করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে সুদের হারে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। ১১ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে বেশি পতন ঘটেছে বিশ্ব মুদ্রাবাজারে। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একক মুদ্রা ইউরোর সুদের হার কমে নেগেটিভ বা ঋণাত্মক পর্যায়ে চলে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অপর দুই শক্তিশালী মুদ্রা আমেরিকান ডলার ও ব্রিটিশ পাউন্ডের দামও কমছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ এর সুবিধা পেলেও দেশের বাজারে এর তেমন কোনো সুবিধা মিলছে না। ব্যাংকগুলোর দুর্বলতার কারণেই মূলত সুদের হার কমার সুবিধা পাচ্ছেন না দেশের উদ্যোক্তারা।
অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার কমার সুবিধা পেতে হলে ব্যাংকগুলোকে আরও সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। বাড়াতে হবে আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারের বিষয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যাংকার। কম সুদে বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে সেগুলো দেশের উদ্যোক্তাদের মধ্যে দ্রুত বিতরণ করতে হবে। তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার কমার সুবিধা পাবে দেশের অর্থনীতি।
করোনার প্রভাবে দেশের বাজারেও টাকার চাহিদা কমায় কলমানি মার্কেটে (একদিনের জন্য এক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য ব্যাংকের বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ধার) সুদের হার কমেছে। তবে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এখনও বেশি আছে। তবে আমদানি কম হওয়ায় ডলারের দাম কমেছে। এর ফলে আমদানি ব্যয়ও কমেছে।
সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে বা বিভিন্ন দেশে বৈদেশিক মুদ্রার সুদের হার নির্ধারিত হয় লন্ডন আন্তঃব্যাংক অফার রেট (লাইবর) অনুযায়ী। বিভিন্ন মুদ্রার বিভিন্ন মেয়াদি সঞ্চয়ী উপকরণ রয়েছে লন্ডন মুদ্রাবাজারে। এর মধ্যে ছয় মাস মেয়াদি মুদ্রার সুদের হারের ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশে বৈদেশিক মুদ্রার সুদের হার নির্ধারিত হয়। ওই হারের সঙ্গে অনেক দেশ বাড়তি কিছু সুদ যোগ করে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ছয় মাস মেয়াদি বন্ডের লাইবর রেটের সঙ্গে ১ বা ২ শতাংশ যোগ করে ডলার বা ইউরোর সুদের হার নির্ধারণ করে।
সম্প্রতি করোনার প্রভাব মোকাবেলায় রফতানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আকার বাড়ানো ও সুদের হার কমানো হয়েছে। আগে সুদের হার নির্ধারিত হতো ছয় মাস মেয়াদি ডলার বন্ডের লাইবর রেটের সঙ্গে ১ শতাংশ যোগ করে। আগে লাইবর রেট ছিল আড়াই শতাংশ। এর সঙ্গে ১ শতাংশ যোগ করে সুদের হার হতো সাড়ে ৩ শতাংশ।
বর্তমানে ৬ মাস মেয়াদি ডলার লন্ডন আন্তঃব্যাংক অফার রেট কমে শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশে নেমে এসেছে। এক মাস আগে এই হার ছিল শূন্য দশমিক ৪৬ শতাংশ। এক বছর আগে ছিল ২ দশমিক ২৬ শতাংশ থেকে আড়াই শতাংশ। ২০০৯ সালের ২ জানুয়ারি সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৮৭ শতাংশে উঠেছিল।
বর্তমানে ডলারের লাইবর রেট কমে যাওয়ায় ইডিএফের সুদের হারও কমানো হয়েছে। বর্তমানে এ হার ২ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে ইডিএফের সুদের হার ২ শতাংশ বেঁধে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এর হার বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে তহবিলের সুদের হার আরও কম হতো। লাইবর রেট শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ। এর সঙ্গে ১ শতাংশ যোগ করে ১ দশমিক ৩৬ শতাংশ সুদে উদ্যোক্তারা এ তহবিল থেকে ঋণ নিতে পারতেন। এতে রফতানি পণ্য উৎপাদনের খরচ কমত এবং বিদেশে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সক্ষমতা আরও বাড়ত। পরিবেশবান্ধব শিল্পে ঋণ দিতে ২০ কোটি ডলারের একটি তহবিল রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকে। এ তহবিলের সুদের হার আগের মতো বর্তমানে নির্ধারিত হয় লাইবর রেটের সঙ্গে ১ শতাংশ যোগ করে। অর্থাৎ আগে লাইবর রেট ছিল আড়াই শতাংশ। এর সঙ্গে ১ শতাংশ যোগ করে সুদের হার হতো সাড়ে ৩ শতাংশ। বর্তমানে লাইবর রেট শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ হওয়ায় এর সুদের হার দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ২৬ শতাংশ। ফলে সুদের হার এখানে বাজারভিত্তিক হওয়ায় উদ্যোক্তারা কম সুদে ঋণ পাচ্ছেন। এ তহবিল থেকে মাত্র ৭ কোটি ডলারের ঋণ দেয়া হয়েছে।
গ
ইউরোর লাইবর রেট বর্তমানে নেগেটিভ বা মাইনাস শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ। গত বছরের ২ জানুয়ারি ছিল শূন্য দশমিক ১৪ শতাংশ। ২০০৯ সালের ২ জানুয়ারি ছিল ২ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
পরিবেশবান্ধব শিল্পে ঋণ দিতে ২০ কোটি টাকা ইউরোর একটি তহবিল রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকে। এ তহবিল থেকে ইউরোর লাইবর রেটের সঙ্গে ১ শতাংশ যোগ করে ঋণ দেয়া হয়। বর্তমানে ইউরোর লাইবর রেট নেগেটিভ শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ হওয়ায় এ তহবিল থেকে এখন ১ শতাংশ সুদে ব্যাংকগুলো ঋণ পাচ্ছে। ১৫ এপ্রিল এ তহবিল গঠন করা হলেও এখনও কোনো ব্যাংক এই ঋণ ছাড় করেনি। ফলে সুদের হার কমার সুবিধাও উদ্যোক্তারা নিতে পারছেন না।
পাউন্ড লাইবর রেট শূন্য দশমিক ২২ শতাংশ। গত ৩ ফেব্রুয়ারি ছিল শূন্য দশমিক ৮২ শতাংশ। গত বছরের ২ জানুয়ারি ছিল ১ দশমিক ০৩ শতাংশ। ২০০৯ সালের ২ জানুয়ারি ছিল ২ দশমিক ৯০ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকে পাউন্ডে কোনো তহবিল নেই বলে এ সুবিধা ব্যাংকগুলো থেকে উদ্যোক্তারা পাচ্ছেন না।
করোনার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থবিরতা চলছে। ফলে মুদ্রার চাহিদা কমে গেছে। এর ফলে পণ্যের দাম যেমন কমেছে, তেমনি কমেছে মুদ্রার সুদের হার। ফলে আমদানি পণ্যের খরচও কমেছে। বাংলাদেশ এই সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু সুদের হার কমায় বৈদেশিক ঋণের খরচ এখন কমেছে। কিন্তু বিদেশ থেকে ব্যাংকগুলো ঋণ নিতে পারছে না। ফলে কম সুদের বিষয়টি ব্যবহার করতে পারছে না।