সকাল সকাল ঘুম ভাঙল, ভেবে যে দেরি হয়ে যাবে নাকি কাজে যেতে! ঘুম থেকে ওঠা উচিত! রেডি হতে হবে! একটু পরই মনে পড়ল, আজ তো কাজ নেই! কী মজা! আরও কতক্ষণ ঘুমাব! ঘুম আমার যে কী প্রিয়!
যার সঙ্গে আমার সাপে-নেউলে সম্পর্ক, (পড়ুন স্বামী), সে বলে, মানুষজন নিশ্চয়ই অবাক হয় তোমাকে দেখে! ভাবে, এই সিলি মেয়ে আজ এখানে, কাল ওখানে, কেমনে? ওর কোনো কাজ নেই?
আমি হাসি! ও তার উত্তর জানে! মনে মনে বলি, আলহামদুলিল্লাহ! তবে সত্য হচ্ছে পরিশ্রম! কাজের চাপে যখন নাভিশ্বাস ওঠে, হাঁপিয়ে পড়ি আটপৌরে জীবনে, আউটলেট লাগে… দমবন্ধ পরিস্থিতিতে রিচার্জ হতে স্বস্তির নিশ্বাস নিতে হয়! আমার সে সময় প্রকৃতির আরও কাছে যেতে হয়! তাদের বিশালত্ব, নীরবতা, ধৈর্য, ক্ষমতা, আর সর্বংসহা মূর্তি, একই সঙ্গে অতুলনীয় সৌন্দর্য আমাকে নিমেষেই রিচার্জ করে দেয়!
আমি যেমন বৃষ্টি পছন্দ করি, তেমনি পছন্দ করি মরুভূমি, পাতাভরা গাছে বাতাসের দোল বা পত্রহীন বৃক্ষের সৌন্দর্য। কোনোটাই মিস করি না। পেঁজা সাদা মেঘের ভেলা যেমন পছন্দ, তেমনি পছন্দ ঝড়ের আগে কালো মেঘ, সন্ধ্যার নীল/লাল আকাশ! পাহাড় যেমন ডাকে, নদীও ডাকে, সমুদ্রও ডাকে!
ধানের খেতের বাতাসের নাচন—বেস্ট কম্পোজড মিউজিক আমার মনে হয়। আমি সে নিঃশব্দ সিম্ফোনি মনযোগ দিয়ে দেখি মনে হয়, ইশ্! যদি আমিও এই হ্যাপি সুরের, তালের, লয়ের, শব্দের সঙ্গে মিশে যেতে পারতাম! আসলেই যাই। সেই মুহূর্তে আমি তন্ময় হয়ে, একাত্ম হয়ে যাই প্রকৃতির সঙ্গে! সেটা আমার মন ভালো করে দেয়।
সেই একই ভাবে আমি নদী-সমুদ্র দেখি! বাতাস, নদী, পানি, আর্থের বিশালতা, সৌন্দর্য আর ক্ষমতার মেলবন্ধন দেখি।
এই যে মৃদুমন্দ বাতাস, চুল ছুঁয়ে যায়, কানের পাশে-মনে বিবশ আবেশ জাগায়। সেই মৃদুমন্দ বাতাস কালবৈশাখী হয়ে, নিমেষেই সব তছনছ করে দিতে পারে! আবার বাতাসহীনতাও কী করুণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে! লু হাওয়ায় সেই নাভিশ্বাস তোলে!
বৃষ্টি, বৃষ্টি চাই বলে, আমরা কী ভীষণ জোরালো দাবি করি। বৃষ্টিতে ভিজে শরীর মন চাঙা হয় আমাদের! শুধু আমাদের নয়, পুরো প্রকৃতি সাফসুতরো হয়ে যায়, নতুন প্রাণ পায়! সেই একই বৃষ্টি বন্যা আনে, প্রাণহানি করে, ফসল বিনাশ করে।
সমুদ্রের বাতাসের মৃদু আলোড়ন! কী শান্ত মনে হয়! বাতাসের সঙ্গে ঘর্ষণে তার রূপের খোলতায় ঘটে! পাশে পাথর হলে তো কথাই নেই! ভালোবাসার স্পার্ক! অথচ কী ভীষণ তার শক্তি! যে প্রচণ্ড আক্রোশ বা ভালোবাসায় সে পাথরকে আঘাত করে, পাথর না হলে সম্ভব সে ভালোবাসা বয়ে বেড়ানোর?
প্রতিটি ঢেউয়ের সঙ্গে যা হয়, আমরা কিন্তু বুঝতেও পারি না দেখি না বলে! তটের মাটি ক্ষয় হয়! বোঝা যায়, সে মাটিতে দাঁড়ালে পায়ের নিচের মাটির এমন সড়াৎ টান! পায়ের নিচে মাটিই থাকে না। টেনে নিয়ে যায় আবার ফিরিয়ে আনে!
আর সুনামি! সেই একই শক্তি। কী ভয়াবহ ক্রোধ! সব ভেঙেচুরে দেওয়ার কী প্রয়াস! লন্ডভন্ড প্রকৃতি!
আমি প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখি, সঙ্গে তার ক্ষমতা দেখি। ভালোবাসি, ভয় পাই; একই সঙ্গে! চুম্বকের মতো টানে আমায়!
আবার দেখি মরুভূমিতে ছোট একটা গাছ, একটা-দুটো পাতা ছড়িয়ে নিজের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে! যেখানে তার হওয়ার কথাই নয়! বা শীতের আগে প্রতিটি গাছ যখন হঠাৎ করেই এক দিনে নষ্ট হয়, তেমনি বরফ গলে গেলেই বা হিমশীতল মাটিতে প্রথম উষ্ণ দিনে একটি কুঁড়ি যখন বের হয়, প্রকৃতির সে ক্ষমতা আমায় মুগ্ধ করে!
কেউ কারও সঙ্গে যুদ্ধে যায় না, নীরবে নিজেদের অবস্থান, ভালোবাসা আর মুগ্ধতার জানান দেয়। স্ট্রাগল দেখা যায় না, তবে তার স্ট্রাগল, স্ট্রাগল শেষের গল্পটা পড়তে বা বুঝতে আমার অসুবিধা হয় না। মন ভালো হয়ে যায়।
যে মৃদু ভালোবাসায় মন উদ্বেলিত হয়, সেই একই ভালোবাসার রুদ্রমূর্তি কত ভয়ানক! মানুষ নয়, প্রকৃতি দেখে শিখতে ভালো লাগে আমার!
আর প্রকৃতি? শান্ত, চরম ধৈর্যের সঙ্গে সবকিছুর মোকাবিলা করে, আবারও সুন্দর হয়ে যায়! যেন কোনো কালসিটে দাগ কখনো কোথাও পড়েনি! আমি সর্বংসহা হতে শিখি! ভালোবাসতে শিখি, উদার হতে শিখি, কৃতজ্ঞ হতে শিখি, গুণকীর্তন করতে শিখি, মন্দটাকে নিয়েও ভালোবাসা যায় বুঝি।
সব ভেঙে যেতে পারে ক্ষণিকে জেনেও, সেই সুন্দর মুহূর্তগুলোকে নষ্ট করার মানে নেই, বুঝি। বেঁচে থাকা স্ট্রাগল, তবে তার জন্য প্রতিদিন মরার কোনো মানে নেই। বেঁচে থাকি মুহূর্তে, ওই মুহূর্তটুকুই আমার!
তারপর?
সুনামি, টর্নেডো, মরুভূমি, পাহাড় যা-ই হোক, তাদের বরণ করে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই! জীবন থেকে পালানো যায় বুঝি?