গত ছয় মাসে দেশের ৬০টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১৫টি ব্যাংক এক হাজার ৬০০ কোটি টাকার মতো তহবিল গঠন করেছে। এর মধ্যে বিনিয়োগ হয়েছে ৩০০ কোটি টাকারও কম। এতে তারল্য সংকটের দৈন্যদশা থেকে বের হতে পারছে না পুঁজিবাজার।
পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়াতে একের পর এক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বেশির ভাগ ব্যাংকই হাত গুটিয়ে বসে আছে। বর্তমানে এ বাজারে ব্যাংকগুলোর গড়ে যে বিনিয়োগ রয়েছে, তা আইনি সীমার অর্ধেকেরও কম। আইনি সীমার বাইরে প্রত্যেকটি ব্যাংকে অতিরিক্ত ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হলেও তাতেও আশানুরূপ সায় মিলছে না। গত ছয় মাসে দেশের ৬০টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১৫টি ব্যাংক এক হাজার ৬০০ কোটি টাকার মতো তহবিল গঠন করেছে। এর মধ্যে বিনিয়োগ হয়েছে ৩০০ কোটি টাকারও কম। এতে তারল্য সংকটের দৈন্যদশা থেকে বের হতে পারছে না পুঁজিবাজার। ফিরছে না কাঙ্ক্ষিত গতিশীলতা।
বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, এককভাবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের মোট মূলধনের ২৫ শতাংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারে। ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান ও মার্চেন্ট ব্যাংক মিলে (কনসুলেটেড) বিনিয়োগের অনুমোদিত সীমা ৫০ শতাংশ। কিন্তু টানা দরপতনে শেয়ারের দাম কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের পরিমাণ কমে গেছে। প্রায় সব ব্যাংকেরই বিনিয়োগ সীমার অনেক নিচে আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর গড় বিনিয়োগ রয়েছে মাত্র ১১ শতাংশ। ফলে আইনি সীমার মধ্যেই ব্যাংকগুলোর আরো ১৪ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ বাড়াতে পারে। এই ১৪ শতাংশ বিনিয়োগ টানতে পারলে পুঁজিবাজারে তারল্য সংকট বলে কিছু থাকত না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু বিভিন্ন কারণে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে আগ্রহ কম ব্যাংকগুলোর।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে পুঁজিবাজারে ব্যাংক বিনিয়োগ করছে না। অনেক ব্যাংকেরই কিছু তারল্য সমস্যা আছে। প্রভিশন ঘাটতিও রয়েছে বেশ কয়েকটির। এ ছাড়া পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে কতটা লাভবান হতে পারবে এমন হিসাব-নিকাশ এবং অবিশ্বাস থেকেও ব্যাংকগুলো আগ্রহ কম দেখাচ্ছে বলে মনে হয়।
পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়াতে এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য প্রতিটি ব্যাংককে ২০০ কোটি টাকা বিশেষ তহবিল গঠনের সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পুঁজিবাজারের এই বিনিয়োগ নির্ধারিত আইনি সীমার বাইরে রাখা হয়। ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই সুযোগ রাখা হয়েছে। এই সুযোগ সব ব্যাংক নিলে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ পুঁজিবাজারে আসবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাপ্ত তথ্য মতে, এখন পর্যন্ত মাত্র ১৫টি ব্যাংক পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করেছে। এর মধ্যে একবারে ২০০ কোটি টাকার তহবিল গঠন করেছে এ রকম ব্যাংকের সংখ্যাও নামমাত্র। ফলে এসব ব্যাংকের তহবিলের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র ২৮৪ কোটি টাকা। বাকি প্রায় ৪৫টি ব্যাংকের তহবিল গঠনের কোনো সায় নেই।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, ‘ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে। এর কারণ হচ্ছে, এখানে বিনিয়োগ করে নিজেরা অনৈতিক সুবিধা পায় না। কিন্তু অন্য জায়গায় ঋণ দিলে সেটা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে উদাসীন থাকে। তাঁর মতে, ব্যাংকগুলো প্রকৃত অবস্থা যাঁচাই-বাছাই করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করলে ঠকার কোনো কারণ নেই। অন্তত ঋণখেলাপি হওয়ার চেয়ে এখানে বিনিয়োগ ব্যাংকের জন্য লাভজনকই হবে। বিনিয়োগ সুরক্ষিত থাকবে।’
জানা যায়, ২০১৯ সালের মাঝামাঝি থেকে পুঁজিবাজারে ক্রমাগত পতনে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের প্রস্তাবনা ছিল একটি বিশেষ তহবিল গঠনের। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনে সরকারের বিভিন্ন মহলে প্রস্তাব করা হয়েছিল। সে প্রস্তাবে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের আশ্বাস ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ইতিবাচক মনোভাবের পর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে গত ১০ ফেব্রুয়ারি এই বিশেষ তহবিল গঠনের নির্দেশ দিয়ে সার্কুলার জারি করা হয়।
এর আগে পুঁজিবাজারে আইনি সীমার মধ্যেই বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যাংকগুলোকে আগ্রহী করতে তাদের হাতে থাকা ট্রেজারি বিল ও বন্ড বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বন্ধক রেখে রেপোর আওতায় তহবিল নিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর একটি সার্কুলার জারি করা হয়। ওই সার্কুলার অনুযায়ী, যেসব ব্যাংকের বিনিয়োগসীমা ২৫ শতাংশের নিচে রয়েছে তাদের রেপোর মাধ্যমে (ট্রেজারি বিল ও বন্ড বন্ধক রেখে) বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে ধার নেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়। তহবিল পেতে আবেদনের সময় দেওয়া হয়েছিল তিন মাস। গত ৩১ ডিসেম্বর এ সময়সীমা শেষ হয়েছে। কিন্তু পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগে ব্যাংকগুলো সাড়া দেয়নি। সার্কুলার জারির পর মাত্র একটি ব্যাংক এ সুযোগ নিয়েছিল।