শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:৫৭ অপরাহ্ন

যাচ্ছেতাই মোবাইল ফোনের গ্রাহকসেবা

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২০
  • ৬৩ জন নিউজটি পড়েছেন

মোবাইল ফোনের গ্রাহকসেবা এখন একেবারেই তলানিতে ঠেকেছে। যাচ্ছেতাই অবস্থা। কোনো প্রতিকার নেই। শীর্ষ অপারেটর গ্রামীণফোনের সেবার মান এতটাই খারাপ যে কাউকে ফোন করে কল শেষ করা যায় না। গ্রাহকসেবার এই খারাপ অবস্থার জন্য অপারেটরদের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিকেও দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। গত দুই বছরে দেশে একটিও টাওয়ার বাড়েনি। বিদ্যমান টাওয়ারেও সংস্কার হচ্ছে না। কোনো রকমে চালিয়ে নিচ্ছে অপারেটররা। এমনকি স্পেকট্রাম না বাড়লেও নিয়মিত গ্রাহক বাড়ছে। ফলে একই স্পেকট্রাম ও টাওয়ার দিয়েই অতিরিক্ত গ্রাহককে সেবা দিতে গিয়ে মানের অবনতি ঘটছে।

টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী, বিটিআরসি চেয়ারম্যান এমনকি অপারেটররা পর্যন্ত একবাক্যে স্বীকার করেছেন মোবাইল সেবার মান এখন ভয়াবহ খারাপ। কিন্তু পরিস্থিতি উত্তরণে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। দুই বছর আগে চারটি কোম্পানিকে টাওয়ার ব্যবস্থাপনার লাইসেন্স দেয় বিটিআরসি। এর মধ্যে তিনটি কোম্পানি কাজই শুরু করেনি। মাঠে থাকা কোম্পানিটিও দুই বছরে হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে। টাওয়ারের লাইসেন্স দেওয়ার সময় অপারেটরদের বলা হয়েছে, এখন থেকে তারা আর টাওয়ার ব্যবস্থাপনা করতে পারবে না। টাওয়ার কোম্পানিগুলোই অপারেটরদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে টাওয়ার ব্যবস্থাপনা করবে।

টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘গ্রাহকসেবা যে খারাপ এটা স্বীকার না করে কোনো উপায় নেই। মানুষ সেবা পাচ্ছেন না।’ গ্রামীণফোনের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘তারা লাভ করে টাকা নিয়ে যাচ্ছে, অথচ স্পেকট্রাম কিনবে না। গ্রাহকসেবায় তাদের একেবারেই কোনো মনোযোগ নেই।’ এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘বাজারটা তারা এতটাই মনোপলি করে ফেলেছে যে, তারা যেভাবে করবে, সেভাবেই হবে। দ্বিতীয় অপারেটরটির গ্রাহক তাদের প্রায় অর্ধেক। ফলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’

গ্রামীণফোনের মনোপলি রুখতে সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার বা এসএমপি ঘোষণা করা হয়। তার পরও কোনো কাজ হচ্ছে না। এসএমপি অপারেটর হিসেবে গ্রামীণফোনকে বর্তমানে তিনটি বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মোবাইল নম্বর পোর্টেবেলিটি বা এমএনপির ক্ষেত্রে অন্য অপারেটরগুলোতে ৯০ দিন থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও গ্রামীণফোনের ক্ষেত্রে ৬০ দিন। গ্রামীণফোনের যে কোনো প্যাকেজ আগে অনুমোদন করিয়ে নিতে হয়। এছাড়া আন্তঃঅপারেটর সংযোগ ফি অন্যরা ১০ পয়সা পেলেও গ্রামীণফোন পায় ৭ পয়সা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের হোমিওপ্যাথি টাইপের বিধিনিষেধ দিয়ে গ্রামীণফোনকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তবে বিটিআরসির ভাষ্য, কড়া পদক্ষেপ নিলে গ্রাহকরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

বিটিআরসি চেয়ারম্যান জহুরুল হক বলেন, ‘এতদিন তো গ্রামীণফোনের এসএমপি কার্যকর করা যায়নি। এখন আমরা কার্যকর করা শুরু করেছি। দিন দিন আরো কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আমরা সেবার মান বাড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। সেবার মান যে খারাপ সেটা আমরাও স্বীকার করি। এখন টাওয়ার কোম্পানিগুলো যদি কাজ শুরু না করে তাহলে আমরা অপারেটরদেরই টাওয়ার সংস্কারের দায়িত্ব দেব। শিগিগরই টাওয়ার কোম্পানিগুলোর কাছে চিঠি পাঠিয়ে কার্যক্রম শুরু করতে নির্দেশনা দেওয়া হবে।’

দেশে বর্তমানে মোবাইল ফোনের গ্রাহক ১৬ কোটি ১২ লাখ ৯৫ হাজার। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের গ্রাহক ৭ কোটি ৪৫ লাখ, রবির ৪ কোটি ৮০ লাখ, বাংলালিংকের ৩ কোটি ৪০ লাখ ও টেলিটকের গ্রাহক প্রায় ৪৮ লাখ। বর্তমানে প্রতি মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম দিয়ে গ্রামীণফোন সেবা দিচ্ছে ২০ লাখ ৫০ হাজার গ্রাহককে। রবি ১৩ লাখ ৬৩ হাজার, বাংলালিংক ১১ লাখ ৬৯ হাজার ও টেলিটক প্রায় ২ লাখ গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে। যদিও সারা দেশে টেলিটকের নেটওয়ার্ক নেই। উন্নত দেশগুলোতে এক মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম দিয়ে সর্বোচ্চ ১ লাখ গ্রাহককে সেবা দেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এই সেবার চিত্র পুরোই উলটো।

টেলিকম বিশেষজ্ঞ ও লার্ন এশিয়ার সিনিয়র ফেলো আবু সাইদ খান বলেন, ‘এখন যে সেবার মান এত নিচে এর জন্য অপারেটরদের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থাও দায়ী। মোবাইল অপারেটরদের যে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে সেখানে বলা আছে, নেটওয়ার্ক বিস্তার ও সংস্কারের দায়িত্ব তাদের। কিন্তু এর মধ্যে পৃথক টাওয়ার কোম্পানি করে জটিলতা তৈরি করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাই। ফলে সাধারণ মানুষ সেবা পাচ্ছেন না। আমি তো মনে করি, মানুষকে সেবা বঞ্চিত করা রীতিমতো অপরাধ। নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেই অপরাধই করেছে।’

মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন এমটব মহাসচিব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এস এম ফরহাদও স্বীকার করেছেন মানসম্মত সেবা দেওয়া অপারেটরদের জন্য কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘নতুন করে টাওয়ার স্থাপন না হওয়া ও অপ্রতুল স্পেকট্রামের জন্য মানসম্পন্ন সেবা দিতে অপারেটরদের কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে। অপারেটররা বিপুল বিনিয়োগ করে সারা দেশে নেটওয়ার্ক স্থাপন করেছিল বলেই এখনো সেবা দেওয়া যাচ্ছে। আরো উন্নত সেবা প্রদানের জন্য সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার এগিয়ে আসা দরকার।’

মোবাইল অপারেটর রবির হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স সাহেদ আলম বলেন, ‘গুণমান সেবা দেওয়া এখন সত্যিই কঠিন হয়ে পড়েছে। করোনাকালীন সময়ে আমরা কিছু দিনের জন্য ফ্রি স্পেকট্রাম চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা দেওয়া হয়নি। এখন চাইলেই নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করা যাচ্ছে না। ফলে কিছু সমস্যা তো হচ্ছেই।’

গ্রামীণফোনের হেড অব এক্সটার্নাল কমিউনিকেশন মোহাম্মদ হাসান বলেন, ‘সর্বোচ্চ গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। স্পেকট্রামের মূল্য কমিয়ে আনা এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ডিজিটাল বাংলাদেশের জন্য নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও পর্যাপ্ত স্পেকট্রাম থাকা খুবই দরকার।’

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English