শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ০৪:৫৭ পূর্বাহ্ন

শিক্ষায় ধর্ম ও নৈতিকতা

অনলাইন সংস্করণ
  • প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, ২৫ মার্চ, ২০২১
  • ৪৬২ জন নিউজটি পড়েছেন
ইসলাম

যে শিক্ষা মানুষের অন্তরে বিদ্যমান পাশবিকতা দূর করে মনুষ্যত্বের শিক্ষায় উজ্জীবিত করে সেটিই ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। আর এ শিক্ষার মূল ভিত্তি হলোÑ আল কুরআন ও রাসূল সা:-এর সুন্নাহ। তাঁর দেখানো পথ ও মত। নৈতিক শিক্ষা ধর্মের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সত্য ও সুন্দরের ধর্ম ইসলাম; যা কিছু মানুষের জন্য শুভ ও কল্যাণকর তা-ই বৈধ করেছে ইসলাম। সেসবের প্রতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। সুতরাং নৈতিক শিক্ষার সব উৎকৃষ্ট বিষয় ধর্মীয় সৌন্দর্যবোধের বহিঃপ্রকাশ; যা ধর্মের মৌলিক বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। আর এ কারণেই শিক্ষায় ধর্ম ও নৈতিকতার মাঝে তেমন কোনো মতপাথর্ক্য পরিলক্ষিত হয় না। মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষার প্রধান মানদণ্ডই হলোÑ তাওহিদ ও শিরকিয়াতমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা। এ শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলোÑ আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও রাসূল সা:-এর আদর্শ প্রচার। কুরআন-হাদিস সমর্থিত জ্ঞানের আলোকে একটি সুন্দর সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলা। মানুষের কাজকর্ম, জীবন-আচরণ, সমাজ পরিবার ও রাষ্ট্রের সর্বত্র ইসলামকে জীবনবিধান হিসেবে মেনে চলা।
আর এটিকে উপেক্ষা করা আল্লাহর সাথে বিদ্রোহ করার নামান্তর। এ ধরনের কাজ নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের জীবনটা মহান আল্লাহ তায়ালার এক বিশেষ দান। এটি কিভাবে পরিচালিত হবে তার বিধানদাতা ও আইনপ্রণেতাও তিনি। যে বিধান শাশ্বত। চিরন্তন। তাই তো ফেরেশতারা আল্লাহ তায়ালাকে বলেছিলেন, হে আমাদের রব, আপনি পবিত্র! আপনি যা শিখিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের অন্য কোনো জ্ঞান নেই, নিশ্চয়ই আপনি মহাজ্ঞানী ও কৌশলী।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত-৩২)।
শিক্ষা এমন একটি বিষয় যা মানুষের মধ্যে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। আর এ পরিবর্তন মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটায়। তাই মানবতা ও মানুষের জন্য যা কিছু অকল্যাণকর চাইলেই মানুষ তা করতে পারে না। শিক্ষাব্যবস্থায় যখন এই ধর্মীয় মূল্যবোধের সংমিশ্রণ ঘটে তখন সেখানে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়। পুরো শিক্ষাটাই গড়ে উঠে একটা আদর্শের ভিত্তিতে। যার সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা আসে আল কুরআন, আল হাদিস ও ইজমা-কিয়াসের ভিত্তিতে। মহানবী সা: যখন হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যানমগ্ন ছিলেন তখন তার ওপর সূরা আলাকের যে আয়াত নাজিল হলোÑ সেখানে পড়তে বলা হলো। বলা হলো, পড়ো তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন একবিন্দু জমাট রক্তপিণ্ড থেকে। পড়ো তোমার রব মহা সম্মানিত সেই সৃষ্টিকর্তার নামে, যিনি শিক্ষাদান করেছেন লেখনীর মাধ্যমে। তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন সেসব বিষয় যা তারা জানত না।’
কিছু বিষয়ের জ্ঞানার্জন করা মানুষের জন্য ফরজে আইন। আল্লাহ প্রদত্ত হুকুম-আহকামের ভিত্তিতে দুনিয়ার জিন্দেগি পরিচালনার জন্য একজন মানুষের যা কিছু জানা দরকার তার সবই এই বিধানের মধ্যে শামিল। সমাজের একশ্রেণীর মানুষ মনে করেন, দ্বীনী শিক্ষা বলতে নামাজ, রোজা ও হজ-জাকাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তারা একটি ভুল ধারণা নিয়ে বেড়ে উঠছেন। দ্বীনের একটি বড় অংশকেই তারা জীবন থেকে আলাদা করে রাখছেন। আমাদের বুঝতে হবে, ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয়, বরং একটি জীবনবিধান। আর জীবনবিধান কখনো আংশিক বা অর্পূণাঙ্গ হতে পারে না। ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ ও সমাজ থেকে রাষ্ট্র আর রাষ্ট্র থেকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মানুষের কর্মগুলো কিভাবে ও কোন প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হবে তা ইসলাম বলে দিয়েছে। সুতরাং ইসলামকে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ রাখার সঙ্কীর্ণ চিন্তাচেতনা আল্লাহর সাথে এক প্রকার ধোঁকাবাজি। সুকৌশলে দ্বীনের একটি অংশকে জেনে বুঝে ছেড়ে দেয়া। মানুষকে মানুষের গোলাম বানিয়ে রাখা। যেমনটি কাল পরিক্রমায় নমরুদ, ফেরাউন ও তার উত্তসূরিরা করেছে। পরিশেষে তাদের বরণ করতে হয়েছে এক অপমানজনক মৃত্যু। কিয়ামত পর্যন্ত তারা মানুষের সামনে একটি ন্যক্কারজনক উদাহরণ হয়ে থাকবে।
এ বিষয়টি স্পষ্ট হয় খলিফা হজরত উমর রা:-এর এক প্রশ্নের জবাব থেকে। তিনি হজরত উবায় ইবনে কাব রা:কে বলেন, ইলম হলো তিনটি বিষয়Ñ এক. আয়াতে মুহকামাহ তথা আল-কুরআন; ২. প্রতিষ্ঠিত সুন্নত তথা মহানবী সা:-এর হাদিস ও ৩. ন্যায় বিধান তথা ফিকাহ শাস্ত্র।’ (তিরমিজি)।
ধর্মভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার বা ধর্মীয় শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে ধর্ম সম্পর্কে অবহিত করে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। সে আল্লাহর এমন একজন বান্দা হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেবে, যার কাজকর্মে থাকবে তাকওয়া। তার সব আমলই হবে কুরআন-সুন্নাহের আলোকে আল্লাহকে রাজিখুশি করার জন্য। মানুষ যেমন তার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, তেমনি সে আল্লাহর নাফরমানিও করবে না। আল্লাহর প্রিয় গোলাম হিসেবে সে তার অর্জিত জ্ঞানকে এমন কাজে ব্যয় করবে, যাতে মানবতার কল্যাণ সাধিত হয়। তার এ কাজের দরুন সে সওয়াব লাভ করতে পারবে। তার সব কাজের মূলে আল্লাহর সন্তুষ্টি। এ ধরনের জ্ঞানে যখন অভ্যস্ত হয়ে উঠে তখন সে নিজেই অপরাধ করে না। সমাজ ও রাষ্ট্রের নিয়মকানুন মানতে তাকে আইনের বাধ্যবাধকতার লাগাম পরাতে হয় না। তার মধ্যে ধর্মীয় নৈতিকতার যে বিকাশ সাধিত হয়েছে সেটিই তাকে একজন আদর্শ মানুষে পরিণত করে।
তা হলে প্রশ্ন থেকে যায়, এ তিনটি বিষয়ের ইলম ছাড়া অন্যান্য ইলম কি মানুষের জন্য প্রয়োজন নেই? নাকি ইসলাম সেগুলোকে সমর্থন করে না? আসলে ইসলাম সব ধরনের জ্ঞানকেই সমর্থন করে। তবে তার উদ্দেশ্য হতে হবে মানুষের কল্যাণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং কাজটি হতে হবে ন্যায়সঙ্গতভাবে ও হকের ওপর। যেমনÑ গণিত, বিজ্ঞান, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন বিষয়ের জ্ঞানার্জন করা ফরজে কেফায়া। এগুলোর মাধ্যমে মানুষ উপকৃত হয়। যখন সমাজে এগুলোর চর্চা না থাকে, মানুষ নানাভাবে কষ্ট পেতে পারে। চিকিৎসক না থাকলে মানুষ রোগে কষ্ট পায়। বিজ্ঞানের আবিষ্কার না থাকলে মানুষের জীবন মান উন্নত হয় না। এ ধরনের ইলমেও মানুষের কল্যাণ রয়েছে। এখানেও আল্লাহর কুদরত রয়েছে। আমরা যে ধরনের জ্ঞানের কথা বলি না কেন বা যেকোনো ধরনের আবিষ্কারের কথা। এ জ্ঞানের প্রকৃত উৎস কিন্তু মানুষ নয়। এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে শেখানো ইলম। মানুষ শুধু তার বুদ্ধি-বিবেচনা ও গবেষণাশক্তি প্রয়োগ করে একে একটি উৎকৃষ্ট রূপ দান করেছে। মানুষের এই বুদ্ধি বা চিন্তা করার ক্ষমতা তা-ও আল্লাহর দান।
মানুষের মনে যখন ধর্ম ও নৈতিক বিকাশ ঘটে তখন যে আপন কুপ্রবৃত্তিকে দমন করে সুকুমারবৃত্তিকে লালন করতে সক্ষম হয়। সে পাপের পথ ও মত থেকে সত্য ও সুন্দরের দিকে ফিরে আসে। তার মধ্যে সত্যবাদিতা, ন্যায়নিষ্ঠা, দয়ামায়া, মহানুভবতা, পরোপকারিতা, সহনশীলতা, সংযম প্রভৃতির প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হতে থাকে। অন্য দিকে লোভ, লালসা, অহঙ্কার, মিথ্যা,পরনিন্দা এসব বিষয়ের প্রতি অন্তরে ঘৃণা জন্মায়। হাদিস শরিফে এসেছে রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীর তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীর তখন খারাপ হয়ে যায়। আর এই গোশতের টুকরাটি হলো কলব (মস্তিষ্ক)।’ এই কলবকে ভালো করতে হলে ধর্ম ও নৈতিকতার শিক্ষায় নিজেকে বলীয়ান করতে হবে। তা হলে আমাদের এই আত্মাটা একটি পরিশুদ্ধ আত্মায় পরিণত হবে। কোনো পাপ আমাদের স্পর্শ করতে পারবে না। ফলে মানুষ মানুষের মাধ্যমে উপকৃত হবে। প্রতিষ্ঠিত হবে একটি সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ।
বিশ্বজুড়ে আজকে মানুষের যে নৈতিক অধঃপতন তার মূল কারণই হলো মানুষ এখন অতিমাত্রায় বস্তুবাদী হয়ে উঠেছে। ভোগবাদী মানসিকতা তাদের মনুষ্যত্বকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এমনি একটি পরিস্থিতিতে মানুষের অবশ্যই ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিকতার ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করে এ সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। আদর্শের ভিত যদি মানুষের মজবুত হয় তাকে আর কোনোভাবেই বিভ্রান্ত করা সম্ভব হবে না। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যদি আমরা সুন্দর, পরিশীলিত ও আদর্শবান মানুষ হিসেবে দেখতে চাই তা হলে সবার আগে নিজেকেই সে আদর্শের সৈনিক হতে হবে। তা হলে তার প্রভাব অবশ্যই আগামী প্রজন্মের মানুষগুলোর ওপর পড়বে।
লেখক : সাহিত্যিক ও গবেষক

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English