আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছায় আমরা কেউ ধন-সম্পদ ও বিশাল প্রাচুর্যের অধিকারী; আবার কেউ দরিদ্র, অভাবী বা রিক্তহস্ত। আমাদের কারো সম্পদের হিসাব নেই, সীমা নেই; আবার কারো নুন আনতে পান্তা ফুরায়।’ সবই মহান মাবুদের কারিশমা। আমাদের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব হচ্ছে, নিজ নিজ অবস্থান থেকে দুর্বলদের প্রতি সাধ্যানুযায়ী সাহায্য-সহযোগিতা করা। এটি সম্পদশালীদের ওপর দুর্বল আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও অন্যান্য অভাবগ্রস্তদের জন্য আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত অধিকারও বটে। আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আর আত্মীয়স্বজনকে দাও তার প্রাপ্য, অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও এবং কিছুতেই অপচয় করো না।’ (সূরা ইসরা : ২৬) আল্লাহ অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘তাদের (ধনীদের) সম্পদে রয়েছে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার।’ (সূরা জারিয়াত : ১৯) অথচ আমরা মনে করি, দুর্বল-অভাবগ্রস্তদের প্রতি সাহায্য-সহযোগিতা, দান-সদকা নিছক আমাদের অনুগ্রহ বৈ কিছু নয়।
কেউ কেউ এ কথাও মনে করি যে, আমাদের ওপর সহায়-সম্বলহীন আত্মীয়, প্রতিবেশী বা অন্যান্য অভাবীদের অধিকার শুধু জাকাত আর অন্যান্য ওয়াজিব সদকায়। এর বাইরে সাধারণভাবে ধনীদের সম্পদে তাদের কোনো হক বা অধিকার নেইÑ যা কোনোভাবেই সঠিক নয় বরং ভুল এবং পরিহারযোগ্য ধারণা।
দান-সদকার ফজিলত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘যারা স্বীয় ধন-সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে তাদের উপমা হলো, যেমন একটি শস্যবীজ, তা হতে উৎপন্ন হলো সাতটি শীষ, প্রত্যেক শীষে (উৎপন্ন হলো) শত শস্য এবং আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছে করেন বর্ধিত করে দেন, বস্তুত আল্লাহ হচ্ছেন বিপুল দাতা, মহাজ্ঞানী।’ (সূরা বাকারা : ২৬১) আল্লাহ আরো বলেন, ‘যারা নিজেদের ধন-সম্পদ রাতে ও দিনে, গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তাদের প্রতিদান তাদের রবের নিকট রয়েছে। আর তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। (সূরা বাকারা : ২৭৪) দানশীল ব্যক্তিকে আল্লাহর বন্ধু বলা হয়। নবী করিম সা: ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দানশীল ও মহান হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তিত্ব। তিনি কখনো কোনো সওয়ালকারীকে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেননি। শুধু মুসলিম নয়, অমুসলিম অসহায়দের প্রতিও তাঁর দান-অনুগ্রহ বিস্তৃত ছিল। আম্মাজান হজরত আয়েশা রা: বলেছেন, ‘রাসূল সা:-এর দানের হাত এত প্রসারিত ছিল যে, আমার মনে হয়, সকাল বেলা যদি তাঁর কাছে উহুদ পরিমাণ সম্পদ রাখা হতো, তবে সন্ধ্যার আগেই তিনি সব দান করে দিতেন।’ (বুখারি ও মুসসিম)
হজরত আনাস রা: বলেন, ‘আমি রাসূল সা:-এর চেয়ে অধিক দয়ালু লোক দেখিনি।’ (মুসলিম) উম্মতকে দান-সদকার প্রতি উদ্ধুদ্ধ করে রাসূল সা: বলেছেন, ‘তোমরা খেজুরের সামান্য অংশ সদকা করে হলেও নিজেদের জাহান্নাম থেকে রক্ষা করো।’ (বুখারি ও মুসলিম) রাসূল সা: আরো ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার কোনো মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে সচেষ্ট হয়, মহান আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করে দেন। যে ব্যক্তি অপর ব্যক্তির পার্থিব কষ্ট বা বিপদ দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামত দিবসে তার কষ্ট বা বিপদ দূর করবেন।’ (বুখারি ও মুসলিম) উপর্যুক্ত আয়াত ও হাদিসগুলো থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় যে, দান-সদকার মাধ্যমে বাহ্যিকভাবে সম্পদের হ্রাস পরিলক্ষিত হলেও প্রতিদান হিসেবে আল্লাহর অনুগ্রহ, ভালোবাসা, ক্ষমা ও সমৃদ্ধি অর্জন হয়।
অপর দিকে কৃপণ প্রকৃতির লোকদের সতর্ক করে ইরশাদ হচ্ছে, ‘দুর্ভোগ প্রত্যেক সামনে ও পেছনে নিন্দাকারীর। যে সম্পদ জমা করে ও বারবার গণনা করে। সে মনে করে যে, তার অর্থ চিরকাল তার সাথে থাকবে। কখনো নয়, অবশ্যই সে নিক্ষিপ্ত হবে হুতামায় (জাহান্নাম)।’ (সূরা হুমাযাহ : ১-৪) রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যে মানুষের প্রতি দয়াপরবশ ও সহানুভূতিশীল হয় না, আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন না।’ (বুখারি ও মুসলিম) অন্য হাদিসে রাসূল সা: বলেছেন, ‘আল্লাহ দয়ালুদের প্রতি দয়া করেন। তোমরা দুনিয়াবাসীর প্রতি অনুগ্রহ করো, আকাশের অধিপতি তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করবেন।’ (তিরমিজি) হাদিসে দান-সদকার আরো অনেক ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। যেমন, দান-সদকা বিপদ-বিপর্যয় দূর করে, জীবন বরকতময় করে, গুনাহ মিটিয়ে দেয়, ক্ষমা লাভের মাধ্যম হয়, আল্লাহর ক্রোধ থেকে বাঁচিয়ে রাখে, অসুখ-বিসুখ থেকে সুস্থতা পাওয়া যায়, দোয়া কবুলে সহায়ক হয়, জীবিকায় বরকত লাভ হয়, ইবাদত ও সম্পদের ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর হয়, পবিত্রতা ও সমৃদ্ধি অর্জন হয়। সর্বোপরি, আল্লাহর সাহায্য ও ভালোবাসা লাভ হয় এবং ইমানের সাথে মৃত্যু হয়।