হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকা- কেড়ে নিয়েছে ৫২ জন শ্রমিকের প্রাণ। অতীতেও দেশে অসংখ্য শিল্পকারখানায় এমন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে অনেককেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দায়ীদের বিচার না হওয়ায় একের পর এক এসব ঘটনা ঘটেই চলেছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে আসামিরা জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের বার্ষিক পরিসংখ্যান ঘেঁটে জানা গেছে, ২০১৬ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে সারা দেশে ৫ হাজার ৮৩৪ বার বিভিন্ন শিল্পকারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব আগুনে হাজার হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। তবে এসব অগ্নিকা-ে হতাহতের ঘটনা তুলনামূলক কম।
২০২০ সালে সারা দেশে ৬৫৬ বার বিভিন্ন শিল্পকারখানায় আগুন লাগে। এর মধ্যে পোশাক শিল্প-কারখানা রয়েছে ২৭৩টি। বাকি ৩৮৩টি অন্যান্য শিল্পকারখানা। এসব অগ্নিদুর্ঘটনায় ৪৮ কোটি ৯০ লাখ ৭৯ হাজার ৯৭৭ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। নিহত হন ৫ জন, আহত হন ২১ জন।
২০১৯ সালে দেশের শিল্পকারখানাগুলোতে ১ হাজার ১৬২টি অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে পোশাক শিল্প-কারখানা ১৬৫টি, বাকি ৯৯৭টি অন্যান্য শিল্পকারখানা। এসব ঘটনায় সাতজন আহত হন। গার্মেন্টে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতি হয় ৫ কোটি ৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা এবং অন্যান্য শিল্প কারখানায় আগুনে ছয় হাজার কোটি ৫৬ লাখ ৫৬ হাজার ৭১৪ টাকা ক্ষতি হয়। ২০১৮ সালে দেশের শিল্পকারখানাগুলোতে ১ হাজার ৩০৪টি অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে পোশাক শিল্প-কারখানা ১৭৩টি, বাকি ১ হাজার ১৩১টি অন্যান্য শিল্পকারখানা। এসব ঘটনায় দুজন নিহত ও দুজন আহত হন। গার্মেন্টে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতি হয় ১ কোটি ৬৩ লাখ ৬৪ হাজার টাকা এবং অন্যান্য শিল্পকারখানায় আগুনে ১২৫ কোটি ৩৮ লাখ ১০ হাজার ৮৩৯ টাকা ক্ষতি হয়।
২০১৭ সালে দেশের শিল্প কারখানাগুলোতে ১ হাজার ২৮৯টি অগ্নিকাণ্ডে ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে পোশাক শিল্পকারখানা ২৭০টি, বাকি ১ হাজার ১৯টি অন্যান্য শিল্পকারখানা। এসব ঘটনায় দুজন নিহত ও ২০ জন আহত হন। গার্মেন্টে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতি হয় ২৪ কোটি ৪৯ লাখ ৫৮ হাজার টাকা এবং অন্যান্য শিল্প কারখানায় আগুনে ৪২ কোটি ৪৩ লাখ ৪ হাজার ৭৬০ টাকা ক্ষতি হয়।
২০১৬ সালে দেশের শিল্পকারখানাগুলোতে ১ হাজার ৪২৩টি অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে পোশাক শিল্পকারখানা ২৫৮টি, বাকি ১ হাজার ১৬৫টি অন্যান্য শিল্পকারখানা। এসব ঘটনায় ৩২ জন নিহত ও অর্ধশতাধিক আহত হন। গার্মেন্টে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতি হয় ৩২ কোটি ২০ লাখ ৭৫ হাজার ৩০০ টাকা এবং অন্যান্য শিল্পকারখানায় আগুনে ৫৩ কোটি ৮৩ লাখ ৭৩ হাজার ২০০ টাকা ক্ষতি হয়।
সজীব গ্রুপের কারখানায় অনুমোদন ছিল না
সজীব গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কারখানার ভবনটিতে ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন ছিল না। ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) দেবাশীষ বর্ধন বলেন, ফায়ার সার্ভিস থেকে প্রতিটি কারখানার ভবনের জন্য ফায়ার সেফটি প্ল্যানের একটি অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু এই ভবনটির নকশা ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের অনুমোদিত ছিল না। রাজউকের ছাড়পত্র, কারখানা অনুমোদনের ছাড়পত্র, পরিবেশের ছাড়পত্র নিয়েছিল কি-না, তা জানা নেই।
ঝুলে আছে ভয়াবহ অগ্নি দুর্ঘটনাগুলোর বিচারকাজ: মালিকের দায়হীনতা, সরকারি কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় বারবার শিল্পকারখানাগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় শ্রমিকদের প্রাণ গেলেও বিচারকাজ ঝুলে থাকছে বছরের পর বছর। গত কয়েক বছরে তাজরীন ফ্যাশনস, টাম্পাকো ফয়েলস মিল, কেটিএস টেক্সটাইলস, সারেকা গার্মেন্ট, তাহিদুল ফ্যাশন, সিনটেক্স লিমিটেড, তামান্না গার্মেন্ট, রহমান অ্যান্ড রহমান অ্যাপারেলসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটে। তবে এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে ২০১৬ সালের মধ্যে। ২০১৬ সালের পর ২০২১ সালের জুলাই মাসে হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডে আরেকটি বড় অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটল। ভয়াবহ এসব দুর্ঘটনার বেশিরভাগ মামলারই বিচারকাজে তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি, ক্ষতিপূরণও পাননি আহত-নিহতদের পরিবার।
শেষ হয়নি তাজরীনে অগ্নিকাণ্ডের বিচার: ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের তাজরীন ফ্যাশনস কারখানায় ভয়াবহ আগুনে ১১২ জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় আরও দুই শতাধিক শ্রমিক আহত হন। মামলা হলেও তার বিচারকাজ শেষ হয়নি আজও। ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটির এমডি দেলোয়ারসহ ১৩ জনকে অভিযুক্ত করে মৃত্যুর পেছনে অবহেলা ও হত্যাচেষ্টার দায়ে ঢাকার আদালতে চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ। এই মামলায় ১০৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ২০১৯ সালের আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ৮ জন সাক্ষ্য দিয়েছে আদালতে। মামলাটি এখন ঢাকা জেলার প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। এই মামলার সব আসামি জামিনে রয়েছে বলে আদালত সূত্রে জানা যায়।
ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আব্দুল মান্নান খান বলেন, ‘মামলার অভিযোগপত্রে অধিকাংশ সাক্ষীর বর্তমান ঠিকানা দেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমান ঠিকানায় অনেককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যেসব সাক্ষীর স্থায়ী ঠিকানা দেওয়া হয়েছে, তারা সঠিকভাবে আদালতের সমনও পাচ্ছেন না। তাদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরও পুলিশ তাদের গ্রেফতার করছে না।’
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতের নির্দেশনা চেয়ে আসক ও ব্লাস্টসহ চারটি মানবাধিকার সংগঠন হাইকোর্টে রিট করে। রিটের প্রেক্ষিতে ওই বছরের ১৩ ডিসেম্বর হাইকোর্ট নিহত ও আহতদের জন্য কেন যথেষ্ট ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রতি রুল জারি করে। একই সঙ্গে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করে তাজরীনে অবহেলা খতিয়ে দেখা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করতে বলা হয় সরকারকে। এরকম ঘটনা প্রতিরোধে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, সেটি নিরূপণ করে ছয় মাসের মধ্যে আদালতে একটি প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।
ব্লাস্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শারমিন আখতার বলেন, ‘রুল জারির পর এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো শুনানি হয়নি। এখন পর্যন্ত সরকারের সংশ্লিষ্টরা এ নিয়ে কোনো প্রতিবেদনও আদালতে দেয়নি বা ক্ষতিপূরণ দিতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা নিয়েও কোনো তথ্য হাইকোর্টে আসেনি।’
ট্যাম্পাকো ফয়েলস লিমিটেড : ২০১৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর টঙ্গীর ট্যাম্পাকো ফয়েলস লিমিটেডে অগ্নিকা-ের ঘটনায় ৩২ জন নিহত ও অর্ধশতাধিক আহত হন। এ ঘটনায় বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মকবুল হোসেনকে প্রধান আসামি করে ১০ জনকে আসামি করা হয়। এখন পর্যন্ত এই মামলায় অভিযোগপত্র দেয়নি পুলিশ। ঘটনার পর নিহত ও আহতসহ ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতে হাইকোর্টে রিট করা হয়। নিহত ও আহতদের কেন যথেষ্ট ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে চার সপ্তাহের রুল জারি করে।
আইনজীবী ব্যারিস্টার শারমিন আক্তার বলেন, রুল জারির পর এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো শুনানি হয়নি। শুনানির জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে।
কেটিএস টেক্সটাইল এবং গার্মেন্ট : ২০০৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের বিএসসিআইসি শিল্প এলাকায় কেটিএস টেক্সটাইল এবং গার্মেন্টে অগ্নিকাণ্ডে ৫৭ জন শ্রমিক নিহত হয়, আহত হয় শতাধিক। ওই ঘটনায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর দায়ে মামলা হলেও পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির মালিক পক্ষকে বাদ দিয়ে আদালতে চার্জশিট দেয় পুলিশ। এখন পর্যন্ত সেই মামলার বিচার শেষ হয়নি।
বিচার না পাওয়া আরও ঘটনা : ১৯৯০ সালের ১৭ ডিসেম্বর মিরপুরের সারেকা গার্মেন্টের অগ্নিকাণ্ডে ২৭ জন পুড়ে মারা যান। ১৯৯৫ সালে ঢাকার ইব্রাহিমপুরের লুসাকা অ্যাপারেলসে অগ্নিকা-ে ১০ জন কর্মী প্রাণ হারান। ১৯৯৬ সালে ঢাকার তাহিদুল ফ্যাশনে ১৪ জন এবং সিনটেক্স লিমিটেডের কারখানায় ১৪ জন পুড়ে মারা যান। ১৯৯৭ সালে মিরপুরের তামান্না গার্মেন্টে ২৭ জন এবং মিরপুর-১নং মাজার রোডের রহমান অ্যান্ড রহমান অ্যাপারেলসে আগুনে ২২ শ্রমিক মারা যান। ২০০০ সালের ২৫ নভেম্বর নরসিংদীর চৌধুরী নিটওয়্যার লিমিটেডে আগুনে ৫৩ শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটে। ২০০০ সালে বনানীর চেয়ারম্যান বাড়িতে গ্লোব নিটিং ফ্যাশন লিমিটেডে ১২ শ্রমিক অগ্নিকাণ্ডে মারা যায়। ২০০৫ সালে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে সান নিটিং গার্মেন্টে আগুনে ২০ শ্রমিক মারা যান। এসব ঘটনার বিচারকাজেও উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই বলে জানা গেছে।
বিচার নিশ্চিত করতে হবে: জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম খোলা কাগজকে বলেন, একের পর এক অগ্নিকাণ্ডে নিহতের ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মালিক পক্ষের অবহেলায় আটকে পড়া অসহায় শ্রমিকদের মৃত্যুর দায় কারখানার মালিক পক্ষ কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। এটি মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এসব ঘটনায় বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, রূপগঞ্জের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এ ভয়ানক অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ উদঘাটন করে জড়িতদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। কারখানায় নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে মালিক পক্ষ থেকে উপযুক্ত অর্থ সহায়তা প্রদান সুনিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরকে আহ্বান জানাচ্ছি।