সংস্কৃতি মানে জীবনের পথ বা চলার পদ্ধতি। আজকের বিশ্বে অপসংস্কৃতির আগ্রাসনে মানবসমাজ বিশেষ করে যুবসমাজ ধ্বংসের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। যে গহ্বর থেকে উঠে আসার একটাই পথ খোলা আর তা হচ্ছে ইসলামী সংস্কৃতি।
আগে জানা যাক অপসংস্কৃতি কী, কোথা থেকে এর উৎপত্তি। মূলত মুসলিম উম্মতের অভ্যন্তরে বিজাতীয় যেকোনো জাতির আচার-আচরণ, পোশাক ইত্যাদিসহ সব ধরনের সংস্কৃতির আবির্ভাব ঘটা অপসংস্কৃতি। বাংলাদেশ মুসলিমপ্রধান দেশ হলেও আজ অপসংস্কৃতির আগ্রাসনে মুসলমান তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ভুলে বিজাতীয় সংস্কৃতির চর্চায় সুনাম কুড়াতে তৎপর। বিজাতীয় সংস্কৃতি ধারণ করার ভয়াবহ পরিণতি রাসূল সা: আমাদের আগেই জানিয়ে দিয়েছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্য জাতির সাদৃশ্য ধারণ করল সে তাদেরই দলভুক্ত হলো।’ (সুনানে আবু দাউদ : ৪০৩১)
অতএব, আমরা মুসলিম জাতি যদি জেনেশোনে বিজাতীয় সংস্কৃতিতে মজে থাকি এর পরিণতি আমাদেরই ভোগ করতে হবে। আজ সমাজ এর পরিণতি দেখছে।
যে বা যারা অপসংস্কৃতির আবির্ভাব ঘটাচ্ছে তাদের মর্মান্তিক শাস্তির ঘোষণা রয়েছে, আর তারাই সবচেয়ে ঘৃণার যোগ্য। রাসূল সা: বলেন, ‘তিন প্রকারের লোক আল্লাহর কাছে সর্বাধিক ঘৃণিত, ১. হারাম শরিফের পবিত্রতা বিনষ্টকারী, ২. ইসলামে বিজাতীয় রীতি-নীতির (সংস্কৃতির) প্রচলনকারী, ৩. কোনো মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যার প্রচেষ্টাকারী। (বুখারি)
প্রকৃত সংস্কৃতিমানদের বৈশিষ্ট্য : প্রকৃত সংস্কৃতিমান তারাই, যারা-ঈমানদার, নেককার এবং বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করে। আল্লাহ বলেন, ‘কবিদেরকে তো বিভ্রান্ত লোকেরাই অনুসরণ করে। তুমি কি লক্ষ করোনি যে, তারা প্রত্যেক উপত্যকায় উ™£ান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়? আর নিশ্চয় তারা এমন কথা বলে, যা তারা করে না। তবে যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, আর আল্লাহকে অনেক স্মরণ করেছে। আর তারা নির্যাতিত হওয়ার পর প্রতিশোধ নেয়। আর জালিমরা শিগগিরই জানতে পারবে কোন প্রত্যাবর্তন স্থলে তারা প্রত্যাবর্তন করবে। (সূরা শুআরা : ২২৫-২৫৭) মূলত যাদের মাঝে ঈমান নেই তারা বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্টঅভিযাত্রী, ইসলাম এনে দেয় সুস্থ সংস্কৃতি।
সর্বোত্তম সাংস্কৃতিক মনের পরিচায়ক : আল্লাহর রঙ ধারণ করাই সর্বোত্তম সাংস্কৃতিক মনন। যেই মনের ফুলবাগিচায় আল্লাহর রঙ লেগেছে, সেই মনন পরিপূর্ণ প্রস্ফুটিত। কারণ, সৃষ্টিকর্তার রঙ হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ রঙ। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর রঙে রঞ্জিত হও। আর রঙের দিক দিয়ে আল্লাহর চেয়ে কে বেশি সুন্দর? আর আমরা তারই ইবাদতকারী।’ (সূরা বাকারা-১৩৮)
আল্লাহর রঙ হলো : আল্লাহর দ্বীন বা ইসলাম। নাসারাদের দ্বীনের আত্মপ্রকাশের আগে ইহুদিদের মধ্যে একটি বিশেষ রীতির প্রচলন ছিল। কেউ তাদের গ্রহণ করলে তাকে গোসল করানো হতো। আর তাদের ওখানে গোসলের অর্থ ছিলÑ তার সমস্ত গোনাহ যেন ধুয়ে গেল এবং তার জীবন যেন রঙ ধারণ করল। পরবর্তীতে নাসারাদের মধ্যেও এ রীতির প্রচলন হয়। তাদের ওখানে এর পরিভাষিক নাম হচ্ছেÑ ইসতিবাগ বা রঙিন করা (ব্যাপ্টিজম)। তাই বলা হয়েছে, এ লোকাচারমূলক রঞ্জিত হওয়ার যৌক্তিকতা কোথায়? বরং আল্লাহর রঙে রঞ্জিত হও। যা কোনো পানির দ্বারা হওয়া যায় না।
ইসলামী সংস্কৃতির চর্চা : ইসলামী সংস্কৃতির চর্চা এনে দিতে পারে সুস্থ সংস্কৃতি, আর একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে সংস্কৃতির সুস্থতা।
রাসূল সা: বানু কুরাইজাহর সাথে যুদ্ধের দিন হাসইবনু সাবিত [৩৯] রা: বলেছিলেন (কবিতা আবৃতি করে) মুশরিকদের দোষত্রুটি তুলে ধরো। এ ব্যাপারে জিবরাইল আ: তোমার সঙ্গী। হাসসান ইবনু সাবিত রা:কে রাসূলুল্লাহ সা:-এর কবি বা ইসলামের কবি বলা হতো। কারণ, কাফির কবিরা যেমন আল্লাহর রাসূল ও ইসলামের বিরুদ্ধে কুৎসা ও বদনাম করত তেমনি তিনিও কাফিরদের কবিতা ও সাহিত্যের মাধ্যমে তার জবাব দিতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৪১২৪)
সংস্কৃতির মূল শিক্ষক : আজ বিশ্বব্যাপী যার আচরণ শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে সবার কাছে, তিনি আদর্শ সংস্কৃতির শিক্ষক। তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র,পদচারণা শ্রেষ্ঠত্বের দৃষ্টান্ত রেখে গেছে যা ধারণে আমরা তাঁর শ্রেষ্ঠ উম্মতের মর্যাদার অধিকারী হতে পারব। রাসূল সা: বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা বিধানের জন্য প্রেরিত হয়েছি।’ (কানজুল উম্মাল)
মুসলিম পিতার আদর্শকে অনুসরণ : ইবরাহিম আ: মুসলিম জাতির পিতা এবং আল্লাহর বন্ধু। আমাদেরকে সৎকর্মপরায়ণ হতে হলে অবশ্যই ইবরাহিম আ:-এর আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। আল্লাহ বলেনÑ ‘তার চেয়ে দ্বীনে আর কে উত্তম যে সৎকর্মপরায়ণ হয়ে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং একনিষ্ঠভাবে ইবরাহিমের মিল্লাতকে অনুসরণ করে? আর আল্লাহ ইবরাহিমকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন।’ (সূরা নিসা : ১২৫)
কুরআনের কথা ও বক্তব্যের উৎস : কুরআনের মাধ্যমেই মহান আল্লাহ আমাদের উত্তম কথা ও বক্তব্য শিক্ষা দিয়েছেন। অপসংস্কৃতির অপনোদনের জন্য কুরআন সঠিক শিক্ষা দিয়ে থাকে। এতে বলা হয়েছে, ‘তিনি পরম করুণাময় আল্লাহ, যিনি কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তাকে শিক্ষা দিয়েছেন কথা, বক্তব্য বর্ণনা।’ (সূরা আর রাহমান : ১-৪)
এখানে বাইয়ানের একটি অর্থ হচ্ছেÑ মনের ভাব প্রকাশ করা। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছেÑ পার্থক্য ও বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট করে তোলা। বাকশক্তি এমন একটি বিশিষ্ট গুণ যা মানুষকে জীবজন্তু ও পৃথিবীর অন্যান্য সৃষ্টিকুল থেকে পৃথক করে দেয়। (কুরতুবি) বিভিন্ন জাতির বিভিন্ন বাকপদ্ধতি সবই এর অন্তর্ভুক্ত। আর তাই কুরআনই উত্তম সংস্কৃতির উৎস।
মুনাফেকির উৎস : অপসংস্কৃতি ও অশ্লীলতা মুনাফেকির জন্ম দেয়। মুসলিম উম্মতের জন্য চরিত্র ধ্বংস করতে এটুকুই যথেষ্ট। চরিত্র রক্ষার তাগিদে প্রতিটি ব্যক্তির দায়িত্ব ও কর্তব্য উত্তম সংস্কৃতি আঁকড়ে ধরা; দেশ ও উম্মতের কল্যাণে তৎপরতা চালানো যাতে ইসলামী সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে।
জাবের রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, ‘গান-বাজনা মানুষের অন্তরে মুনাফেকি উৎপন্ন করে।’ (বায়হাকি)
দেশ ও জাতির কল্যাণে অপসংস্কৃতির উৎস সমূলে উপড়ে ফেলতে হবে। ভিন্ন জাতির অনুসরণ দমনে ইসলামী সংস্কৃতির চর্চা বৃদ্ধির জন্য সচেষ্ট হতে হবে। আর ইসলামের যেকোনো অঙ্গনের চর্চাই এর প্রতিষেধক। হতে পারে সঙ্গীত, কাব্য, অঙ্কন, অনুপ্রেরণার গল্পসহ শিল্পের আনাচে-কানাচে ইসলামের জাগরণী শিল্প-সাহিত্য।