‘হিলি’ একটা গ্রামের নাম। র্যাডক্লিফ সাহেব ভারত ভাগের সময় মূলত যে এলাকাগুলোর সর্বনাশ করেছিলেন, হিলি তার মধ্যে অন্যতম। দেশভাগের ফলে এই গ্রামের পশ্চিম অংশ, ভারতের পশ্চিম দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত হয় আর পূর্ব অংশ পূর্ব পাকিস্তানে তথা বর্তমান বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার অংশ হয়ে যায়। গ্রামের রেলস্টেশন, বাজার, দোকানপাট থেকে যায় তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে। আর দোকানদার, আড়তদার, স্টেশনের কুলি এদের বাড়িঘরের ঠিকানা বদলে যায় পশ্চিমবঙ্গে। এই হিলিতেই ১৯৭১ সালে সংঘটিত হয়েছিল সামরিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ তো বটেই, হিলির যুদ্ধ, ভারতীয় উপমহাদেশের ‘যুদ্ধ ইতিহাসে’ এক উল্লেখযোগ্য নাম।
এখনো পর্যন্ত ভারত পাকিস্তানের মধ্যে যত যুদ্ধ হয়েছে তার মধ্যে বোধ হয় সবচেয়ে ভয়ংকর যুদ্ধ হয় এই হিলিতে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে হিলির যুদ্ধকে তাই শুধু ভারতীয় সেনাই নয় পাকিস্তানি সেনাও খুব সম্ভ্রমের সঙ্গে মনে রেখেছে। যুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু পাকিস্তানি সেনাপতি তাদের স্মৃতিচারণায় বারবার এই যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেছে। যদিও আমরা সেই গল্প প্রায় ভুলতে বসেছি।
অফিশিয়াল যুদ্ধ হয়েছিল মাত্র ১২ দিনের—৪ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর। কিন্তু ‘হিলির যুদ্ধ’ চলে ২৫ দিন ধরে। এই যুদ্ধ ‘অফিশিয়াল যুদ্ধ’ ঘোষণার আগেই শুরু হয় এবং পাকিস্তানি সেনাপতি জেনারেল নিয়াজির আত্মসমর্পণের পরও চলতে থাকে। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, এই যুদ্ধে স্থানীয় এলাকার ভূপ্রকৃতির সঙ্গে দুই দেশের সেনাবাহিনীর স্ট্র্যাটেজি আর সামরিক সম্ভারের ব্যবহার বিশ্বের অনেক মিলিটারি কলেজের সিলেবাসে পড়ানো হয়।
ভারত
মেজর জেনারেল লছমন সিং তাঁর ‘২০ নম্বর’ মাউন্টেন ডিভিশন নিয়ে হিলি আক্রমণের দায়িত্বে ছিলেন। এই ডিভিশনে তখন চারটি স্বাধীন ব্রিগেড (৬৬, ১৬৫, ৩৪০—এরা সব ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেড বা পদাতিক সৈন্য) আর ট্যাংক নিয়ে একটা আর্মার্ড ব্রিগেড (৩ নম্বর), ৪৭১ ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেড (যুদ্ধের মধ্যে রাস্তা, বাংকার, ব্রিজ বানাতে লাগে), দুটো আর্টিলারি ব্রিগেড, মিডিয়াম আর দূরপাল্লার কামানসহ আর মুক্তিবাহিনী। তাদের মধ্যে অনেকেই ‘ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস’ থেকে বিদ্রোহ করে বেরিয়ে আসা বাঙালি সেনা।
পাকিস্তান
পাকিস্তানি আর্মির ২০৫ নম্বর ব্রিগেড কমান্ড করছিলেন ব্রিগেডিয়ার তাজমুল হুসেন মালিক। অদ্ভুত এক পাগলামি ছিল এই কমান্ডারের মধ্যে। অসম্ভব সাহসী, একটু খ্যাপাটে কিন্তু ধুরন্ধর এই ব্রিগেডিয়ার বলেছিল, ‘আমার হাতে লাস্ট পিস্তলের গুলি থাকা পর্যন্ত আমি আত্মসমর্পণ করব না। একজন সাচ্চা মুসলমান কখনো আত্মসমর্পণ করে না।’ মানে ধর্ম কীভাবে মিলিটারি প্রফেশনের সঙ্গে মিলে যেতে পারে, তার চরম উদাহরণ এ বক্তব্য।
পাকিস্তানের দিকে আরও ছিল ৪ নম্বর ফ্রন্টিয়ার ফোর্স, ৮০ নম্বর ফিল্ড রেজিমেন্টের পার্ট, ৬ খানা ফিল্ড গান নিয়ে। একে কমান্ড করছিলেন মেজর আনওয়ার খান। লেফটেন্যান্ট শের জান তাজিক কমান্ড করছিলেন ৩ খানা ট্যাংক, ২টি রিকয়েললেস রাইফেল। এই রাইফেল জিপে বসিয়ে ট্যাংক মারতে এক্সপার্ট। ৫১ জন পাকিস্তানি পুলিশ আর তার সঙ্গে বিশাল রাজাকার বাহিনী। এই এলাকায় মুক্তি বাহিনীর চেয়ে রাজাকার বাহিনী বেশি শক্তিশালী ছিল। হিলির এই এলাকা ভারতের বিহার রাজ্যের কাছাকাছি। এখানে বিহারি বা হিন্দিভাষী মুসলমানদের সংখ্যা অধিক। ১৯৭১–এর যুদ্ধে পাকিস্তানের গেজেটেড আর্মড রাজাকার ছিল প্রায় ৩৭ হাজার!
আর হিলির দক্ষিণে বগুড়া ছিল পাকিস্তানি আর্মির প্রধান যোগাযোগ কেন্দ্র এবং ১৬ নম্বর ডিভিশনের হেড কোয়ার্টার। স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় সেনার টার্গেট ছিল হিলি। এই এলাকা দখল করা না গেলে ঢাকা দখল করা সম্ভব ছিল না।
বগুড়া যাওয়ার সবচেয়ে সহজ রাস্তা হচ্ছে হিলি হয়ে রংপুর-বগুড়া রাস্তা ধরা। কিন্তু সে যে এত কঠিন হতে পারে, তা ভারতীয় কমান্ডাররা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেননি।
যুদ্ধ শুরু
ব্রিগেডিয়ার তাজমুল রেললাইনের ধার দিয়ে একটা স্ক্রিন বানিয়ে দিয়েছিল, যাতে ভারতীয় সেনা ওপারে পাকিস্তানি সেনাদের প্রস্তুতি দেখতে না পায়। তার সঙ্গে রোড ব্লক আর বাংকার বানিয়ে বর্ডার পার হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশের সব রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এগুলো সব যুদ্ধের সাধারণ ট্যাক্টিস।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামসের সিং কমান্ড করছিল ভারতের ‘৮ গার্ডস’ রেজিমেন্টকে। গার্ডস এমন একটা রেজিমেন্ট, যা সব ধর্মের সব জাতির সেনা নিয়ে গঠিত। এই ধারণাটি প্রথম ভারতীয় সেনা চিফ ফিল্ড মার্শাল কারিয়াপ্পার। অনেকেই জানেন হয়তো, সেনাবাহিনীর প্রায় সব ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের রিক্রুটমেন্ট হয় জাতিভিত্তিক। এই ‘গার্ডস’ ব্যাটালিয়ন তার ব্যতিক্রম। যাহোক, এই ‘গার্ডস’–এর ৮ নম্বর ব্যাটালিয়নকে দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রথম আক্রমণের। সবাইকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, এই প্রথম আক্রমণে পাকিস্তান যেন কোনোভাবেই অ্যাডভান্টেজ না পায়।
‘১৯৭১ ওয়ার: ব্যাটেল অব বোগড়া’, লে. জে. জেবিএস যাদব। ইনডিয়ানডিফেন্সরিভিউ ডটকম
আক্রমণের আগে একবার আকাশপথেই হোক কিংবা লুকিয়ে পায়ে হেঁটেই হোক, গোপনে শত্রু ঘাঁটি দেখা দরকার—যাকে বলে রেকি বা ‘রেকোনেসাঁ’। এ ক্ষেত্রে তা করা যায়নি। কারণ কঠোর নির্দেশ ছিল, যেহেতু যুদ্ধ তখনো শুরু হয়নি, ভারতীয় সেনা বর্ডার পার হবে না। এই অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকেও খুব একটা সাপোর্ট পাওয়া যাচ্ছিল না, সেখানে রাজাকারদের দৌরাত্ম্য বেশি ছিল বলে। আর সতর্কতা হিসেবে রেকি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলে পাকিস্তান জানতে পেরে যাবে যে ভারত রেকি করছে। তাহলে আক্রমণের ‘সারপ্রাইজ’ নষ্ট হয়ে যাবে।
আক্রমণের দিনক্ষণ ঠিক ছিল ২২-২৩ নভেম্বরের রাত। ৮ গার্ডস তাদের পুরো শক্তি আর মনের জোর নিয়ে প্রথম আক্রমণ শুরু করে। ফার্স্ট টার্গেট হিলির উত্তরে নোয়াপাড়া এলাকা। এখানে সেই ব্রিগেডিয়ার তাজমুলের ২০৫ নম্বর ব্রিগেড পাকিস্তানি ঘাঁটি সামলাচ্ছিল।
এক ব্যাটালিয়ন সেনা (৩০০ জন) একটা ব্রিগেডকে (১০০০ জন) আক্রমণ করছে এ রকম সাধারণত হয় না। সেনাবাহিনী বিজ্ঞান বলে, শত্রু ঘাঁটি সাধারণত ১:৪–এর অনুপাতে আক্রমণ করতে হয়। মানে শত্রু পোস্টে ১ জন প্রহরী সেনা থাকলে তাকে ৪ জন আক্রমণ করবে। হিলির যুদ্ধের ক্ষেত্রে হিসাব ছিল উল্টো!
আগেই বলেছি, দুই দেশের সীমারেখা হচ্ছে রেললাইন। ভারতের আক্রমণ সেই লাইন পার করে করতে হবে। আক্রমণের সামনে ট্যাংক থাকলে ইনফ্যান্ট্রির সুবিধা হয়। কিন্তু এখানের জলাময় ধানখেতের মাটি এত নরম যে ট্যাংক চালানো মুশকিল। অবশ্য পেছন থেকে কিছু আর্টিলারি বা কামানের সাপোর্ট ছিল। আর এর মধ্যে সেই জলে ডোবা ধানের খেতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গ্রেনেড দিয়ে ‘বুবি ট্র্যাপ’ বানিয়ে রেখেছে। মাইন বিছানো সেই মাঠের মধ্যে দিয়েই ইন্ডিয়ান আর্মি এগিয়ে গিয়ে শত্রু বাংকার আক্রমণ করে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই পাকিস্তান বুঝতে পারে কোন দিক থেকে ভারতীয় বাহিনীর আক্রমণ আসছে। সে দিক লক্ষ্য করে পাকিস্তানি মেশিনগান গর্জে ওঠে। বেশ কিছু ভারতীয় সেনা মারা যায়, অনেক আহত হয়। কিন্তু ‘গার্ডস’ও পিছু হটার পাত্র না।
দিন কয়েক পরে, এই যুদ্ধের এক আহতকে দেখতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা মিলিটারি হাসপাতালে আসেন। ইনি ছিলেন পূর্ব সেক্টরে ইন্ডিয়ান আর্মি আর মুক্তি ফৌজের যৌথ বাহিনীর কমান্ডার। তাঁকে সেই আহত গার্ডস সেনা বলেছিলেন, স্যার দেখুন, কোনো একটা গার্ডস–এর পিঠে গুলি লাগেনি। মানে সবাই বুক চিতিয়ে লড়াই করেছে!
বিকেল ৫টা থেকে ভারতীয় আর্টিলারির ফায়ারিং শুরু হয় ২২ নভেম্বর। সারা রাত ধরেই কামানের গোলা হিলির বিভিন্ন প্রান্তে এসে পড়তে থাকে। পাকিস্তানি আর্মির ডেলটা কোম্পানির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন মেজর জুলিয়ান পিটার। নিজেদের পজিশন শক্ত হাতে সামলে রাখে।
এদিকে পাকিস্তানি আর্মির প্রতি আক্রমণের প্রথম ধাক্কাতেই মেজর মঞ্জেরেকর আহত হন। তা সত্ত্বেও যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন। ধানখেতের মধ্যে দিয়ে ক্রল করে এগিয়ে একটা শত্রু বাংকারে গ্রেনেড ছুড়তে গেলে পাকিস্তানি মেশিনগানের একঝাঁক বুলেট এসে লাগে তাঁর বুকে। অবশ্য মঞ্জেরেকর মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ার আগে ভারতীয় সেনা একটা পাকিস্তানি পোস্ট দখল করতে সক্ষম হয়।
মঞ্জেরেকরের জায়গায় এগিয়ে আসেন লেফটেন্যান্ট সামশের শর্মা। শর্মাও বেশিক্ষণ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারেননি। কিন্তু তাঁর ভয়ংকর আক্রমণের মুখে বেশ কয়েকটা পাকিস্তানি বাংকার ভারতীয় সেনার দখলে আসে। সামশের শর্মা মরণোত্তর ‘মহাবীর চক্র’ পদক পান।
হিলি যুদ্ধের মানচিত্র– ২
হিলি যুদ্ধের মানচিত্র– ২ছবি: ‘১৯৭১ ওয়ার: ব্যাটেল অব বোগড়া’, লে. জে. জেবিএস যাদব। ইনডিয়ানডিফেন্সরিভিউ ডটকম
এরপর শহীদ হন লেফটেন্যান্ট গুপ্তা। ইনি দখল করা জায়গাগুলোকে রক্ষা করার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। মোহরা পাড়া দখলে রাখতে গিয়ে মেজর রাও মারা গেলে তাঁর জায়গায় ক্যাপ্টেন বিষ্ণু শর্মা শেষ পর্যন্ত লড়তে থাকেন। ওদিকে ক্যাপ্টেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর টিম নিয়ে পাকিস্তানি পোস্ট লক্ষ্য করে আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকেন। একটা গুলি এসে তাঁর বুকে লেগে ঘাড়ের পাশ দিয়ে ফুঁড়ে বেরিয়ে যায়। তিনি অবশ্য শেষ পর্যন্ত বেঁচে যান।
পাকিস্তানি ডিফেন্সের পতন আসন্ন দেখে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তখন অন্য পোস্ট থেকে মোহরা পাড়াকে ঠেকাতে সেনা সরিয়ে আনে। মেজর পি পি সিং তাঁর টিম নিয়ে আরও পূর্ব দিকে সরে গিয়ে পেছন থেকে পাকিস্তানি আর্মির হিলির দিকে আসার রাস্তা আটকে দেন। ফলে পাকিস্তান আর্মি, মোহরা পাড়া ছেড়ে পেছনে চন্ডীপুরের দিকে পালাতে থাকে। দুই পক্ষেরই প্রচুর অস্ত্র আর মৃতদেহ পড়ে থাকে। প্রথম রাতের যুদ্ধ শেষে ৮ গার্ডসের মৃত সেনাসংখ্যা ছিল ৬৭!
দ্বিতীয়বার ভারতীয় আক্রমণ শুরু হয় ২৩ নভেম্বর রাত দেড়টা নাগাদ।
ততক্ষণে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যবর্তী জায়গা আহত আর মৃতদেহে ছেয়ে গেছে। পাকিস্তানি হাবিলদার ইসাফ খান হাতাহাতি লড়াইয়ে ভারতীয় সেনাকে পেছনে হটতে বাধ্য করে। তবে তারও শেষনিশ্বাস পড়ে এই রণক্ষেত্রেই। ইসাফ খান পাকিস্তানি আর্মির ‘তামঘা-এ-জুরত’ পদক পেয়েছিল।
প্রথম আক্রমণে খুব একটা অগ্রগতি না হওয়ার ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনী কৌশল পরিবর্তন করে হিলি থেকে সরে এসে নোয়াপাড়াতে ঘাঁটি বানায়, যাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ডেলটা কোম্পানিকে ডান দিক থেকে আক্রমণ করা যেতে পারে। ২৫ নভেম্বর বিকেলের দিকে ভারতীয় সেনা বড় চিংগ্রাম গ্রামের দিকে সরে এসে সন্ধ্যার মধ্যে বেশ কয়েকটা গ্রাম পাকিস্তানি দখলমুক্ত করে।
পাকিস্তানি সেনা কমান্ডার বুঝতে পারে, ভারতীয় বাহিনীর লক্ষ্য হিলি থেকে বোয়ালদার গ্রাম হয়ে ঘোড়াঘাট। কারণ সেখানে পৌঁছে গেলে পাকিস্তানি আর্মির ডেলটা কোম্পানিকে বগুড়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া যাবে। এতে মহেশপুর গ্রামে ঘাঁটি গেড়ে থাকা ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টার বাইপাস হয়ে যাবে। ব্রিগেড কমান্ডারকে তখন অন্য জায়গা থেকে ট্রুপ সরিয়ে এনে ঘোড়াঘাট বাঁচাতে হবে।
মেজর জেনারেল লছমন সিং ঠিক করেন, ভারতীয় সেনাবাহিনী একসঙ্গে দুই দিকে যুদ্ধ শুরু করে দিলে গাইবান্ধা হয়ে বগুড়ার দিকে সহজেই এগিয়ে যেতে পারবে। কারণ ওদিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সংখ্যা কম।
এই অবস্থায় ব্রিগেডিয়ার তাজমুল হোসেন তাঁর ‘আলফা’ আর ‘চার্লি’ কোম্পানিকে নোয়াপাড়া আক্রমণের নির্দেশ দেন। এত দিন এখানে ভারতীয় সেনা আর মুক্তিবাহিনীই আক্রমণ চালাচ্ছিল, পাকিস্তানিরা নিজেদের এলাকা ঠেকাচ্ছিল। পাকিস্তানিদের ‘চার্লি’ কোম্পানির ঘাঁটি ছিল ১৫ মাইল দূরে, চোরকাই গ্রামে। তাদের নিজেদের লজিস্টিকের অপ্রতুলতার জন্য সেখান থেকে ভোর সাড়ে চারটার দিকে মাত্র দুই প্লাটুন সেনা বোয়ালদার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
নোয়াপাড়ায় তত দিনে ভারতীয় সেনা এক স্কোয়াড্রন ট্যাংক, আর্টিলারি অবজারভেশন পোস্ট, দূরপাল্লার কামান এসব জড়ো করে ফেলেছে। ওদিকে দিনের আলো ফোটার আগেই পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ শুরু করে দেয়। প্রথম ধাক্কায় ‘আলফা’ কোম্পানি বড় চিংগ্রাম দখল করতে পারলেও ভারতীয় সেনা নোয়াপাড়াকে ঠেকিয়ে দেয় এবং শেষে বড় চিংগ্রাম থেকেও পাকিস্তানি সেনাদের খেদিয়ে দেয়।
দিনের শেষে পাকিস্তানি সেনার ১০ জন নিহত আর ২০ জন আহত হয়।
পাকিস্তানি আর্মির ‘আলফা’ কোম্পানি ছোট তুলসী এলাকায় পালিয়ে এসে নিজেদের একত্র করে। তারপর আবার চোরকাইতে ফিরে যায়, যাতে ভারতীয় বাহিনী চোরকাই-নবাবগঞ্জ রাস্তা ধরে এগোতে না পারে।
পরে আবার পাকিস্তানি আর্মির ব্রেভো কোম্পানি, যারা বোয়ালদারে ছিল, তাদের পাঠানো হয় বড় চিংগ্রাম দখল করতে। ২৯-৩০ নভেম্বর রাতে পাকিস্তানি ঝটিকা আক্রমণের মুখে ভারতীয় সেনার ডিফেন্স ভেঙে পড়ে। ১ ডিসেম্বর বড় চিংগ্রামের কাছে বোইগ্রাম ঈদগা পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আসে। পাকিস্তানি আর্মির ৪ নম্বর ফ্রন্টিয়ার ফোর্স প্রায় পুরো এলাকা আবার দখল করে নেয়। কেবল ডেলটা কোম্পানির একটা প্লাটুন তখনো হিলির রেললাইনের ওপারে ঘেরাও হয়েছিল।
৩০ নভেম্বর, ভারতীয় বাহিনীর এক ব্যাটালিয়ন সৈন্য সঙ্গে ট্যাংক নিয়ে ডাঙা পাড়া স্টেশন আর রায়বাঘের আশপাশের এলাকা দখল করে। এতে পাকিস্তানি বাহিনী বেশ কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। কারণ ভারতীয় সেনা যদি হিলির ডান দিক দিয়ে আরও একটু এগিয়ে আসে, আর চোরকাই-ঘোড়াঘাট রাস্তা দখল করে নেয়, তবে বগুড়ার দিক থেকে আসা পাকিস্তানি সহায়তা লাইন কাটা পড়ে হিলির পোস্ট বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তাই ফ্রন্টিয়ার ফোর্সকে আবার অন্য স্ট্র্যাটেজিতে ডিপ্লয় করা শুরু হয়।
ওদিকে পাকিস্তানি আলফা কোম্পানি ছোট তুলসী বরাবর এগিয়ে গিয়ে নোয়াপাড়া আক্রমণ করে। ব্রেভো কোম্পানি বড় চিংগ্রাম-বিশা পাড়া-বইগ্রামকে দখল করতে এগিয়ে আসে। চার্লি কোম্পানিকে পাঠিয়ে দেয় চোরকাই, রাইবাঘ পর্যন্ত এলাকা আবার দখল করতে। তাহলে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ঠেলে বর্ডার পার করিয়ে দেওয়া যাবে। এতে রেললাইনের ওপরে পাকিস্তানি সেনার কন্ট্রোল মজবুত হবে।
ব্রেভো কোম্পানি আর ডেলটা কোম্পানির সামনে কিছুটা এলাকা ফাঁকা হয়ে গেলে ভারতীয় বাহিনীকে তিন দিক থেকে ঘিরে রাখা যাবে। হিলির দিকে আক্রমণ করতে গেলে নালা, খাল এসব প্রাকৃতিক বাধা পার হতে হবে।
এ যেন খেলার মাঠে দড়ি টানাটানি!
মেজর জেনারেল ক্লেমন সিং শেষ পর্যন্ত হতাশ হতে শুরু করেন। কারণ, কোনোভাবেই পাকিস্তানি আর্মির ডিফেন্স ভেঙে যৌথ বাহিনীর সেনা বগুড়ার দিকে এগোতে পারছিল না। এ সময় ডাক পড়ে ভারতীয় বিমানবাহিনীর।
দিন কয়েকের এয়ার অ্যাটাকে পাকিস্তানি সেনার দুর্গ ভেঙে পড়ে। ১১ ডিসেম্বর মোহরাপাড়া ভারতীয় সেনার দখলে আসে। একে একে নোয়াপাড়া, চন্ডীপুর, হাকিমপুর, ডাঙ্গাপাড়াও দখলে আসে।
এর পরের লক্ষ্য বগুড়া। ১১ ডিসেম্বর পাকিস্তানি আর্মির ১৬ ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল নাজার হুসেন, ব্রিগেডিয়ার তাজমুলকে হিলি পোস্ট থেকে সরে বগুড়া আসতে বলে। তখন তার নিজের দুর্গ বাঁচানোই সমস্যা।
১৬ তারিখ সকালেই হিলির ২০৫ ব্রিগেড অস্ত্র সমর্পণ করে। সেদিন বিকেলে লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজি ঢাকায় আত্মসমর্পণ করার পরও নওগাঁ থেকে এক ব্যাটালিয়ন সেনা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল। মেজর জেনারেল নাজের হুসেন ব্রিগেডিয়ার তাজমুলকে হিলির ব্রিগেড নিয়ে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেয়। কিন্তু তিনি আত্মসমর্পণ করবে না বলে ঠিক করেই রেখেছিল। তাই নিজের দেহরক্ষী নিয়ে নওগাঁ গিয়ে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে। রাস্তায় তার গাড়িতে পাকিস্তান বাহিনীর পতাকা দেখে মুক্তিযোদ্ধারা গুলি চালায়। গুলিতে তার দেহরক্ষী মারা যায় আর ব্রিগেডিয়ার তাজমুল ধরা পড়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের মারে তার হাত ভাঙে, সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। অজ্ঞান অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের হাত থেকে ভারতীয় সেনা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতাল নিয়ে যায়।
ঢাকার আনুষ্ঠানিক সারেন্ডারের পর মেজর জেনারেল নাজের হুসেনকে ভারতীয় এয়ার ফোর্সের হেলিকপ্টার নাটোর থেকে হিলি নিয়ে আসে। অদৃষ্টের পরিহাসে আনুষ্ঠানিকভাবে হিলিতে আত্মসমর্পণ করেন তিনি।
হিলির যুদ্ধে ‘৮ গার্ডস’ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অবশ্য ৩ জন মহাবীর চক্র, ২ জন বীর চক্র আর ১ জন সেনা মেডেল পায়।
১৯৭১–এর যুদ্ধের পরে বন্দী মুক্তি হলে ব্রিগেডিয়ার তাজমুল পাকিস্তানে ফিরে যান। পরে তার মেজর জেনারেল র্যাঙ্কে পদোন্নতি হয়। পূর্ব পাকিস্তানের আত্মসমর্পণকারী একমাত্র ব্রিগেডিয়ার তিনি, যার প্রমোশন হয়েছিল।