রেলের লেভেল ক্রসিংগুলো যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। গত ১২ বছরে শুধু লেভেল ক্রসিংয়েই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩ শতাধিক ব্যক্তি। আহত হয়েছেন আরো অনেকে। সর্বশেষ গতকাল শনিবার জয়পুরহাট সদরের পুরানাপৈল রেলগেট এলাকায় বাস ও ট্রেনের সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হয়েছেন। এভাবে একের পর এক দুর্ঘটনায় জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও টনক নড়ছে না রেল কর্তৃপক্ষের। তাদের ভাষ্য, দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ অবৈধ লেভেল ক্রসিং। সারাদেশে রেল নেটওয়ার্কের প্রায় ৩ হাজার লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে ১ হাজার ৭৬১টিই অনুমোদনহীন। আর এগুলোতেই বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। এক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ লেভেল ক্রসিংগুলোতে শুধু ‘সতর্কীকরণ’ সাইনবোর্ড টানিয়েই দায় এড়ানোর চেষ্টা করে রেল কর্তৃপক্ষ। যদিও জয়পুরহাটের পুরানাপৈল লেভেল ক্রসিংটি রেলওয়ের অনুমোদিত এবং সেখানে দায়িত্ব পালনের জন্য ৩ জন গেট কিপারও নিয়োজিত আছেন। কিন্তু একজনের দায়িত্ব অবহেলায় (ঘুমিয়ে যাওয়া) ঝরে গেল ১২টি প্রাণ!
এর কিছু দিন আগে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার বেতকান্দি এলাকায় অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে বর-কনেসহ মাইক্রোবাসের ১১ জন নিহত হন। গত ১৬ অক্টোবর যশোরের অভয়নগর এলাকায় একটি অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে প্রাইভেট কারের ধাক্কায় ৫ জনের মৃত্যু হয়। আরো বেশ কয়েক জন আহত হন। সূত্রমতে, ২০০৮-২০১৯ এই ১১ বছরে লেভেল ক্রসিংগুলোয় ৩১৩টি দুর্ঘটনায় ৩ শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ১১টি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২৬ জন। কিন্তু ক্রসিংগুলোয় দুর্ঘটনা বন্ধে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এতে একদিকে ট্রেন ও অন্যান্য যানবাহনের যেমন ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে কাক্সিক্ষত গতিতে চলতে পারছে না ট্রেন।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বিগত এক যুগে রেলওয়েতে ১ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও লেভেল ক্রসিংগুলো নিরাপদ করতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেয়া হয়নি। ক্রসিং উন্নয়নে গত ৬ বছরে মাত্র ৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের জনসংযোগ শাখা সূত্রে জানা গেছে, বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে সারাদেশে রেল নেটওয়ার্কে ২ হাজার ৮৫৬টি লেভেল ক্রসিং আছে। এর মধ্যে মাত্র ২৪২টিতে রেলের স্থায়ী রক্ষী রয়েছে, আর ৮২০টিতে রয়েছে চুক্তিভিত্তিক রেলরক্ষী- যা মাত্র ৩১ শতাংশ। রক্ষীবিহীন ক্রসিং আছে ১ হাজার ৭৯৪টি অর্থাৎ ৬৯ শতাংশ ক্রসিংয়ে রক্ষী নেই, আর অনুমোদনহীন ক্রসিং ৬২ শতাংশ। অবৈধ ও অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং নিয়ে রেল কর্তৃপক্ষ শতাধিক মামলা করেছে, যেগুলো এখন বিচারাধীন। পক্ষান্তরে লেভেল ক্রসিংগুলো মৃত্যুফাঁদ হয়ে ঠিকই রেললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, বর্তমানে রেল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টে বেশি নজর দিচ্ছে। সে কারণে মেইনটেনেন্স এবং অপারেশনে আগে যে ধরনের নজরদারি ছিল তা একটু ঢিলেঢালা হয়ে যাচ্ছে। সবাই শুধু উন্নয়ন প্রকল্পের দিকে নজর দিচ্ছে। এখানে শুধু গার্ডের গাফিলতি কেন, অপারেশন সিস্টেম এবং জবাবদিহিতারও অভাব রয়েছে রেলকর্তাদের। ব্রিটিশ আমলে রক্ষাবেক্ষণ ও তদারকি অনেক জোরদার ছিল। তারা একটা সিস্টেম দাঁড় করিয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে তা নষ্ট হয়ে গেছে। একজন গেটম্যান ঘুমিয়ে পড়তে পারে কিন্তু রক্ষাবেক্ষণ ও তদারকির দায়িত্বে যারা থাকেন তারা কেন সঠিক দায়িত্ব পালন করেননি, তারা কেন ফোন করে সতর্ক করেননি? এমন প্রশ্ন তোলেন তিনি। অধ্যাপক শামসুল হক আরো বলেন, রেলের স্পিড বাড়ছে, ট্রেন বাড়ছে, তাই শুধু উন্নয়নের দিকে নজর না দিয়ে অপারেশন ও জবাবদিহিতার দিকে নজর দিতে হবে।
বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ বলেন, আসলে মানুষ নির্ভরতা কমিয়ে রেলকে প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে। রেলগেটে গেটম্যান ঘুমিয়ে পড়তে পারেন, তাহলে সেখানে যদি সাইরেন বা সতর্কীকরণ কোনো হুইসেল বাজত, তাহলে গেটম্যান যেমন জেগে উঠত তেমনি বাসটিও থেমে যেত। সেই সঙ্গে অবৈধ লেভেল ক্রসিং তৈরি করা বন্ধ করা এবং যা কর্মীহীন আছে সেগুলোতে গেটম্যান নিয়োগের সুপারিশ করেন তিনি।
এ বিষয়ে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, স্থানীয় সরকার বিভাগ অর্থাৎ সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ স্থায়ী মানুষজন নিজেদের প্রয়োজনে রেলকে না জানিয়ে বেশ কিছু লেভেল ক্রসিং বানিয়েছে। অনেক স্থানে এসব অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ে গেটম্যান নেই, ফলে রেলের দুর্ঘটনা বাড়ছে। এটা অনাকাক্সিক্ষত ও দুঃখজনক। এসব অবৈধ ক্রসিং যারা বানিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
গতকালের দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, লেভেল ক্রসিংয়ে রক্ষী থাকা সত্ত্বেও ক্রসিং গেট কেন বন্ধ না করা হয়নি সে বিষয়ে আমরা তদন্ত কমিটি করেছি। রেলের মহাপরিচালক ও এডিজি অপারেশন সেখানে গেছেন। সাময়িকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত গেট-কিপারকে বরখাস্ত করা হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন মামলাসহ নানা জটিলতায় কর্মী নিয়োগ বন্ধ থাকার সব গেটে গেট-কিপার নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়নি। আগামীতে ১ হাজার ৩০০-র মতো গেট-কিপার নিয়োগ দেয়া প্রক্রিয়াধীন। এ নিয়োগ সম্পন্ন হলে গেটের সমস্যা মিটে যাবে।