দীর্ঘ ১১ বছর রেলখাতে অনেকটাই সাফল্য অর্জন করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। সরকার রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে এ সেক্টরকে যুগোপযোগী করতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। রেলওয়ের উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিভিন্ন দাতাসংস্থা। কিন্তু সবার সমন্বয়ে মন্ত্রণালয়ের সামান্য অর্জনকে নস্যাতের পরিকল্পনা করছেন রেলসচিব মো. সেলিম রেজা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সচিব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ায় মন্ত্রণালয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রেলওয়ের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৯ সালের ৮ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর বর্তমান রেলমন্ত্রী সততা ও নিষ্ঠা কাজে লাগিয়ে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা এবং রেলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় অনেকটাই কমেছিল দুর্নীতি। গত তিন মাস ধরে রেলভবনে কালো মেঘের ছায়া দেখা যাচ্ছে। এর আগে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে মন্ত্রী সেই ঘটনা তদন্ত করে এক নীতিতে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন। অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে কাউকে বরখাস্ত, ওএসডি বা বদলি করার ঘটনাও কম নেই।
জানা গেছে, কোরিয়া থেকে ২০০ রেলের বগি ক্রয় প্রকল্প টেন্ডারে প্রথম লোয়েস্ট দরদাতা (এসএসআরএসটি) সাংসিং রোলিং স্টক কোম্পানি। তার পরের দরদাতা দানোন সিস। দুজনেই টেন্ডার পেতে মরিয়া ছিল। তাদের অন্তর্দ্বন্দ্বে রেল কর্তৃপক্ষ নাখোশ হয়ে দীর্ঘদিন ওই ফাইল মন্ত্রীর দফতরে পড়েছিল। ২০২০ সালের ৫ মে রেল সচিব সেলিম রেজা দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাদের কলহদ্বন্দ্ব নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বর্তমান রেল সচিব দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বপ্রণোদিত হয়ে উদ্যোগ নেন। মন্ত্রীর দফতর থেকে ফাইল এনে সর্বনি¤œ দরদাতা সাংসিং রোলিং স্টক কোম্পানিকে (এসএসআরএসটি) কাজ দেন। তার কর্মদক্ষতার বিষয়টি নিশ্চিত করেন মো. হাসান মনসুর। এ ঘটনা নিরসন করায় সচিব অনেকের কাছে আস্থার জায়গা তৈরি করে নেন।
সচিবের চাকরি জীবনী তালাশ করে একই তথ্য মিলেছে। তার বাস্তবতা কোরিয়ার ২০০ কোচ প্রকল্পের লোয়েস্ট কোম্পানিকে টেন্ডার দেওয়া। তবে ওই কোম্পানির সঙ্গে পার্টনারশিপ রয়েছে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের।
এরপর করোনা সুরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত প্রতিবেদন হিমাগারে রেখে দুর্নীতিবাজ এডিজি আরএস মঞ্জুর উল আলম চৌধুরী এবং সাবেক জিএম (পূর্ব) বর্তমান এডিজি অপারেশন সরদার শাহাদত আলীকে পদোন্নতি দিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। তবে এই গ্রেড পাওয়ার পিছনে নায়কের ভূমিকায় ছিলেন রেল সচিব। তাদের বিরুদ্ধে পাওয়া অভিযোগ তদন্তে অভিযুক্তদের বদলির সুপারিশ করেন তদন্ত কর্মকর্তা যুগ্মসচিব মো. ফারুকী। তদন্ত প্রতিবেদন আমলে না নেওয়ার কারণ ওই সব করোনা সামগ্রী ক্রয়ের হুকুমদাতা ছিলেন সচিব-ডিজি। যার জন্য মাস্ক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের বদলি না করে আরও প্রমোশন দিয়েছেন।
অপরদিকে তালাকাণ্ডের ঘটনায় একই বিচারক রেলসচিব অভিযোগ তদন্ত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে তিনজনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছেন। তারা হলেন- পশ্চিমাঞ্চলের সাবেক সিসিএম এএমএম শাহনেওয়াজ, সিওএস মো. বেলাল হোসেন সরকার এবং এসিওএস মো. জাহিদ কাওছার। গত ২৯ ডিসেম্বর তাদের বরখাস্ত করেন সেলিম রেজা। সচিবের স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর একটি পত্রিকায় রেলওয়ের পণ্য ক্রয়ে দুর্নীতির তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে তাহলে কি মাস্ক কেলেঙ্কারির ঘটনা মিডিয়ায় আসেনি?
অভিযুক্তদের পদোন্নতির নথিতে গত বছর ২৭ ডিসেম্বর স্বাক্ষর করেন প্রশাসনের সাবেক উপসচিব মো. আলতাব হোসেন। তাদের পদোন্নতির পাশাপাশি সচিবের অবসরোত্তর ছুটি ও এ সংক্রান্ত সুবিধা স্থগিতের শর্তে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর বা যোগদানের তারিখ থেকে পরবর্তী এক বছরের জন্য রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে চুক্তিতে নিয়োগ দিয়ে গত ৪ জানুয়ারি আদেশ জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এর আগে আলাদা আদেশে সেলিম রেজাকে ৩১ ডিসেম্বর থেকে অবসরে পাঠিয়ে আদেশ জারি করা হয় চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম রেজাকে চুক্তিতে একই পদে রেখে দিয়েছে সরকার।
১৯৮৫ সালের বিসিএস ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা সেলিম রেজা গত বছরের ৫ মে থেকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্বে আছেন। তার আগে তিনি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্বে ছিলেন। সেলিম রেজা জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিচালক ও অতিরিক্ত মহাপরিচালকের (প্রশিক্ষণ) দায়িত্বে ছিলেন।
এছাড়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মধ্যপ্রাচ্য উইংয়ের যুগ্মসচিব এবং ইআরডির প্রশাসন উইং এর অতিরিক্ত সচিব পদেও কাজ করেন তিনি। সেলিম রেজা কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রথম সচিব (শ্রম) হিসেবে ছয় বছর দায়িত্বে ছিলেন। রেলসচিব চুক্তিভিত্তিক এক বছরে নিয়োগ পাওয়ায় গত বৃহস্পতিবার রেলভবনে কর্মকর্তারা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
তারা বলেন, স্বাধীন বাংলায় রেলসচিব মো. সেলিম রেজা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন। এর আগে তিনি যেসব মন্ত্রীর অধীনে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন, তখন তার জবাবদিহিতা ছিল। এখন তিনি স্বাধীন মত কাজ করবেন। তাকে কারও কাছে তেমন কোনো কৈফিয়ত দিতে হবে না। রেলের সচিব হিসেবে সেলিম রেজা গত ৩ জানুয়ারি থেকে মুক্ত বিহঙ্গ পাখির মতো। কারও কাছে সচিব দায়বদ্ধ থাকবেন না। এ কারণেই রেলওেয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কাও কম নয়। উদাহরণ হিসেবে বলাই যায় ঢাকা বিভাগীয় কমলাপুর রেলওয়ে ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা ডেপুটি কমিশনার (ডিইও) নজরুল ইসলাম। তিনি তার স্বাধীনমতে রেলওয়ের দখল হওয়া জমি উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন। আবার এমনও নজির আছে নোটিস দিয়ে দুবার মাইকিং করে লাখ টাকা না পাওয়ায় উচ্ছেদ করেননি।
অজুহাত ছিল রেলসচিব সেলিম রেজা নিষেধ করেছেন। দাবি ডিইওর। রেলভবনের অধিকাংশ কর্তাব্যক্তিও বলেন, তারা এডমিন ক্যাডারের কর্মকর্তা। অনুরূপ রেলসচিবের ক্ষেত্রেও একই কথা বলবেন। তবে প্রশ্ন, তারা কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। সচিব তালাকা- এবং মাস্ক কেলেঙ্কারির দ্বৈতনীতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে আপনার বিরুদ্ধে। একদিকে প্রমোশন আরেক দিকে ডিমোশন। আপনার বক্তব্য কি? দয়া করে জানাবেন। গতকাল শনিবার বেলা ১১টা ৫১ মিনিটে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। গত জুমার দিন এবং শনিবার দুদিন এসএমএসের মাধ্যমে উত্তর চেয়েও কোনো জবাব পাইনি। তিনি মিডিয়াকে আড়াল করে চলার চেষ্টা করেন।