অনিয়ম ও গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ ঠালাওভাবে প্রকাশে ক্ষুব্ধ নির্বাচন কমিশনাররা।
একাধিক কমিশনার মনে করেন, রাষ্ট্রপতির কাছে দেশের ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক অভিযোগ জানাতেই পারেন। ওই অভিযোগের নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই তা সংবাদ সম্মেলন করে এভাবে প্রকাশ করা ঠিক হয়নি।
এভাবে সংবাদ সম্মেলন করার পেছনে আবেদনে স্বাক্ষরকারীদের ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে।
এর মধ্য দিয়ে অভিযোগ প্রমাণ করার চেয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশন (সিইসি) ও নির্বাচন কমিশনারদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে চাপে ফেলতে চাচ্ছেন- এমনটি মনে করছেন কমিশনাররা।
এছাড়া বঙ্গভবন থেকেও অভিযোগের বিষয়ে ইসির কাছে কোনো ব্যাখ্যা চাওয়া হয়নি।
এ অবস্থায় অভিযোগ ও অভিযোগকারীদের বিষয়ে এখনই কোনো পদক্ষেপ নেয়ার পরিকল্পনা নেই কমিশনের। এমনকি ইসি সচিবালয়কে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়কে কোনো পদক্ষেপ নেয়ারও নির্দেশনা দেননি কমিশন।
নির্বাচন কমিশনার ও সচিবালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে এমন মনোভাব জানা গেছে।
অভিযোগ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির এখতিয়ারাধীন হওয়ায় তা নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি নন নির্বাচন কমিশনাররা। বিষয়টি নিয়ে রোববার নিজেদের মধ্যে কোনো বৈঠকও করেননি তারা।
কয়েকটি গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে রোববার সন্ধ্যায় নির্বাচন ভবন ত্যাগ করার সময় সংক্ষিপ্ত কথা বলেন সিইসি কেএম নূরুল হুদা। তিনি বলেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে অভিযোগ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির কাছে অভিযোগ পেন্ডিং আছে। এ অবস্থায় কী মন্তব্য করা যায়- প্রশ্ন রাখেন তিনি।
এর আগে দুপুরে নিজ কার্যালয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, তাদের অভিযোগ হয়তো বা কোনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এসব অভিযোগের কোনোটির ভিত্তি আছে বলে আমি মনে করি না। এমন একটি বিষয় উপস্থাপন করা সুধীজনদের জন্য বিবেচনাপ্রসূত নয়। অভিযোগের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, উনারা মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে অভিযোগ উপস্থাপন করেছেন, সেখানে আমাদের কোনো পদক্ষেপ বা প্রক্রিয়ায় যাওয়ার সুযোগ নেই।
এদিকে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার ও নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম সঙ্গে আলাপকালে প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করেন। তারা জানান, উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনাররা নিজেরা বৈঠক করেননি। নিজেদের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনাও করেননি। নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমাদের পর্যায়ের নয়। আমরা দায়িত্ব নেয়ার তিন বছর আট মাস পর প্রাধিকারের গাড়ি পেয়েছি। অন্য অভিযোগগুলোও প্রমাণ করতে পারবে না। তবে নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম এ বিষয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য করতে চাননি।
কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান ইসির বিরুদ্ধে গুরুতর অসদাচরণ, আর্থিক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ আনেন ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক। তারা এ ব্যাপারে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের মাধ্যমে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছে লিখিত দাবি জানান। শনিবার তারা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ বিষয়টি জানানো হয়। সেখানে বলা হয়, বর্তমান ইসি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে বিভিন্নভাবে গুরুতর অসদাচরণে লিপ্ত। তারা গুরুতর আর্থিক দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, যা অভিশংসনযোগ্য অপরাধ।
ইসি সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, ৪২ জন নাগরিকের অভিযোগের বিষয়ে বঙ্গভবন থেকেও কোনো ব্যাখ্যা ইসি সচিবালয়ের কাছে চাওয়া হয়নি। রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত ওই অভিযোগ ও অভিযোগকারীদের বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া বা করণীয় নির্ধারণে ইসি সচিবালয়কে কোনো নির্দেশনাও দেননি নির্বাচন কমিশনাররা। তবে ইসি সচিবালয় শুধু কর্মচারী নিয়োগ সংক্রান্ত অভিযোগের একটি জবাব প্রস্তুত করে রেখেছে। এতে কোনো অনিয়ম হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়। এ অভিযোগটি ইসি সচিবালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাকিগুলো অভিযোগগুলো নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এসব বিষয়ে কোনো প্রস্তুতি নেয়নি ইসি সচিবালয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর বলেন, কমিশন থেকে কোনো ধরনের নির্দেশনা পাইনি। নির্দেশনা পেলে প্রস্তুতি নেব।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেন, রাষ্ট্রপতি বরাবর অভিযোগ করায় বিষয়টি নিয়ে কমিশনের তেমন কিছুই করার নেই। আইনেও তেমন কিছু খুঁজে পাইনি। এখন এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে গেলে তা ইসির জন্য বুমেরাং হতে পারে বলেও আশঙ্কা করেন তিনি।
রোববার দুপুরে নিজ দফতরে সাংবাদিকদের সঙ্গে ব্যক্তিগত মতপ্রকাশ করেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, অভিযোগ হয়তো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এসব অভিযোগের কোনোটির ভিত্তি আছে বলে আমি মনে করি না। এমন একটি বিষয় উপস্থাপন করা সুধীজনদের জন্য বিবেচনাপ্রসূত নয়। তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে যে বিষয়টা পীড়াদায়ক সেটি হচ্ছে, একদিকে মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে অভিযোগ করলেন, আবার অন্যদিকে আমাদেরও অভিযুক্ত করে ফেললেন। শুধু সেটা নয়, আমাদের কী করণীয় বা দণ্ড এক অর্থে সেটা দিয়ে দিলেন। এটা কতটা বিবেচনাপ্রসূত ও শিষ্টাচারবর্জিত কিনা সেটা আপনাদের (গণামধ্যমের) ওপরই বিবেচনার ভার দিলাম।
শাহাদাত হোসেন চৌধুরী আরও বলেন, প্রথমত দু-একটি গণমাধ্যমের সংবাদের ভিত্তি করে এ ধরনের অভিযোগ করেছেন। প্রশিক্ষণ ও গাড়ি ব্যবহার নিয়ে যেসব পত্রিকায় সংবাদ ছাপা হয়, সেগুলোতে বাস্তব অবস্থা জানিয়ে প্রতিবাদপত্র দিয়েছিলাম। জানি না সেই প্রতিবাদ তাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে কিনা। দ্বিতীয়ত নির্বাচন কমিশনারদের যেভাবে গাড়ির ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে, সেভাবে গাড়ি ব্যবহার করি না এবং প্রয়োজনও নেই। প্রাধিকারের গাড়ি কমিশনের শপথ নেয়ার তিন বছর পর পেয়েছি। যেসব গাড়ি দিয়েছে সেগুলোকে লাক্সারি বলা হচ্ছে। এ মানের গাড়ি ইউএনওরাও ব্যবহার করছেন। বাড়তি গাড়ি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা আমারও নেই, আমি মনে করি অন্য কমিশনারদেরও নেই। অভিযোগ প্রমাণের চ্যালেঞ্জ নিচ্ছেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সদস্য হিসেবে কোনো বিষয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বলতে চাই না। অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে। কী ধরনের উদ্দেশ্য- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, উনারাই ভালো বলতে পারবেন। এ বিষয়ে আমি বলত পারব না। যোগসূত্র খুঁজতে যাব না, এটা আমার কাজ নয়। এই কমিশনার বলেন, উনারা মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে অভিযোগ উপস্থাপন করেছেন, সেখানে আমাদের কোনো পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ নেই।
অভিযোগে স্বাক্ষরকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে সে ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। উনারা বিশিষ্ট নাগরিক। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের একজন সদস্য হিসেবে আমার ভাষার ততটুকু শালীন রাখা উচিত বলে মনে করি। এখান থেকে উনারা বার্তা নেবেন বলে মনে করি। আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসী বার্তা নেবেন। নির্বাচনী অনিয়ম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন যথেষ্ট চেষ্টা করছে নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ করার জন্য। নির্বাচন কমিশনের যতটুকু করণীয় তার সর্বোচ্চ করে যাচ্ছে।
ইসির কর্মচারী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে শাহাদাত হোসেন চৌধুরী বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই না। নিয়োগ সচিবালয় দিয়ে থাকে। তবুও যারা অভিযোগ করেছে তারা বলতে পারবে। আমি বলতে পারব না।