রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:২৬ অপরাহ্ন

রাসূলের রাষ্ট্রে অন্য ধর্মের অধিকার

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২০
  • ৫৭ জন নিউজটি পড়েছেন

ফরাসি লেখক গোস্তাফ লুবন বলেন, ‘আমরা এখানে যে আয়াতগুলো কিছুক্ষণ আগে উল্লেখ করেছি তাতে আমরা দেখেছি যে, মুহাম্মদ সা: ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের প্রতি বেশ সহনশীলতা দেখিয়েছিলেন। তার পূর্বের ধর্মগুলোর প্রতিষ্ঠাতারা বিশেষত ইহুদি ও খ্রিষ্টান ধর্মের প্রতিষ্ঠাতারা এরূপ সহনশীলতা অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি দেখায়নি। সামনে আমরা দেখব মুহাম্মদের পরের খলিফারা কিভাবে এ ক্ষেত্রে তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিলেন। ইউরোপের কিছু পণ্ডিতও যারা আরবদের ইতিহাস গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন তারা এ কথা স্বীকার করেছেন। আমি সামনে বিভিন্ন লেখকদের গ্রন্থ থেকে যে উদ্ধৃতিগুলো পেশ করব তা প্রমাণ করবে যে এটি আমার একার অভিমত নয়।
রোবার্টসন তার ‘শালকন’ নামক গ্রন্থে বলেন, ‘মুসলমানরাই কেবল তাদের দ্বীনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও অন্য ধর্মের লোকদের প্রতি সহনশীলতার স্পিরিট মনের মাঝে রাখে। তারা তাদের ধর্ম প্রচারে প্রচণ্ড আগ্রহ রাখা সত্ত্বেও যেসব মানুষ সানন্দে ইসলাম গ্রহণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করে না তাদেরকে স্বাধীনভাবে তাদের নিজেদের দ্বীন ধর্ম পালনের সুযোগ করে দেন।’ (গুস্তাফ লুবনের, আরব সভ্যতা নামক গ্রন্থের টিকা, পৃষ্ঠা-১২৮…; ড. ইউসুফ আল কারজাভি, গাইরুল মুসলেমিন ফিল মুজতামে আল ইসলামী, পৃষ্ঠা-১৮-২০)
এ প্রসঙ্গে ভারতের হিন্দি লেখক সুরজিৎ দাশগুপ্ত বলেন, ইসলাম ধর্ম ভারতবর্ষে প্রচারের আগে ভারতীয়দের কতকগুলো নিজস্ব ধর্মমত ছিল যেগুলোকে ইসলামের আগমনের পরে সম্মিলিতভাবে হিন্দু ধর্ম বলা হয়, তেমনই ইউরোপে খ্রিষ্টধর্ম প্রচার ও প্রতিষ্ঠার আগে কতকগুলো নিজস্ব ইউরোপীয় ধর্মমত ছিল এবং সেগুলোকে সম্মিলিতভাবে পেগান ধর্ম বলা হতো। দীর্ঘকাল মুসলিম শাসনের অধীনে থাকা সত্ত্বেও ভারতবর্ষের অধিকাংশ অধিবাসী, এমনকি মুসলিম শক্তির প্রধান কেন্দ্রগুলোর অধিবাসীও হিন্দুই থেকে যায়, কিন্তু ইউরোপে পেগান ধর্মের বিরুদ্ধে এমন সর্বব্যাপী অভিযান চালানো হয় যে, পেগান ধর্মাবলম্বী ইউরোপীয়দের রাখা হয়নি। মুসলমানরা যদি সত্যিই একহাতে অস্ত্র নিয়ে ধর্ম প্রচারের অভিযানে নামতো, তাহলে ইউরোপের মতো ভারতবর্ষেও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের চিহ্নমাত্র থাকত না। (সুরজিৎ দাশগুপ্ত, ভারতবর্ষ ও ইসলাম, পৃষ্ঠা-৩৩)।
‘দ্য প্রিচিং অব ইসলাম’ নামক গ্রন্থের লেখক ‘টমাস আর্নল্ড’ মুসলমানরা ‘এক হাতে তরবারি অন্য হাতে কুরআন প্রচার করেছিলেন’ এ ধরনের প্রচারণাকে অলীক কল্পকাহিনীরূপে অপপ্রচার বলে উল্লেøখ করে লেখেন, ‘মুসলিম মুবাল্লিøগ ও বণিকরা শন্তিপূর্ণভাবে অক্লান্ত পরিশ্রম করে পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইসলামের বাণী বহন করে নিয়ে গিয়েছিলেন।’ (আর্নল্ড, দ্য প্রিচিং অব ইসলাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ, ঢাকা, পৃষ্ঠা-২৭)
প্রাচীন বাংলায় আরব বণিকরাই এ দেশে ইসলাম বয়ে নিয়ে এসেছিলেন এবং তারাই বাংলাদেশ-ভারতে ইসলামকে জনগণের মাঝে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন লেনদেন ও আচার-ব্যবহারে (আরবিতে এটাকে বলা হয় মোয়ামেলাত-মোয়াশেরাত) সৌজন্য দেখিয়ে। মুহাম্মদ সা:-এর জীবদ্দশা থেকে ‘তলোয়ারওয়ালা তুর্কিরা’ আসার আগ পর্যন্ত তারাই ছিলেন ইসলাম প্রচারের মূল বাহিনী। সুতরাং বলা যায়, আর্নল্ডের এই পর্যবেক্ষণ যথাযথ ও ইতিহাসসিদ্ধ। যদিও লেখক বিচ্ছিন্নভাবে গজনির সুলতান মাহমুদের পুনঃ পুনঃ অভিযান এবং আওরঙ্গজেবের কথিত নির্যাতন, হায়দার আলী ও টিপু সুলতানের জোর করে খতনা করার বিষয়গুলো উত্থাপন করেছেন। তবু তিনি বলেছেন, বাংলা ও উপমহাদেশের সর্বত্র ধর্মান্তরকরণে ‘কোনো শক্তি প্রয়োগ করা হয়নি’। ধর্মান্তরকরণে যে প্রভাবটি কাজ করেছে, তা হলো ‘শান্তিপ্রিয় ধর্মপ্রচারকদের শিক্ষা ও আহ্বান।’ (আর্নল্ড, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা-২৭৯)
উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারকদের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে আর্নল্ড একটি বিশেষ মন্তব্য করেছেন, যা প্রণিধানযোগ্য। তার মতে, ‘সংখ্যার বিচারে সমগ্র ভারতের মধ্যে বাংলাদেশেই মুসলমান ধর্ম প্রচারকরা সবচেয়ে বেশি সাফল্য অর্জন করেছেন।’ (আর্নল্ড, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা-৩০৪)
বাংলায় মুসলমান ধর্ম প্রচারকদের বেশি সফলতা লাভ ও মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি সম্পর্কে বিশিষ্ট গবেষক এবনে গোলাম সামাদের অভিমত হলোÑ ‘একসময় বলা হতো বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার হতে পেরেছে প্রধানত বল প্রয়োগের মাধ্যমে। মুসলমান নৃপতিরা জোর করে হিন্দুদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেছিলেন। কিন্তু এখন এই মতকে আর আগের মতো ধরে রাখা যাচ্ছে না। ব্রিটিশ শাসনামলে আদমশুমারি শুরু হয় ১৮৭১ সাল থেকে। এ সময় বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে মুসলমানের তুলনায় হিন্দুর সংখ্যা ছিল বেশি। এরপর আদমশুমারি হয় ১৮৮১ সালে। এই আদমশুমারিতে দেখা যায়, বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে হিন্দুর সংখ্যা কমতে এবং মুসলমানের সংখ্যা বাড়তে। এরপর থেকে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে ক্রমেই মুসলমানের সংখ্যা বেড়েছে। কেন এমন হতে পেরেছে, তার কারণ জানা যায়নি। তবে একটি মত হলো হিন্দুদের মধ্যে লেখাপড়া শিখে বহু ব্যক্তি গ্রহণ করতে থাকে কেরাণীর চাকরি। রুদ্ধঘরে কেরাণীগিরি করতে গিয়ে ঘটে এদের স্বাস্থ্যহানি। কমে এদের প্রজননক্ষমতা। কিন্তু মুসলমানরা লেখাপড়া শিখে কেরাণী হতে চায়নি। তারা মুক্ত প্রকৃতিতে করেছে ক্ষেতখামারে কাজ। হয়েছে নৌকার মাঝিমাল্লøা। মুক্ত প্রকৃতিতে তাদের স্বাস্থ্য থেকেছে অটুট। কমেনি তাদের প্রজননক্ষমতা। তাই বাড়তে পেরেছে হিন্দুর তুলনায় মুসলমানের সংখ্যা। এই ধারণার কিছুটা সমর্থন পাওয়া যায় এ ঘটনা থেকে, যেসব মুসলমান যুবক হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করেছেন তাদের গর্ভে অধিক সন্তানের জননী হওয়া থেকে।
ইংরেজ আমলে জোর করে হিন্দুকে মুসলমান করার সুযোগ ছিল না। তাই বলা চলে না বাংলাদেশে মুসলমানের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার একটা কারণ হিন্দুদের বল প্রয়োগ করে মুসলমান করা।’ (এবনে গোলাম সামাদ, আমাদের জাতিসত্তার স্বরূপ)
আমরা প্রফেসর এবনে গোলাম সামাদের এ বক্তব্য সঠিক বলে মনে করি না। কারণ প্রকৃত সত্য হলোÑ বাংলায় মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধির ব্যাপারটি এ দেশে ইংরেজদের আগমনের বহু আগেই ঘটেছে। বরং ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত সত্য হলো একসময় বাংলা শাসন করত পালরা। পালরা ছিল বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বৌদ্ধবিহারের অবস্থান বাংলায় বৌদ্ধ শাসনের প্রমাণ বহন করে। পালদের সম্পর্কে বাংলা পিডিয়ায় বলা হয়, ‘বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পালদের দীর্ঘ শাসন বাংলায় এক ধরনের উদার ধর্মীয় আবহ সৃষ্টি করে। এ আমলে হিন্দু-বৌদ্ধ সম্প্রীতি ও সহাবস্থান লক্ষ করা যায়। পালরা ধর্মক্ষেত্রে উদার নীতি প্রবর্তন করে। হিন্দু দেব-দেবী ও রাজকার্যে উচ্চপদে নিয়োজিত ব্রাহ্মণদের পৃষ্ঠপোষকতা শাসকদের বিচক্ষণতার পরিচায়ক। ফলে দুই ধর্মের মধ্যকার দূরত্ব হ্রাস পায় এবং পারস্পরিক সংশ্লিষ্টতার কারণে নতুন নতুন আচার-পদ্ধতির উন্মেষ ঘটে। ক্রমে ক্রমে বাংলায় বৌদ্ধদের মধ্যে তান্ত্রিক মতবাদ ও রীতি-নীতির জন্ম হয়। পাল যুগের সামাজিক ও ধর্মীয় পরিমণ্ডল পারস্পরিক সহিষ্ণুতা ও সহাবস্থানের মনোভাব জাগ্রত করে। এ মনোভাব বাংলার আঞ্চলিক ইতিহাসের উপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।’ (বাংলা পিডিয়া)
পাল বৌদ্ধদের হাত থেকে পরবর্তীতে শাসনভার গ্রহণ করে সেনরা। সেনরা ছিল হিন্দু ধর্মের অনুসারী; মারাত্মক সাম্প্রদায়িক মানসিকতার ব্রাহ্মণ। তারা এ দেশের ক্ষমতা দখল করে পালদের জোর করে ধর্মান্তরিত করে। যারা ধর্মান্তরিত হতে অস্বীকার করে তাদের ওপর চালায় স্টিমরোলার। তাদেরকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে। তাদের ওপর ব্যাপকাকারে করের বোঝাও আরোপ করে। এর ফলে বেশ কিছু পাল বৌদ্ধ ধর্ম ত্যাগ করে হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করে। কিন্তু হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করার পরও তারা হিন্দু ধর্মের জাতপ্রথার কারণে উঁচু জাতে উঠতে পারেনি। তারা হিন্দু হয়েও অচ্ছুৎ ও ম্লেচ্ছ থেকে যায়। হিন্দু ব্রাহ্মণরা তাদের সাথে নিচু জাত শুভ্রের মতো আচরণ করতে থাকে। যার কারণে তাদের মনে রাগ ও ক্ষোভ সঞ্চারিত হতে থাকে। এ প্রসঙ্গে বাংলা পিডিয়ায় বলা হয়Ñ ‘সেনযুগের আগে বাংলায় হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ফলে উভয় ধর্মের মধ্যে একটি চমৎকার মিথস্ক্রিয়া গড়ে উঠেছিল। কিন্তু সেন শাসনামলে গোড়া হিন্দুধর্মের পুনরুত্থান ঘটে। ওই সময় বৌদ্ধধর্মের ওপর আঘাত নেমে আসে বলে মনে করা হয় এবং এর ফলে বৌদ্ধরা দলে দলে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে আশ্রয় নেয়। সেন আমলে সংস্কৃত সাহিত্যের প্রভূত উন্নতি হয়।’ (আবদুল মমিন চৌধুরী, বাংলা পিডিয়া)
এ সময় এ দেশে মুসলমান ধর্ম প্রচারকদের আগমন ঘটে। তারা ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে প্রচার করে ‘সব মানুষ একই চিরুনির কাটার মতো সমান। কোনো আরবের কোনো অনারবের ওপর কোনো ধরনের শ্রেষ্ঠত্ব নেই তাকওয়া ব্যতীত।’ (ইবনে আদি, হাদিসটি জাল বলে মন্তব্য করেছেন। ইবনুল জাওযিও অনুরূপ মন্তব্য করেছেন। তবে সুয়ুতি হাদিসটির আরেকটি সনদ উল্লেখ করে তা জাল নয় বরং অত্যন্ত দুর্বল বলে মন্তব্য করেছেন)
তারা তাদের নামাজে একই কাতারে দাঁড়িয়ে সব মানুষ যে ইসলামের দৃষ্টিতে সমান তা প্রমাণ করে দেখায়। অথচ ইতোপূর্বে তারা হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করার পরও মন্দিরে প্রবেশ করার অনুমতি পেত না। তারা মুসলিম দাঈদের কাছে আরো শুনতে পায় ‘ইসলাম গ্রহণ করলে আগের সব পাপ মুছে যায়।’ তারা মুসলমান দাঈদের কাছে ইসলামের যৌক্তিকতার বিবরণ যেমন শুনতে পায় তেমনি মানবিক আচার আচরণ ও দেখতে পায়। তাদের আচার-আচরণ লেনদেন মুআমেলায় মানবিক আচরণ দেখে তারা মুগ্ধ হয়। তাই তারা সেনদের বর্ণবাদী আচরণ থেকে মুক্তি লাভের আশায় দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে। যার কারণে ভারতবর্ষের যেকোনো এলাকার তুলনায় বাংলার গণমানুষের মুসলমান হওয়ার প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যায়।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English