রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:৩৭ অপরাহ্ন

নবী সা:-এর অবমাননা ব্যতিক্রম কেন

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ বুধবার, ১১ নভেম্বর, ২০২০
  • ৩৩ জন নিউজটি পড়েছেন

বর্তমান পৃথিবীতে ইসলামসহ সব ধর্মের সম্মান সব দেশের সংবিধানে কমবেশি সংরক্ষিত রয়েছে এবং এক ধর্মের অনুসারীদের অন্য ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও অবমাননা না করার সৌজন্যমূলক ব্যবস্থাটি লালিত হয়ে আসছে এক আন্তঃধর্মীয় রীতিতে। এরপরও সময় সময় অনেককেই বিভিন্ন ধর্মের প্রতি বিষোদগার করতে দেখা যায়। যেকোনো ধর্ম কোনো না কোনোভাবে আক্রমণের শিকার হলেই সংশ্লিষ্ট ধর্মানুসারীরা বিক্ষুব্ধ হন, প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। তবে অনেকেই প্রশ্ন তুলতে চেষ্টা করেন কিংবা স্পষ্টতই অভিযোগ করেন যে, শুধু ইসলাম ধর্মের অনুসারীরাই কেন একটু বেশি প্রতিক্রিয়া দেখান নিজ ধর্ম আক্রান্ত হলে? প্রশ্নটা সরল। তবে এর উত্তরটা হবে নাতিদীর্ঘ ব্যাখ্যাসাপেক্ষ।
ইসলামের অনুসারীরাই যে শুধু তীব্র প্রতিবাদ করেন, আর অন্য ধর্মের অনুসারীরা যার যার ধর্ম আক্রান্ত হলে বরফশীতল সহিষ্ণুতা দেখান, তা কিন্তু নয়। তবে, মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া একটু তীব্র হয় বলে যে অনেকেই অভিযোগ করেন, তা বেশ আলোচনাসাপেক্ষ। মনে রাখতে হবে, ইসলাম ধর্ম ও এর প্রবর্তক নবী মুহাম্মদ সা:-এর কিছু স্বাতন্ত্র্য লক্ষণীয়, যা ঠিক অন্য সব ধর্ম ও তার প্রবর্তকদের মধ্যে অনুপস্থিত। নবী মুহাম্মদ সা:-এর জীবনের আলাদা আলাদা বিষয় যেমনÑ রাজনীতি ও রাষ্ট্রপরিচালনা, অর্থনৈতিক সাফল্য, সামাজিক নিরাপত্তা, নিজস্ব চারিত্রিক উৎকর্ষ, বিশ্বস্ততার ক্ষেত্রে অমুসলিমদের দ্বারাও স্বীকৃতি, কথাকে কাজে পরিণত করতে পারার হার, যুদ্ধবিগ্রহ ও যুদ্ধবন্দীদের সাথে পরম মানবতামূলক আচরণের প্রদর্শন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, নিজ ধর্ম পালন এবং অনুসারীদের ভক্তি-শ্রদ্ধা ইত্যাদি বিবেচনায় তিনি অনেক অমুসলিমের তালিকাতেই শীর্ষে।
খ্রিষ্টান লেখক মাইকেল এইচ হার্ট তার বিখ্যাত ‘দ্য হান্ড্রেড : আ র্যাঙ্কিং অব দ্য মোস্ট ইনফ্লুয়েনশিয়াল পারসন্স ইন হিস্ট্রি’ বইতে ইতিহাসের ১০০ জন সফল ও প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় ইসলামের নবী মুহাম্মদ সা:কে প্রথম স্থানে রেখেছেন তার কর্মমুখর অনুপম ব্যক্তিত্বের জন্য। সেই ১০০ জনের তালিকায় যখন রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিদ, সমাজসেবক এবং বহু ধর্মবিদও রয়েছেন, তাই সেই তালিকার শীর্ষস্থানের ব্যক্তিটি নিঃসন্দেহে ওইসব বিষয়েই সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। অন্য ধর্মের প্রবর্তকদের থেকে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তকের স্বাতন্ত্র্য এখানেই পরিষ্কার। অপরদিকে ইসলাম ধর্মেরও স্বাতন্ত্র্য লক্ষণীয়। আসমানি তথা ঐশী গ্রন্থের মর্যাদা মনুষ্যরচিত ধর্মগ্রন্থের চেয়ে গুরুত্ব বেশি। তবে প্রসিদ্ধ চারটি আসমানি গ্রন্থের (তাওরাত, জাবুর, ইঞ্জিল ও কুরআন) মধ্যেও আবার প্রথম তিনটিরই তাদের অবতরণের সময়কার চেহারায় না থাকা, বরং বিকৃত হয়ে যাওয়া এবং ইসলামের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কুরআনের অদ্যাবধি অবিকৃত থাকাটাই আসমানি গ্রন্থসমূহের মধ্যেও কুরআনের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে শুধু নীতিবাক্যেরই সমাহার দেখা যায়। মহাজগৎ ও মনুষ্যসৃষ্টি সম্বন্ধে কোনো কিছুর উল্লেখ পাওয়া যায় না। এসবের সুস্পষ্টতই বিপরীত আল কুরআন।
কুরআনের রচয়িতা আল্লাহ তায়ালা স্বগর্বে বলেছেন, তিনিই আসমান-জমিন, মহাজগৎ ও মনুষ্যের স্রষ্টা। অন্য কোনো ধর্মের প্রবর্তক এসব অনবদ্য সৃষ্টির জন্য নিজেদের স্রষ্টা হিসেবে দাবি করতে পারেননি। কারণ শুধু দাবি করলেই হবে না, স্রষ্টা দাবি করতে হলে দিতে হবে আপন সৃষ্টির সৃষ্টিকালীন যাবতীয় তথ্য। যা আল্লাহ তায়ালা তাঁর মনোনীত গ্রন্থ আল কুরআনে দিয়েছেন। যেমন, মহাজগতের সব কিছুই যে প্রথমে একবিন্দুতে পুঞ্জীভূত ছিল এবং পরবর্তী কোনো একসময় পুঞ্জীভূত সব কিছু আল্লাহ পাকের ইচ্ছায় (হালের পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের মতে যা ‘বিগ ব্যাং’ বা মহাবিস্ফোরণ থিওরি নামে পরিচিত) দিগি¦দিক ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়ে আবিষ্কৃত এরকম আরো বহু বৈজ্ঞানিক সূত্র আল্লাহ দেড় হাজার বছর আগে আল কুরআনে বলে দিয়েছেন। (প্রাসঙ্গিক বলে এখানে শুধু একটির কথা বলা হলো। কেননা এ ব্যাপারে স্বতন্ত্রভাবে দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন)।
ইসলাম ধর্মের শিকড়গত এমন বাস্তবিকতার কারণে মুসলিমরা নিজ ধর্মের ব্যাপারে অন্য সবার চেয়ে বেশি অনুভূতিপ্রবণ এবং ইসলামের এমন বাস্তবিকতার কারণে বিশ্বে দিন দিন মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে স্বঘোষিত নাস্তিক তসলিমা নাসরিনেরই লেখা কলামে। তিনি লেখেনÑ ‘২০০ কোটি লোক পৃথিবীতে মুসলমান। দিন দিন এই সংখ্যাটি বাড়ছে। এই ধর্ম নিয়ে গেল গেল রব তোলার কোনো অর্থ হয় না। মুসলমানরা যত গভীরভাবে ধর্মে বিশ্বাস করে, সেরকম গভীরভাবে অমুসলিমরা তাদের ধর্মে বিশ্বাস করে না। ইহুদি এবং খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অধিকাংশই ধর্মে নয়, বিজ্ঞানে বিশ্বাসী। সুতরাং ধর্ম টিকে থাকলে ইসলামই টিকে থাকবে। এই ধর্মই সারা বিশ্বে দাপিয়ে বেড়াবে।’ (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৯ অক্টোবর ২০২০)। উপরোক্ত আলোচনার পর এ কথা বলার কোনো সুযোগ থাকে না যে, অন্য সব ধর্মকে নিয়ে ঠাট্টা করা হলে তার অনুসারীরা তো এতটা প্রতিক্রিয়া দেখায় না। সেই সাথে নবী সা:-এর অবমাননা হলে এটা শুধু মুসলমানদের ক্ষোভের বিষয় নয়, বরং নবীকে শ্রেষ্ঠ মানব হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া বহু অমুসলিমেরও অবমাননা। তা ছাড়া নবী সা: শুধু মুসলমানদের জন্যই রহমত নন, বরং গোটা মানবজাতির জন্যই তিনি রহমত। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমাকে (হে মুহাম্মদ) বিশ্বজগতের প্রতি শুধু রহমত করেই পাঠিয়েছি।’ (সূরা আম্বিয়া, আয়াত-১০৭)
তবে ইসলাম বা নবীর অবমাননা হলেও ইসলামী খেলাফতের অবিদ্যমানে গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় ব্যক্তি উদ্যোগে কাউকে হত্যা বিচারবহির্ভূত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলে বিবেচিত হবে। ধর্ম অবমাননা হলে ইসলামী খেলাফত ব্যবস্থায়ও ব্যক্তি উদ্যোগে ধর্ম অবমাননাকারীকে হত্যার কোনো বিধান নেই, তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবেন খলিফা নিজে। চোরাগোপ্তা হত্যাকাণ্ডে বরং ইসলামের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণœ হয়। আর কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের উপাসনালয়ে হামলা বা সেখানে হত্যাকাণ্ড আরো জঘন্যতম অপরাধ।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English