সা: বলেছেন, যখন তোমরা জিলহজের চাঁদ দেখবে এবং কোরবানির নিয়ত করবে, সে যেন চুল দাড়ি ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকে। অন্য বর্ণনায় কোরবানি করা পর্যন্ত বিরত থাকার কথা এসেছে। কোরবানি দাতা ছাড়া অন্যরাও সুন্নত হিসেবে এই আমল করতে পারে।
৯. যেখানে ঈদের নামাজ আদায় করা হয়, সেখানে উপস্থিত হয়ে ঈদের নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা। খুতবা শোনা, শরিয়তের বিধিবিধান ও হেকমত সম্পর্কে জানা উচিত। দ্বীনি পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করা এবং শরিয়তবিরোধী কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকা উচিত। যেমন নাচ-গান, বাদ্য-বাজনা, নেশা ইত্যাদি। কেননা, এগুলো নেক আমলকে বিনষ্ট করে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি ডেকে আনে।
১০. সব মুসলিম নর-নারীর উচিত এই দিনগুলোতে আল্লাহ ও রাসূল সা:-এর আনুগত্য এবং আল্লাহর জিকির ও শোকরে মনোনিবেশ করা। আল্লাহর আদেশ পালন ও নিষেধ থেকে দূরে থাকা। আল্লাহ আমাদের সঠিক পথে চলার তৌফিক দিন। আমীন।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English