শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:০৪ পূর্বাহ্ন

ত্যাগের উৎসব কোরবানি

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২০
  • ৬৭ জন নিউজটি পড়েছেন

ইসলামের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব-উপলক্ষ কেবলই অর্থ-ব্যয় ও ভোগ-বিলাসের উপলক্ষ নয়; বরং এগুলো আল্লাহ্ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন, তাকওয়ার অনুভূতি সৃষ্টি ও তাঁর অবারিত করুণা লাভের দ্বার উন্মোচিত করে এবং আত্মিক উন্নয়ন, নৈতিক-মানবিক শিক্ষা এবং সামাজিক ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্য সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করে। তদুপরি এই তাৎপর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানগুলোর পেছনে রয়েছে মানুষের বৈষয়িক উন্নতি-অগ্রগতি, শান্তি ও কল্যাণ সাধনের জানা অজানা অনেক রহস্য ও হেকমত। বিশেষ করে, ইসলামের প্রায় প্রতিটি উৎসব-উপলক্ষতেই পিছিয়ে পড়া ও দরিদ্র-অসহায় মানুষের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া হয় এবং ধনী-গরিব নির্বিশেষে সমাজের সব স্তরের মানুষকে সম্মান ও মর্যাদার সাথে এগুলোতে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃিষ্ট করা হয়। ইসলামের কিছু ইবাদত তো এমন যে, এগুলোর উদ্দেশ্যই হলো আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখা। যেমনÑ জাকাত, ফিতরা, কাফফারা ইত্যাদি। ঈদুল আজহা বা কোরবানির উৎসবও এমন একটি মহান উপলক্ষ যা আমাদের আত্মিক উন্নয়নের পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।
আরবিতে ‘আজহা’ শব্দের অর্থ হলো উৎসর্গ ও ত্যাগ। তাই ঈদুল আজহা অর্থ হলো, ত্যাগ বা উৎসর্গের উৎসব। আবার ‘কোরবান’ শব্দের অর্থ হলো ত্যাগ ও নৈকট্য। কোরবানি করা আল্লাহ্ তায়ালার নৈকট্য লাভের একটি মাধ্যম। তাই এই ঈদকে কোরবানির ঈদও বলা হয়। আমাদের দেশে কোরবানির ঈদকে ‘বকরি ঈদ’ নামেও অভিহিত করা হয়। এর একটি কারণ হতে পারে, আমাদের এতদঞ্চলে কোরবানির পশু হিসেবে প্রধানত গরু কোরবানি দেয়া হয়। আর গরু শব্দের আরবি প্রতিশব্দ হলো ‘বাকারা’। এই বাকারা থেকে বকরি ঈদ বা গরু কোরবানির ঈদ। আবার এই ঈদে বকরি কোরবানি করা হয় বলেও এই ঈদকে বকরি ঈদ বলা হয়ে থাকতে পারে।

পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ঈদুল আজহার দিনে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করা, কোরবানির সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করা এবং আল্লাহ্ তায়ালার মহত্ত্ব ও বড়ত্ব ঘোষণা করা একটি মহিমান্বিত ও ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। পবিত্র কুরআনে সূরা কাউসার ও সূরা আন’আমে সালাতের সাথে কোরবানিকে সংযুক্ত করে এর গুরুত্ব বুঝানো হয়েছে। সূরা কাউসারের দ্বিতীয় আয়াতে রাসূলুল্লাহ্ সা:কে এবং তাঁর মাধ্যমে গোটা উম্মতকে সালাতের আদেশের মতো কোরবানি করার আদেশও দেয়া হয়েছে : ‘তোমরা সালাত পড়ো ও কোরবানি করো।’ সূরা আনআমের ১৬২ আয়াতে বলা হয়েছে : ‘(হে রাসূল) আপনি বলুন, নিঃসন্দেহে আমার সালাত, আমার কোরবানি এবং আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু-সমস্ত জগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই। আর ওই বিষয়েই আমাকে আদেশ করা হয়েছে। সুতরাং আমি হলাম আত্মসমর্পণকারীদের প্রথম।’ রাসূলুল্লাহ্ সা: ইরশাদ করেন, ‘কোরবানির দিন কোনো ব্যক্তি (কোরবানির পশুর) রক্ত ঝরানোর মতো আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় ও পছন্দনীয় অন্য কোনো কাজই করে না। জবেহ করা জন্তু কিয়ামতের দিন তার শিং, পশম ও খুর নিয়ে উপস্থিত হবে। কোরবানির রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর দরবারে তা সন্তুষ্টির মর্যাদায় পৌঁছে যায়। অতএব, তোমরা এতে মনের সুখ ও সন্তোষ নিবদ্ধ করো।’ (তিরমিজি, হাকেম, ইবনে মাজাহ) রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘যে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করল না (অর্থাৎ তার কোরবানি করার সংকল্প নেই) সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।’ (মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদিস-৭৬৩৯) প্রিয়নবী সা:-এর ব্যক্তিগত আমল থেকেও কোরবানির গুরুত্ব প্রতীয়মান হয়। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় কখনো কোরবানি ছেড়ে দেননি।
মুসলিম মিল্লাতে পিতা হজরত ইবরাহিম আ:-এর স্মৃতিকে ধারণ করে এবং রাসূলুল্লাহ্ সা:-এর আদর্শ অনুসরণ করে মুসলিমরা যুগ যুগ ধরে কোরবানি করে আসছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে করোনাভাইরাস ‘কোভিড-১৯’-এর প্রকোপে সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও মানুষের আয়-রোজগার কমে গেছে ও অভাবী মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে। এমতাবস্থায় কিছু কিছু মহল থেকে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে যে, এ বছর কোরবানির পেছনে অর্থ খরচ না করে এই অর্থ দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হোক। এই পরামর্শ অবশ্য নতুন কিছু নয়। অতীতেও বন্যা ও দুর্যোগকে উপলক্ষ করে এই আওয়াজ তোলা হয়েছে। এটি নিছক একটি যুক্তি যার পেছনে সারবত্তা নেই। কোরবানির পশু ও কোরবানির ঈদের সাথে যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কমকাণ্ড জড়িত রয়েছে সে বিষয়ে ধারণা থাকলে যে কেউ বুঝতে পারবে, কোরবানি নিছক একটি পশু কোরবানির উৎসব নয়; বরং তা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। এই উৎসব হজ পালন ও পশু কোরবানি সূত্রে সমাজ ও অর্থনীতিতে বিশেষ কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি করে যা ধনী-দরিদ্র প্রতিটি মানুষকে ছুঁয়ে যায়।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English