দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হার কিছুটা কমে এলেও মৃত্যু কিছুতেই কমছে না। বরং করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। গত নভেম্বর মাসের তুলনায় ডিসেম্বর মাসে মৃত্যু বেড়েছে ২৬ দশমিক ৯০ শতাংশ। দিনে গড়ে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে বিদায়ী বছরের শেষ মাসে। করোনার সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
করোনা শনাক্তের পরীক্ষা কম হচ্ছে। বিদেশগামী যাত্রীদের মধ্যে শনাক্তের হার কম, তাদের হিসাবও মোট শনাক্তে দেখানো হচ্ছে। সংক্রমণের চিত্র বুঝতে হলে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়াতে হবে। হাসপাতালগুলোয় কিন্তু করোনা রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। কোনো আইসিইউ ফাঁকা নেই।
তাহমিনা শিরীন, সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক
গত ডিসেম্বর মাসে করোনায় মৃত্যু হয় ৯১৫ জনের। এর আগে নভেম্বর মাসে মারা গেছেন ৭২১ জন। গত বছরের মার্চে দেশে করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর মাসের হিসাবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে জুলাইয়ে। ওই মাসে গড়ে প্রতিদিন মারা গেছেন ৪১ জন। এরপর টানা তিন মাস মৃত্যু কমলেও নভেম্বর থেকে আবার বাড়তে শুরু করেছে। গত অক্টোবরে দিনে গড়ে মারা যান ২২ জন। নভেম্বরে এটি বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ জনে। ডিসেম্বরের পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।
ষড়ঋতুর এই দেশে প্রকৃতিতে শীত শুরু হয়েছে মধ্য ডিসেম্বর। তবে শীত অনুভূত হচ্ছে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকেই। শীতের আবহাওয়া থাকবে মধ্য ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। শ্বাসতন্ত্রের রোগ করোনার (কোভিড-১৯) সঙ্গে আবহাওয়ার কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা বের করতে বিশ্বজুড়ে চলছে নানা গবেষণা। বাংলাদেশেও এমন কয়েকটি গবেষণা হয়েছে। কিছু গবেষণায় তাপমাত্রা ও সূর্যালোকের সঙ্গে সংক্রমণ বাড়া-কমার একধরনের সম্পর্ক দেখা গেছে। তবে সেসব গবেষণা থেকে শীত ও করোনার সম্পর্কের কোনো সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
যদিও সরকার শীত আসার কয়েক দিন আগেই করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে সতর্ক করে আসছিল মানুষকে। শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সংক্রমণ বৃদ্ধির ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছিল। টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে সংক্রমণ শনাক্তের হার ছিল ঊর্ধ্বমুখী। শনাক্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছিল। তবে তিন সপ্তাহ ধরে দৈনিক শনাক্ত রোগী ও সংক্রমণ শনাক্তের হার কমছে।
মৃত্যুর সংখ্যা বেশি গুরুত্বপূর্ণ
জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, সংক্রমণ পরিস্থিতি বোঝার জন্য শনাক্তের সংখ্যার চেয়ে মৃত্যুর সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ। মৃত্যু পরিস্থিতি বলছে, অনেকেই যথাসময়ে নমুনা পরীক্ষার আওতায় আসছে না। জ্বর, কাশির প্রাথমিক ওষুধ খেয়ে বাসায় থাকছে, গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ছুটছে। তাই উদাসীনতা দূর করতে হবে।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক তাহমিনা শিরীন বলেন, করোনা শনাক্তের পরীক্ষা কম হচ্ছে। বিদেশগামী যাত্রীদের মধ্যে শনাক্তের হার কম, তাদের হিসাবও মোট শনাক্তে দেখানো হচ্ছে। সংক্রমণের চিত্র বুঝতে হলে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়াতে হবে। হাসপাতালগুলোয় কিন্তু করোনা রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। কোনো আইসিইউ ফাঁকা নেই।
কোনো দেশের সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে কি না, তা বোঝার জন্য কিছু নির্দেশক নির্ধারণ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তার একটি হলো টানা তিন সপ্তাহ ধরে মৃত্যু কমতে থাকা। কিন্তু দেশে মৃত্যু টানা কমতে দেখা যায়নি। মৃত্যুর সংখ্যা নিয়মিত ওঠানামা করতে দেখা গেছে।
করোনা পরীক্ষা করানো নিয়ে লোকজনের মধ্যে অনীহা রয়েছে। বাসায় থেকে অনেকে চিকিৎসা করাচ্ছেন। শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি জটিল হলে হাসপাতালে যাচ্ছেন। তখন তাঁদের জীবন বাঁচাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
মুশতাক হোসেন, আইইডিসিআরের পরামর্শক
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত জুলাই পর্যন্ত দেশে মোট মৃত্যুর মধ্যে ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের মৃত্যুর হার ছিল ৪৪ শতাংশ। এখন এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ দশমিক ৬২ শতাংশে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ১৭ জনের মধ্যে ১২ জনের বয়স ৬০ বছরের বেশি। আর ৪ জনের বয়স ৫১ বছরের বেশি। তবে ৪০ বছরের কম বয়সীদের মৃত্যুর হার কমে এসেছে।
করোনা পরিস্থিতির উন্নতি করতে হলে মৃত্যুর তথ্য পর্যালোচনা জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশে মৃত্যুর তথ্য নিয়ে বড় মাত্রায় কোনো পর্যালোচনা হয়নি। গত জুন মাসে রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যাওয়া ৯৩ জন করোনা রোগীর চিকিৎসার কাগজপত্র পর্যালোচনা করা হয়েছিল। এতে দেখা গেছে, হাসপাতালে আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যু বেশি হচ্ছে। এ ছাড়া আক্রান্তদের মধ্যে যাঁদের রক্তে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কম থাকে তাঁদেরও মৃত্যু বেশি হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, হাসপাতালে আসার পর কখন মৃত্যু হচ্ছে, রোগের পরিস্থিতি, কী কী বিষয় যুক্ত হলে রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করছে—এসব তথ্য পর্যালোচনা হওয়া দরকার। মৃত্যুর পেছনের তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করতে হবে। এ থেকে শিক্ষা নিলে মৃত্যু কমানো সম্ভব হবে। আইইডিসিআর করোনায় মৃত ব্যক্তিদের তথ্য পর্যালোচনার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির পরিচালক তাহমিনা শিরীন। তিনি বলেন, পর্যালোচনার ফলাফল পেতে সময় লাগবে।
দেশে গত ৮ মার্চ প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত হলেও মে মাসের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত শনাক্তের হার বেশি ছিল। আগস্টের শেষ থেকে শনাক্তের হার কমতে শুরু করেছিল। তবে নভেম্বরের শুরু থেকে আবার সংক্রমণ বাড়ে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, তিন সপ্তাহ ধরে অবশ্য শনাক্তের হার আবার ১০ শতাংশের নিচে।
এদিকে কয়েক দিন ধরে করোনা পরীক্ষার সংখ্যা কমেছে। জনস্বাস্থ্যবিদেরা দৈনিক অন্তত ২০ হাজার পরীক্ষার কথা বললেও দেশে কখনো এক দিনে ২০ হাজার নমুনা পরীক্ষা হয়নি। আবার দেশে এখন পর্যন্ত যত নমুনা পরীক্ষা হয়েছে তার ১১ দশমিক ৮৫ শতাংশ বিদেশগামী যাত্রীদের। বিদেশগামীরা মূলত নেগেটিভ সনদ নিতে পরীক্ষা করেন। তাঁদের মধ্যে সংক্রমণ শনাক্তের হার ২ শতাংশেরও কম। কিন্তু এই বিদেশগামী যাত্রীদের পরীক্ষার ফলাফলও মোট শনাক্তের হিসাবে দেখানোয় সংক্রমণের সঠিক পরিস্থিতি বোঝা যাচ্ছে না।
আইইডিসিআরের পরামর্শক মুশতাক হোসেন বলেন, করোনা পরীক্ষা করানো নিয়ে লোকজনের মধ্যে অনীহা রয়েছে। বাসায় থেকে অনেকে চিকিৎসা করাচ্ছেন। শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি জটিল হলে হাসপাতালে যাচ্ছেন। তখন তাঁদের জীবন বাঁচাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। লোকজনকে পরীক্ষা করাতে উৎসাহিত করতে সরকারের আরও সক্রিয় উদ্যোগ দরকার।
আরও ১৭ জনের মৃত্যু
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (গত বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) পরীক্ষা করা হয়েছে ১২ হাজার ১০৩টি নমুনা। এ সময় নতুন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে ৯৯০ জন। এ নিয়ে গত এক সপ্তাহের মধ্য তিন দিন এক হাজারের কম রোগী শনাক্ত হয়েছে।
দেশে এখন পর্যন্ত মোট ৫ লাখ ১৪ হাজার ৫০০ জনের দেহে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। আর গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের। এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৭ হাজার ১৫৬ জনের। করোনা সংক্রমণ থেকে সুস্থ হয়েছেন ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৬৫৬ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ১৯৭ জন।