সব বিষয়ের সীমারেখা থাকা আবশ্যক। সেদিক বিবেচনায় আল্লাহওয়ালা হোক বা সাধারণ মানুষই হোক, তাদের ক্ষেত্রেও শ্রদ্ধা, ভক্তি, সম্মান ও মহব্বতের একটা সীমারেখা থাকা আবশ্যক। ইসলাম এর সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে। আল্লাহওয়ালাদের তালিকায় সর্বাগ্রে রয়েছেন আম্বিয়ায়ে কেরাম আ:। আর তাঁদের সর্দার হলেন আমাদের প্রিয়নবী সা:। একজন মুমিনের অন্তরে তাঁর মহব্বত থাকতে হবে সব সৃষ্টির ঊর্ধ্বে। আম্বিয়ায়ে কেরাম আ:-এর পরে সাহাবায়ে কেরাম রা:, তাঁদের পর তাবেয়ি, তাবে তাবেয়ি ও আইম্মায়ে দ্বীনকে সম্মান করা। সর্বোপরি মর্যাদানুসারে উলামা-মাশায়েখ, নেককার-দ্বীনদার ব্যক্তিদের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা করার শরিয়তের তাকিদ রয়েছে।
তবে এতটুকু করে শরিয়ত ক্ষান্ত হয়নি। বরং ভক্তি-শ্রদ্ধার মাপকাঠিও নির্ধারণ করেছে। হাদিসে উল্লেখ আছে, ‘হজরত ইবনে আব্বাস রা: হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সা:-এর সাথে এক ব্যক্তি কথোপকথনের মাঝে বলল, আল্লাহ ও আপনি যা ইচ্ছা করেন। রাসূলুল্লাহ সা: তাকে বললেন, তুমি আমাকে আল্লাহর সমকক্ষ বানাচ্ছ? বরং বলো! একমাত্র আল্লাহই যা ইচ্ছা করেন।’ (মুসনাদে আহমাদ : ৩২৩৭)
যাকে ভালোবাসব তার প্রশংসা করা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু তাতেও সীমাবদ্ধতা থাকা চাই। হাদিসের এসেছে, ‘হজরত ওমর রা: বলেন, আমি নবী করিম সা:-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে অতিরঞ্জিত করো না; যেমন খ্রিষ্টানরা হজরত ঈসা আ:-এর ব্যাপারে অতিরঞ্জিত করেছে। আমি তো আল্লাহর একজন বান্দা মাত্র। আমাকে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল বলো।’ (সহিহ বুখারি : ৩৪৪৫)
রাসূল সা:-এর মর্যাদা সৃষ্টির সবার ঊর্ধ্বে। সুতরাং তাঁর মর্যাদার কোনো তুলনাই হয় না। কিন্তু সে মর্যাদা যদি আল্লাহর কোনো সিফাতের সাথে মিলে যায়, তাহলে সে তাওহিদকে বিনষ্ট করে দিলো। যা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাসূল সা:সহ আম্বিয়ায়ে আ:দের আবির্ভাব হয়েছে। হাদিসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে শিখখীর রা: বলেন, আমি বনি আমেরের প্রতিনিধি দলের সাথে হুজুর সা:-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে বললাম, আপনি আমাদের সায়্যিদ তথা মুনিব। এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, মুনিব তো একমাত্র আল্লাহ। এ কথায় আমরা আরজ করলাম, আপনিই তো আমাদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান ও সম্মানিত ব্যক্তি। এটি শুনে রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন, হ্যাঁ! এতটুকুই বলতে পারো বা তার চেয়ে কম। তবে সাবধান থেকো! শয়তান যেন তোমাদের এ ব্যাপারে এতটুকু দৃষ্ট না বানিয়ে ফেলে।’ (সুনানে আবু দাউদ : ৪৭৯৬)
পৃথিবীর সব মানুষের চেয়ে রাসূলুল্লাহ সা:-এর পদমর্যাদা তুলনাহীন। তার পরও এই পদমর্যাদা যেন মহান প্রভুর সীমারেখায় শরিক না হয়, তাতে সাহাবায়ে কেরামগণকে সতর্ক করে দিয়েছেন। হজরত আনাস রা: হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সা:-কে উদ্দেশ করে বলল, হে মুহাম্মদ! হে আমাদের সর্দার! হে আমাদের সর্দারের ছেলে! হে আমাদের সর্বোত্তম ব্যক্তি! হে আমাদের সর্বোত্তম ব্যক্তির ছেলে! এ কথা শুনো রাসূল সা: ইরশাদ করেন. লোক সকল! তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো। শয়তান যেন তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট করতে না পারে। আমি আবদুল্লাহর ছেলে মুহাম্মদ। আমি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। আল্লাহর কসম! আমি পছন্দ করি না ওই মর্যাদা ও স্থানের; যার ঊর্ধ্বে উঠাবেÑ যে মর্যাদা ও স্থানে আল্লাহ আমাকে সমাসীন করেছেন।’ (মুসনাদে আহমাদ : ১২১৪১)
সিজদার উপযুক্ত সে-ই যে ইবাদতের উপযুক্ত। তিনি হলেন মহান আল্লাহ। তাঁকে ব্যতীত পৃথিবীতে কারো সামনে সিজদা করা শিরক। কেননা, ইবাদতের সাথে এর সামঞ্জস্যতা রয়েছে। এ ব্যাপারেও রাসূলুল্লাহ সা: সতর্ক করেছেন। আয়েশা সিদ্দিকা রা: হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: কিছু আনসার ও মুহাজিরদের মাঝে ছিলেন। এমতাবস্থায় একটি উট এসে তাঁকে সিজদা করল। তা দেখে সাহাবায়ে কেরামগণ রা: বললেন, হে রাসূলুল্লাহ সা:! গাছ-পালা, পশু-পাখি পর্যন্ত আপনাকে সিজদা করে। অথচ সিজদা করার হক আমাদের বেশি। তিনি সা: ইরশাদ করলেন, (না) তোমরা স্বীয় প্রভুর ইবাদত করো এবং তোমাদের ভাইয়ের সম্মান করো। যদি আমি কাউকে (অভিবাদন স্বরূপ) সিজদা করার অনুমতি দিতাম, তাহলে স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে সিজদা করার অনুমতি দিতাম। (মুসনাদে আহমাদ : ২৩৯৫০)
মোট কথা, রাসূলুল্লাহ সা: সমগ্র জগতের আদর্শ ও পথপ্রদর্শক। তাঁকে সম্মান, ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসার মাধ্যমে জাতিকে শিখানো হয়েছে সীমারেখা। কিন্তু সমাজে দেখা যায় আল্লাহর দেয়া এই সীমা অতিক্রম করে চলছে কিছু মানুষ বা গোষ্ঠী। নিচ্ছে মানুষের সিজদা। করছে আল্লাহর সাথে শরিক। সীমাতিরিক্ত ভালোবাসায় সুকৌশলে কেড়ে নিচ্ছে মানুষের প্রধান দৌলত ঈমান। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।