ঠাঁই নেই কোথাও। লঞ্চঘাট থেকে শুরু করে বাস টার্মিনাল, রেলওয়ে স্টেশন। সর্বত্রই যাত্রীদের ভিড়। ঈদযাত্রার মতো বাড়ি যাচ্ছে মানুষ। ৭ দিনের লকডাউনের খবর শুনে পরিবার পরিজন নিয়ে গতকাল বাড়ি যাওয়ার হিড়িক পড়ে। অথচ স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রতি কারো ভ্রূক্ষেপ দেখা যায়নি কোথাও। সিট না পেয়ে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন অনেকে। স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংক্রমণ ঠেকাতেই সরকার লকডাউনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কিন্তু মানুষে যেভাবে স্বাস্থ্যবিধি ও সরকারি নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে ঢাকা ছাড়ছে এতে করে সংক্রমণ আরো বেড়ে যেতে পারে। যারা বাড়ি যাচ্ছেন তারা সঙ্গে করে ভাইরাসও নিয়ে যাচ্ছেন। এখন গ্রামেও সংক্রমণ ছড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত শনিবার সরকারের তরফ থেকে লকডাউনের ঘোষণা আসার পর থেকেই বাড়ি যাবার প্রস্তুতি শুরু করে ঢাকায় কর্মরত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ওই দিন বিকালেই অনেকে ঢাকা ছেড়ে গেছেন। সন্ধ্যার পর থেকে বাস টার্মিনাল, রেল স্টেশন ও লঞ্চঘাটে স্বাভাবিক দিনের যাত্রীদের তুলনায় অতিরিক্ত যাত্রীদের উপস্থিতি দেখা গেছে। টিকিট না পেয়ে অনেকেই আবার গতকাল টিকিট কিনে বাসায় চলে আসেন। তবে গতকাল সকাল থেকেই এসব স্থানে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। যাত্রীরা জানিয়েছেন, গত বছরের লকডাউনে পরিচিত অনেকেই ঢাকায় আটকা পড়েছিলেন। দীর্ঘদিন লকডাউন থাকায় কর্মহীন হয়ে অনেকে দুঃসময় পার করেছেন। জরুরি প্রয়োজনেও বাড়ি যাওয়ার উপায় ছিল না। তাই এ বছর তারা আর এই ভুল করছেন না। যাত্রীদের দাবি স্বাস্থ্যবিধি মেনেই তারা পরিবার নিয়ে গ্রামে যাচ্ছেন। লকডাউন সাত দিন থেকে বেড়ে ঈদ পর্যন্ত যাবে এমনটাও বলাবলি করছে মানুষ।
গতকাল সরজমিন কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেল স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, হাজার হাজার যাত্রী ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। নির্ধারিত গন্তব্য ও রুটের আন্তঃনগর ট্রেন আসা মাত্র অনেকেই ট্রেনে উঠার চেষ্টা করেন। কিন্তু সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী অর্ধেক যাত্রী নিয়ে ট্রেন চলাচল করায় অনেককে ট্রেনে উঠতে দেয়া হয়নি। যাত্রীদের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছিলেন ট্রেন কর্তৃপক্ষ। বাধা উপেক্ষা করে যাত্রীরা ট্রেনে করেই বাড়ি ফিরেছেন। আর বিভিন্ন গন্তব্যের লোকাল ট্রেনের অবস্থা ছিল শোচনীয়। লোকাল ট্রেনের ডাবল সিটে ৪-৫ জন করে যাত্রী বসেন। এ ছাড়া যাত্রীর চাপে দাঁড়িয়ে যাওয়ার উপায় ছিল না। সিলেটগামী যাত্রী সেলিম মিয়া বলেন, আমি একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। ছোটখাটো প্রতিষ্ঠান লকডাউনে খোলা থাকবে না বলে মালিক জানিয়েছেন। তাই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাড়ি চলে যাচ্ছি। ট্রেনের কোনো টিকিট পাইনি। সিলেটগামী যে ট্রেনে উঠতে পারবো ওই ট্রেনেই চলে যাবো। সিরাজগঞ্জগামী ট্রেনের যাত্রী আলম হোসেন বলেন, শুনেছি লকডাউন আরো বাড়বে। লকডাউনে ঢাকায় কোনো কাজকর্ম থাকবে না। তাই আমরা চারজন সিরাজগঞ্জ চলে যাচ্ছি। সেখানে গিয়ে কোনো কাজ পেলে করবো। লকডাউন শেষ হলে আবার ঢাকায় ফিরে আসবো।
সায়েদাবাদ, মহাখালী ও গাবতলী বাস টার্মিনালে যাত্রীদের ভিড় ঈদযাত্রাকে হার মানায়। কারণ ঈদে কয়েকদিন ধরে মানুষ বাড়ি যায়। কিন্তু লকডাউন ঘোষণার পর একদিন সময় পেয়ে মানুষের ঢল নামে টার্মিনালগুলোতে। প্রতিটি টার্মিনালে বিভিন্ন কোম্পানির বাস কাউন্টারে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। বাসের জন্য অপেক্ষা ও টিকিট করতে গিয়ে যাত্রীদের ঠেলাঠেলি করতে হয়েছে। অনেক বাসই ৬০ শতাংশ বর্ধিত ভাড়ায় অর্ধেক যাত্রী নিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা মানেনি। সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ডে বাহ্মণবাড়িয়ার জহিরুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও সিট মিলছে না। দুই ঘণ্টা থেকে দাঁড়িয়ে আছি। ঈদের মতো অবস্থা হয়েছে। এতো মানুষ বাড়ি যাবে ভাবতে পারিনি। ঢাকায় সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করি। ভাবলাম, করোনাকালে কাজ পাবো না। তাই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাড়ি চলে যাচ্ছি। ঢাকা থেকে করোনা নিয়ে বাড়ি যাচ্ছেন কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এসব চিন্তা করলে তো কিছুই হবে না। ঢাকায় থেকেও কোনো লাভ নেই। চট্টগ্রামগামী যাত্রী শিহাব হোসেন বলেন, লকডাউনে আমার অফিস বন্ধ থাকবে। তাই ঢাকায় থাকার প্রয়োজন মনে করছি না। সামনে রোজা আসছে। পরিবারের সঙ্গেই রোজা পালন করবো। মহাখালী বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইলগামী যাত্রীদের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা নেই। টিকিট কাউন্টারগুলোতে লম্বা লাইন। অনেক কোম্পানির কাউন্টারে টিকিটের হাহাকার। ডাবল ভাড়া দিয়েও টিকিট মেলেনি। ময়মনসিংহগামী যাত্রী সালেক হোসেন ও মিনু রহমান দম্পতি জানান, রোজার কিছুদিন আগে বাড়ি যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে লকডাউনের ঘোষণা চলে এলো। এখন না গেলে আর যাওয়া যাবে না। তাই তাড়াহুড়া করে চলে যাচ্ছি। টাঙ্গাইলগামী যাত্রী সোরহাব বলেন, ছোটখাটো ব্যবসাবাণিজ্য ছিল। লকডাউনে এসব করা যাবে না। বাড়ি থেকে মা ফোন করে বলেছেন, যাতে বাড়ি চলে যাই। তাই বাস টার্মিনালে এসেছি। এখানে এসে বোকাবনে গেছি। কোনো বাসেই জায়গা নেই।
এদিকে সদরঘাটের লঞ্চ টার্মিনালেও গতকাল সকাল থেকে যাত্রীদের ভিড় ছিল। লঞ্চের ছাদ থেকে শুরু করে প্রতিটা স্থানেই যাত্রীদের গাদাগাদি ছিল। লকডাউনের ঘোষণায় পরিবার পরিজন, মোটরসাইকেলসহ অনেকেই বিভিন্ন আসবাবপত্র নিয়ে বাড়ি গেছেন।