শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:৩৬ অপরাহ্ন

অনলাইনে শিশুদের শিক্ষা: সুবিধা-অসুবিধা

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২০
  • ৩৯ জন নিউজটি পড়েছেন

ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ুয়া আমার দুই কন্যা সকাল আটটায় ঘুম থেকে উঠে ইউনিফর্ম পরে অনলাইনে স্কুল করতে বসে। একদিন হঠাৎ খেয়াল করলাম, বড় কন্যা মুঠোফোনের স্প্লিট স্ক্রিন সুবিধার মাধ্যমে অনলাইন ক্লাসেও থাকছে, আবার একই স্ক্রিনে নিচে বন্ধুদের সঙ্গে চ্যাটিং করে আড্ডায় মেতে আছে। অথচ শিক্ষক বুঝতেই পারছেন না তাঁর শিক্ষার্থীদের ক্লাসে মন নেই! ব্যাপারটা আমাকে খুব ভাবিয়ে তোলে। আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম, আমরা অভিভাবকেরাই জেনে–শুনে বিষ পান করাচ্ছি না তো কোমল এই শিশুদের? এ যেন কবিগুরুর গানের কথার বাস্তব ব্যাপার, ‘জেনে শুনে বিষ করেছি পান, প্রাণের আশা ছেড়ে সঁপেছি প্রাণ।’ যে শিশুদের নতুন বইয়ের ঘ্রাণে মেতে থাকার কথা, তাদের হাতে এখন আমরাই তুলে দিয়েছি মুঠোফোন, ল্যাপটপ ও কম্পিউটারের মতো ডিভাইস। এটা সময়েরও দাবি। কিন্তু সেই ডিভাইস শুধু ক্লাসের সময়ে সীমাবদ্ধ নয়। পড়া কালেক্ট করা, হোমওয়ার্ক সাবমিট, গ্রুপ স্টাডি—এসবের অজুহাতে সারাক্ষণই যেন ইলেকট্রনিকস ডিভাইসের সঙ্গে এরা নিজেকে জড়িয়ে ফেলছে। তারা যেন এক নতুন ভার্চ্যুয়াল জগতে ভেসে বেড়াচ্ছে।

বিশ্ব মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে ১৭ মার্চ থেকে বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। যেসব দুরন্ত ছেলেমেয়ে তার সহপাঠীদের সঙ্গে মিলেমিশে লেখাপড়া ও মাঠে খেলাধুলা করত, তারা এরপর থেকেই ঘরবন্দী। দীর্ঘদিন লকডাউনের ফলে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার অনেক ক্ষতি হচ্ছে। দিনের পর দিন তাদের সহপাঠী ও শিক্ষকদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থা সচল রাখার জন্য পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশে দেশের প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা চালু হয়েছে। বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জুম অ্যাপস, গুগল ক্লাসরুম, গুগল মিট, ওয়েবএক্স, ফেসবুক লাইভ, ইউটিউবের মতো বিভিন্ন সাইট ব্যবহার করে তাদের শিক্ষকদের সঙ্গে ক্লাস করছে। এ ছাড়া সংসদ টিভিও বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত ক্লাস প্রচার করে যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কজন শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাস করার সুযোগ পাচ্ছে? তারা কী শিখছে? তার কতটুকু গ্রহণ করছে? আর দীর্ঘ সময় অনলাইন ক্লাস তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলছে?

ভার্চ্যুয়াল ক্লাসের সুবিধা গ্রহণের প্রতিবন্ধকতা
বর্তমানে অনলাইন বা ভার্চ্যুয়াল ক্লাসের সুবিধা সবাই গ্রহণ করতে পারছে না। জরিপে দেখা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশের বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী ক্লাস করতে পারছে না। কারণ, অনেকেরই অনলাইন ক্লাস করার জন্য স্মার্টফোন, কম্পিউটার অথবা ল্যাপটপ নেই। গ্রাম, চর, হাওর অথবা দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভার্চ্যুয়াল শিক্ষা সম্পর্কে কোনো ধারণা ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। রাজধানী ছাড়া দেশের অন্যান্য জেলায় থ্রি–জি/ ফোর–জি নেটওয়ার্ক বা ব্রডব্যান্ড সুবিধা সহজে দেখা মেলে না । ফলে টু–জি দুর্বল নেটওয়ার্ক দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন ক্লাস করার সুবিধা সবাই পায় না। আবার অনেক শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক বলেছেন, বর্তমান মহামারি পরিস্থিতিতে যেখানে সংসার চালানো মুশকিল হচ্ছে, সেখানে ইন্টারনেটের খরচ বহন করা তাঁদের জন্য খুব কষ্টসাধ্য। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও দুর্বল নেটওয়ার্কের কারণে অনলাইনে ক্লাস করার সময় ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষকের লেকচার ঠিকমতো দেখতে ও শুনতে পায় না, ফলে তারা অনলাইনে ক্লাস করতে আগ্রহ হারাচ্ছে। তারা শুধু স্লাইড দেখে বা শুধু বই দেখে পড়ছে।

ভার্চ্যুয়াল ক্লাসের ইতিবাচক দিক
প্রথমেই আমি অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থাকে সাধুবাদ জানাই। কথায় আছে, নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো। একেবারে কিছু না শেখার চেয়ে যে কজন শিক্ষার্থী লেখাপড়ার সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারছে, তা–ই এখন আমাদের ভালো দিক হিসেবে ধরে নিতে হবে। অনেক শিক্ষক এখন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নানান প্রযুক্তি অবলম্বন করে ক্লাস নিচ্ছেন। যা শিক্ষার্থীদের বোধগম্য হচ্ছে ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের যোগাযোগ রক্ষা হচ্ছে। অনলাইন ক্লাসের ফলে ছাত্রছাত্রীদের গৃহবন্দী একঘেয়ে জীবনে বৈচিত্র্য আসছে। ছাত্রছাত্রীদের বইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ থাকছে, যা তাদের জীবনে খুব প্রয়োজন। অনলাইন ক্লাস করার জন্য ছাত্রছাত্রীরা ঠিক সময়ে ঘুম থেকে উঠছে এবং নিয়মানুবর্তিতায় দিন কাটাচ্ছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসে ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা
কয়েকজন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে কিছু মজার মজার বিষয় জানতে পেরেছি। টানা ৫–৬ ঘণ্টা ক্লাস করার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একঘেয়ে মনোভাবের সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে সব সুবিধা থাকার পরেও তারা ক্লাস করতে অনীহা প্রকাশ করছে। তারা প্রায় সময়ই সুযোগ পেলেই দুয়েকটা ক্লাস মিস দিয়ে দিচ্ছে। ক্লাসের ফাঁকে শ্রেণিকক্ষে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার জন্য ছোটবেলা আমরা যেমন অস্থির হতাম, ঠিক তেমনি শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকের অগোচরে বন্ধুদের সঙ্গে বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে চ্যাটিং করে। ফলে তাদের শিক্ষকদের লেকচার পুরোপুরি বোধগম্য হয় না। কেউ কেউ স্প্লিট স্ক্রিন সুবিধা গ্রহণ করে একই সঙ্গে ক্লাসে থাকছে এবং এর পাশাপাশি অন্য অ্যাপস ব্যবহার করে বন্ধুদের সঙ্গে ক্লাস চলাকালে যোগাযোগ রাখছে, কিন্তু তা তাদের শিক্ষকেরা বুঝতেই পারছেন না। অনেকেই বাড়ির কাজ বা শ্রেণি পরীক্ষায় প্রশ্নের উত্তর বন্ধুদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে উত্তর দিয়ে দেয়। সম্পূর্ণ প্রশ্ন না পড়ে একেক বন্ধু একেকটার উত্তর পড়ে এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে উত্তর পাঠিয়ে দেয়। মানে, তারা সবাই ১০০ তে ১০০ নম্বর পায়।

ভার্চ্যুয়াল ক্লাসের অসুবিধা
অনলাইনে ক্লাস করতে শিক্ষার্থীদের অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবে অনেক শিক্ষক ক্যামেরা–ভীতিতে ভুগছেন। তাঁরা সুন্দর, সাবলীল, বোধগম্য ও আকর্ষণীয় লেকচার দিতে পারছেন না। ফলে শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাসের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ছে। অনলাইনে ক্লাস করে শিক্ষার্থীরা তাদের সব পড়া সঠিকভাবে বুঝতে পারছে না, আর না বুঝলে শিক্ষকদের কাছে আবার প্রশ্ন করে বুঝে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। তাই অনেক বিষয়ে পড়াশোনায় ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থী কী শিখছে, তা পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন সঠিকভাবে হচ্ছে না। তাই পড়াশোনার প্রতি গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। অনলাইন ক্লাস করার জন্য বিভিন্ন ডিভাইসের স্ক্রিনের সামনে দীর্ঘ সময় বসে থাকায় ছাত্রছাত্রীদের চোখে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। আবার কারও কারও মাথাব্যথা অনুভূতি হচ্ছে। দীর্ঘ সময় চেয়ারে বসে ক্লাস করায় অনেক শিক্ষার্থীর ঘাড়ে ও পিঠের মেরুদণ্ডে ব্যথা হচ্ছে। যা দীর্ঘ সময় চলতে থাকলে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। ছোট ছোট শিশুরা অনলাইন ক্লাসের কারণে সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হচ্ছে, যা তাদের বয়সের সঙ্গে খাপ খায় না। সময়ের আগে কোনো কিছুই ভালো না জেনেও আমরাই আজ তাদের ফেসবুক, ইউটিউব চালানোর সুযোগ করে দিচ্ছি, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতির কারণ হবে।

ভার্চ্যুয়াল ক্লাসের ব্যাপারে করণীয় কী?
পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত দেশের মতো বাংলাদেশ সরকারকে শিক্ষা খাতে নজর দিতে হবে। ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের বিনা মূল্যে ল্যাপটপ, কম্পিউটার বা স্মার্টফোন দিয়ে অনলাইন ক্লাসের জন্য সবার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।

সব ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকের জন্য বিনা মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট–সুবিধা দিতে হবে। বাংলাদেশের সব জেলায় ফোর–জি ইন্টারনেট অথবা ব্রডব্যান্ড–সুবিধা দিতে হবে। শিক্ষকদের অনলাইন ক্লাসের কোর্সের আওতায় আনতে হবে। যেন তাঁরা নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে পারেন। শিক্ষার্থীরা যেন অতিরিক্ত অনলাইন আসক্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের প্রাণের প্রিয় সন্তানদের জেনে–শুনেই আমরা এই বিষ হাতে তুলে দিলেও এর মাত্রা যেন অধিক না হয়, সেই চেষ্টাই আমাদের করতে হবে। শিক্ষার্থীদের যতটুকু সম্ভব ডিভাইসের স্ক্রিন থেকে দূরে বসাতে হবে।

আসলে পৃথিবীর এই পরিস্থিতিতে আমাদের অনেক কিছুই নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে করতে হচ্ছে। আমাদের কোমলপ্রাণ শিক্ষার্থীরাও এর ব্যতিক্রম নয়। তাদের এই সময়ে অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে আনন্দের সঙ্গে পড়াশোনা করার সুযোগ করে দিতে হবে। সবাইকে মনে একটা কথাই গেঁথে নিতে হবে, আমরা বন্দী নই। জীবনকে নতুন করে গড়ার এটাই সুযোগ। সময়টাকে কাজে লাগাতে পারলেই আমরা নতুন করে গড়ে নিতে পারব আমাদের পাল্টে যাওয়া পৃথিবীকে।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English