রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:০২ অপরাহ্ন

জীবন মৃত্যু এবং ধৈর্য

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ সোমবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ৫৯ জন নিউজটি পড়েছেন

সুন্দর পৃথিবীতে আমরা কেউই স্থায়ী নই। সামান্য ক’দিন অস্থায়ী এ নিবাসে সীমিত জীবন কাটানোর পর অবশ্যই অবশ্যই নির্ধারিত মুহূর্তে, অনন্ত-অসীম পরকালের দিকে যাত্রা করতে হবে। আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘প্রত্যেক জাতির জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট সময়। অতঃপর যখন তা চলে আসবে তখন মুহূর্তকাল বিলম্বিত করতে পারবে না এবং এগিয়েও আনতে পারবে না’ (সূরা আরাফ : ৩৪)।
প্রকৃত সুখী তো সেই, যে মৃত্যু-পরবর্তী অন্তহীন জীবনে সুখী। আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘যারা না দেখে দয়াময় আল্লাহকে ভয় করেছে এবং বিনীত অন্তরে উপস্থিত হয়েছে। তাদেরকে বলা হবে তোমরা শান্তির সাথে প্রবেশ করো এটা অনন্ত জীবনের দিন। তারা যা চাইবে সেখানে তাই থাকবে এবং আমার কাছে রয়েছে আরো অধিক’ (সূরা ক্বাফ : ৩৩, ৩৪, ৩৫)।

বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেইÑ সবচেয়ে হতভাগা সেই, যে অনন্ত-অসীম পরকালীন জীবনে দুঃখী। আল্লাহর ভাষায়, ‘ফেরেশতাদেরকে বলা হবে, একে ধরো এবং গলায় বেড়ি পরিয়ে দাও তারপর জাহান্নামে প্রবেশ করিয়ে দগ্ধ করো। অতঃপর তাকে শৃঙ্খলিত করো ৭০ গজ দীর্ঘ এক শিকলে’ (সূরা আল হাক্কাহ : ৩০, ৩১, ৩২)।
ক্ষণস্থায়ী এ দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-বেদনায় আমরা যেভাবে কাতর হই, পেরেশান হইÑ তা কি কখনো সেই মহাকালের সাথে ওজন করি, কল্পনা করি কিংবা ঘুণাক্ষরে ভেবে দেখি! অথচ আমাদের সবার জানা, ইহকালীন জীবন আখিরাতের তুলনায় একেবারেই স্বল্প। হাদিসের ভাষ্যমতেÑ সাগরে একটি আঙ্গুল ডুবিয়ে তুললে, আঙ্গুলের মাথায় যে পরিমাণ পানি উঠবে, পরকালীন জীবনের তুলনায় তাই হচ্ছে, ইহকালীন জীবন বা হায়াতের স্থায়িত্বকাল।

প্রকৃতপক্ষে জীবন দেয়াই হয়েছে একদিন মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন করার জন্য। জন্ম-মৃত্যুর অন্তর্বর্তীকালীন সময়টুকুই জীবন। আর জীবন-মৃত্যুর রহস্য হচ্ছে আমাদের জীবনাচার পর্যবেক্ষণ এবং সে আলোকে প্রতিদান প্রদান। আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘ধৈর্যশীলদেরই তো তাদের পুরস্কার পূর্ণরূপে দেয়া হবে বেহিসাব’ (সূরা জুমার : ১০)।
আমাদের জীবনের পথপরিক্রমা সবসময় অনুকূল থাকে না। আবার জীবনপ্রবাহ থেমেও থাকে না। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আসলে এগুলো ছাড়া জীবন হতেই পারে না; বরং এগুলোর সংমিশ্রণ জীবনটাকে উপভোগ্য করে। জীবনের ছোট-বড় ঢেউ-তরঙ্গ, উত্থান-পতন হাতে-কলমে আমাদের অনেক কিছু শেখায়, বাস্তবতা উপলব্ধি করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। সমাজের প্রকৃত চিত্র আমাদের চোখের সামনে ফুটিয়ে তুলে। জ্ঞাত-অজ্ঞাত, কল্পনীয়-অকল্পনীয় নানা বিষয়ের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার জোগান দেয়। এসব থেকে শিক্ষা নিতে স্বয়ং মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘অতএব হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিরা, তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো’ (সূরা হাশর : ২)।

জীবন সামান্য ক’দিনের হলেও অমূল্য। হয়তো এ জন্য পথচলার হোঁচট আর ব্যথাগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয়Ñ জীবনের মূল্য, জীবনের অপরিহার্যতা। শিক্ষা দেয়Ñ আঘাতগুলোকে শক্তিতে পরিণত করে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়াতে। অনুপ্রাণিত করেÑ ত্যাগী, উদ্যমী ও সৎসাহসী হতে। জগতে যারা বড় হয়েছেন, তাদের প্রায় সবাই জন্মের পর থেকে বড় হওয়ার আগ পর্যন্ত দুঃখ-কষ্ট সাথে নিয়েই বড় হয়েছেন। অতঃপর সুখ-সমৃদ্ধিতে অবগাহন করেছেন। এটি আল্লাহ তায়ালার বিধিও বটে। আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘সুতরাং কষ্টের সাথেই রয়েছে সুখ। নিশ্চয় কষ্টের সাথেই রয়েছে সুখ’ (সূরা ইনশিরাহ : ৫, ৬)।
আজন্ম দুধ-কলায় লালিত-পালিতরা জগতে সম্মান-খ্যাতি অর্জন করেছেন, এরূপ মানুষের সংখ্যা ধরণিতে তেমন একটা নেই। আমাদের জীবনঘুড়ির সুতো আমাদের কাছে নয়; মহান প্রভুর হাতে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করেন। সেসব ক্ষেত্রে আমরা ধৈর্যহারা না হয়ে সবরের সাথে ঈমান ও তাকদিরের ওপর অটল-অবিচল থেকে দৃঢ়পদে অগ্রসর হওয়াই আমাদের কাজ ও কর্তব্য। কারণ, দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ, ব্যথা-বেদনা এসবের সমন্বয়েই জীবন। যারা এগুলোকে আল্লাহর ইচ্ছা মনে করে ধৈর্যসহ টিকে থাকতে পারেন, তারাই সফল হন।

আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যে প্রতিযোগিতা করো, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো’ (সূরা আলে ইমরান : ২০০)।
ধৈর্য অনেক কঠিন। তাই এর ফলও বেশ সুস্বাদু এবং চমৎকার। রাসূল সা: ইরশাদ করেছেন, ‘ধৈর্যের চেয়ে উত্তম ও ব্যাপকতর কল্যাণ কাউকে দেয়া হয়নি’ (বুখারি, মুসলিম)।
আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে থাকেন’ (সূরা বাকারাহ : ১৫৩)।
আল্লাহ আরো ইরশাদ করেন ‘অবশ্যই আমি তোমাদিগকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। যখন তারা বিপদে পতিত হয় তখন বলে, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউনÑ অর্থাৎ নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো। তারা সে সব লোক, যাদের প্রতি আল্লাহর অফুরন্ত অনুগ্রহ ও রহমত রয়েছে এবং এসব লোকই হেদায়াতপ্রাপ্ত’ (সূরা বাকারাহ : ১৫৫, ১৫৬)।
আয়াত এবং হাদিসের শিক্ষা হচ্ছেÑ জীবনের দুঃখ-কষ্টে হতাশ বা বিচলিত না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা। ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা এবং আয়াতে বর্ণিত ও অন্যান্য দোয়া-তাসবিহ বেশি করে পাঠ করা। সর্বোপরি, আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে ধৈর্যশীল হিসেবে কবুল করুন। আমীন।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English