কোভিড-১৯ প্রতিরোধ ও মৃত্যু কমাতে বেশি সংখ্যক মানুষকে টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য ৭ আগস্ট থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে গণটিকা কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। কয়েক দফা বয়স কমিয়ে ২৫ বা তার বেশি বয়সিরা এখন টিকার জন্য নিবন্ধন করতে পারছেন। ৮ আগস্ট থেকে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সিরাও আসছেন টিকার আওতায়। কিন্তু এখনো পর্যন্ত গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েরা টিকার আওতার বাইরে রয়েছেন। অথচ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর তালিকায় রয়েছেন গর্ভবতী নারীরা। এরইমধ্যে সময় করোনায় আক্রান্ত হয়ে অনেক গর্ভবতী নারীর মৃত্যুও হয়েছে।
করোনা পরিস্থিতির তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে নারীদের মৃত্যু কম হলেও এখন তা কয়েকগুণ বেড়েছে। তবে এর মধ্যে কতজন গর্ভবতী নারী সেই হিসাব নেই। বলা হচ্ছে, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারী এই দুই শ্রেণির ওপর টিকার পর্যাপ্ত পরীক্ষামূলক প্রয়োগ হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে সংখ্যক তথ্য-উপাত্ত আছে তাতে বলা যায়, এ দুই শ্রেণির মানুষের জন্যও করোনা টিকা নিরাপদ। তারা বলছেন, বর্তমানের জরুরি জনস্বাস্থ্যগত পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে করোনার নতুন নতুন ধরন মোকাবিলা করতে হলে করোনা টিকার আওতার বাইরে রাখা আমাদের দেশের বিপুলসংখ্যক গর্ভবতী, দুগ্ধদানকারী মায়ের ও তাদের শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি পর্যালোচনার দাবি রাখে। শিগগিরই এই বিপুল সংখ্যক নারীকে টিকার আওতায় আনার সুপারিশও করেছেন তারা।
জানা গেছে, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীদের টিকার আওতায় আনতে বাংলাদেশ প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ সোসাইটি (ওজিএসবি) ছাড়াও কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির পক্ষ থেকে সুপারিশ করা হয়েছে।
পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশে টিকাবিষয়ক ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নেয়া নাইট্যাগ (ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল এডভাইজারি গ্রুপ)। আমরা পরামর্শক কমিটির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সুপারিশ করে নাইট্যাগের কাছে পাঠিয়েছি। নাইট্যাগ বিষয়টি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত জানাবে। শনিবার নাইট্যাগের একটি বৈঠক হওয়ার কথা। সেখানে আমাদের পরামর্শক কমিটির কয়েকজন সদস্যও উপস্থিত থাকবেন। আশা করছি ওই বৈঠকের পরই আমরা এ বিষয়ে একটি ইতিবাচক সংবাদ পাব।
কেনো টিকার তালিকায় নেই: চিকিৎসাসংক্রান্ত নৈতিকতা বিবেচনায় গর্ভবতী ও স্তন্যদায়ী নারীদের প্রথম দিকে করোনার টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এর অন্যতম কারণ হলো, শিশুর ক্ষতির আশঙ্কা। টিকায় গর্ভবতী নারীর ক্ষতি হয় কিনা সে আশঙ্কাও ছিল। যে কারণে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়নি।
তথ্য ও গবেষণা কী বলছে: চলতি বছরের মে মাসে কানাডার ন্যাশনাল এডভাইজারি কমিটি অন-ইমিউনাইজেশন (এনএসিআই) গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারীদের করোনার টিকা নিতে পরামর্শ দিয়েছে। এনএসিআইর বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনার টিকার উপকারিতা গর্ভবতী নারী ও গর্ভস্থ শিশুর ঝুঁকির চেয়ে বেশি। তারা বলছেন, টিকা গর্ভবতী নারীদের জন্য নিরাপদ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলসহ (সিডিসি, ইউএসএ) কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এখন বলছে, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধী টিকা নিতে পারবেন গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারী। এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্তন্যদানকারী নারীকে টিকা দেয়া হলে এ থেকে তৈরি হওয়া এন্টিবডি তার শরীর থেকে শিশুর শরীরে পৌঁছায়- যা শিশুর শরীরে এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে।
যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান কলেজ অব অবস্টেটরিসিয়ান্স এন্ড গাইনোকোলজিস্টস (এসিওজি), আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস, একাডেমি অব ব্রেস্টফিডিং মেডিসিন, সোসাইটি ফর মেটারনাল ফিটাল মেডিসিন, এমনকি মার্কিন নীতিনির্ধারণী সংস্থা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন এবং ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন পর্যন্ত এ সম্পর্কে সাবধানতাসূচক কিন্তু কোনো নেতিবাচক কথা বলেনি।
টিকা নিশ্চিতে লিগ্যাল নোটিস: বৃহস্পতিবার (২৯ জুলাই) গর্ভবতী নারীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করোনা টিকা দিতে সরকারকে লিগ্যাল নোটিস দিয়েছে ‘ল এন্ড লাইফ ফাউন্ডেশন’ নামের একটি সংগঠন। সংগঠনের পক্ষে ব্যারিস্টার হামায়ুন কবির পল্লব এবং ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাউছার এই নোটিস পাঠান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং রোগতত্ত¡, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) পরিচালককে। নোটিসে বলা হয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৩৫ লাখ নারী গর্ভবতী হন। অর্থাৎ ৩৫ লাখ গর্ভবতী নারী আরো ৩৫ লাখ মানুষের অস্তিত্ব বহন করেন। কিন্তু করোনা মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার গর্ভবতী নারী ও শিশু মারা যাচ্ছে। সঠিকভাবে গর্ভবতী নারীদের করোনার টিকা দেয়ার ব্যবস্থা করা গেলে অনেক হতাহত কমিয়ে আনা সম্ভব।
নোটিসে উল্লেখ করা হয়, সরকারের নির্ধারিত করোনা টিকা নিবন্ধন সুরক্ষা অ্যাপে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিবন্ধন করার জন্য গর্ভবতী নারীদের জন্য কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। অথচ তাদের চেয়েও কম ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গর্ভবতী নারীদের জন্য করোনারোধী টিকা দেয়া শুরু না করলে এদের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করা হবে।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা: ওজিএসবির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. সামিনা চৌধুরী বলেন, করোনা সংক্রমণ শুরু থেকে এখনো পর্যন্ত গর্ভবতী নারীরা প্রাধান্য পায়নি। কী টিকা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কী এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কতজন গর্ভবতী নারীর মৃত্যু হয়েছে সেই তথ্যের ক্ষেত্রে। সংক্রমণ শুরুর প্রথম থেকেই আমরা ওজিএসবির পক্ষ থেকে বলে আসছি, গর্ভবতী নারীদের যেন বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। যারা মারা যাচ্ছেন তাদের মধ্যে কতজন গর্ভবতী নারী এই হিসাবটা যেন আলাদা করে রাখা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা হয়নি। গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীদের টিকার আওতায় আনার কথাও আমরা বহুদিন ধরে বলে আসছি। কিন্তু এখনো পর্যন্ত গর্ভবতী নারীরা টিকার আওতায় আসেনি। অথচ তাদের কিন্তু ঝুঁকি অনেক বেশি। বৃহস্পতিবারও আমরা এই বিষয়ে একটি ওয়েবিনার করেছি। সেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। আমরা সেখানেও গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীদের টিকার আওতায় আনার জন্য জোর দাবি জানিয়েছি।
তিনি বলেন, গর্ভবতী নারী করোনায় সংক্রমিত হলে মা ও শিশু উভয়েরই মৃত্যু ঝুঁকি বেড়ে যায়। এসব বিষয় মাথায় রেখেই বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা, সিডিসি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীকে করোনা টিকা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে। এই পরামর্শ মেনে অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশ এই দুই শ্রেণির নারীকে টিকার আওতায় এনেছে। কিন্তু আমরা এখনো পারিনি। আর দেরি না করে জরুরিভিত্তিতে দেশে গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকার আওতায় নেয়া উচিত।
ইনফার্টিলিটি কেয়ার এন্ড রিসার্চ সেন্টার লিমিটেডের (আইসিআরসি) চিফ কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগমের মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে করোনার উচ্চ সংক্রমণ চলছে। তাই এই সময়ে কিছু ক্ষেত্রে সন্তান না নিলে বরং বেশি ভালো। অথবা টিকার সব ডোজ শেষ করে সন্তান নিলে ভালো হয়। গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীরা কোন টিকা নিবেন সেই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গর্ভবতী নারীদের ফাইজার ও মডার্নার টিকা দেয়ার ব্যাপারে সুপারিশ করেছে বিশে^র বড় ফার্টিলিটি সংস্থাগুলো। এ পর্যন্ত যাদের এই টিকা দেয়া হয়েছে তাদের ভূমিষ্ঠ হওয়া সন্তানদের কোনো জন্মগত ত্রæটি পাওয়া যায়নি। আমেরিকায় এক লাখের বেশি টিকাপ্রাপ্ত গর্ভবতী নারী ও তাদের সন্তানদের মধ্যেও কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার ব্যাপারে বলা হয়েছে, যেসব গর্ভবতী নারী কোভিড সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে আছেন তারা নিতে পারবেন। যেমন স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জড়িত সবাই। অর্থাৎ বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকলে এই টিকা নিতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, করোনা সংক্রমণ হয়নি এমন হবু মায়েদের এই টিকা দিয়ে ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুর কোনো অসুবিধা পাওয়া যায়নি। এর মানে গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে টিকা দিলেও অসুবিধা হয় না। এক ডোজ সিনোভ্যাক টিকা নেয়ার পর কেউ গর্ভধারণ করলে যথাসময়ে পরবর্তী ডোজ নিতে হবে। এই টিকা গর্ভাবস্থার যে কোনো সময় নেয়া যাবে। তবে ১৪ থেকে ৩৩ সপ্তাহের মধ্যে নেয়ার সুপারিশ করেছে অনেক সংস্থা। এই টিকা গ্রহণকারী নারীর ভূমিষ্ঠ হওয়া সন্তানের শরীরেও উল্লেখযোগ্য এন্টিবডি পাওয়া গেছে। যা খুবই ইতিবাচক দিক। তাই গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীদের টিকা নিতে কোনো সমস্যা নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (গবেষণা ও উন্নয়ন) এবং টিকা বিতরণ কমিটির প্রধান অধ্যাপক ডা. মিরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, টিকা সম্পর্কিত বিষয়ে আমরা নাইট্যাগের পরামর্শ নেই। নাইট্যাগের পরামর্শ পেলেই আমরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারব। এছাড়া গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীদের টিকার দেয়ার পক্ষে ওজিএসবি আমাদের কাছে লিখিত সুপারিশ দিয়েছে। আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত যে তথ্য-উপাত্ত আছে তাতে দেখা যাচ্ছে, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীরা টিকা নিলে তাদের ক্ষতি হয় না। তবে টিকা নেয়ার পর দীর্ঘমেয়াদি কোনো প্রভাব পড়ে কিনা সেই বিষয়টি এখনো আমরা নিশ্চিত নই।
মিরজাদি সেব্রিনা আরো বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যিনি টিকা নেবেন তাকে টিকা বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে হবে। এরপর যদি ওই নারী টিকা নিতে চান তবেই তাকে টিকা দেয়া হবে। আমাদের দেশে এ ক্ষেত্রে একটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন: সবাই যে বুঝে টিকা নেবেন তা কিন্তু নয়। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিতে কিছুটা সময় নিচ্ছি।