বেড়েই চলেছে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ। এমন পরিস্থিতিতে সরকার প্রচলিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন দ্রুত সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। সংশোধিত ঐ আইনে ধর্ষণের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়া ব্যক্তির জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হচ্ছে। বর্তমান আইনে এ অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি রয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। বিশেষ ঐ আইনে শাস্তি বাড়ানো সরকারের এই উদ্যোগকে বিভিন্ন মহল সাধুবাদ জানাচ্ছেন। কিন্তু তারা বলছেন, একমাত্র সাজা বৃদ্ধি করে কোনো ফল পাওয়া যাবে না। সাজা বৃদ্ধির পাশাপাশি দরকার আইনের কার্যকর প্রয়োগ।
এ প্রসঙ্গে নবনিযুক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, আইনে ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান যুক্ত করতে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে তাতে সাধুবাদ জানাই। এ ধরনের অপরাধীদের যদি কঠোর শাস্তির আওতায় আনা যায় তাহলে অপরাধ কমবে।
এদিকে ধর্ষণ ও ধর্ষণ শেষে হত্যার মতো অপরাধ কমাতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কার্যকর প্রয়োগের লক্ষ্যে উচ্চ আদালতের ঘোষিত ছয় দফা নির্দেশনাও উপেক্ষিত। ‘মো. রাহেল ওরফে রায়হান বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের দ্বৈত বেঞ্চের দেওয়া রায়ের নির্দেশনায় ধর্ষণ মামলার বিচার আইনে বেধে দেওয়া ১৮০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন, মুলতুবি ছাড়া মামলার শুনানি গ্রহণ, ধার্য তারিখে সাক্ষীর উপস্থিতি ও তার নিরাপত্তা নিশ্চিতে মনিটরিং কমিটি গঠন, সাক্ষী হাজিরে ব্যর্থ হলে মনিটরিং কমিটিকে জবাবদিহি করা, সমন পাওয়ার পর অফিসিয়াল সাক্ষী (ম্যাজিস্ট্রেট/পুলিশ/ডাক্তার ও অন্য বিশেষজ্ঞগণ) সন্তোষজনক কারণ ব্যতিরেকে সাক্ষ্য প্রদানে হাজির না হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বেতন বন্ধের আদেশ দিতে ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের বলা হয়। রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছে, আমাদের অভিজ্ঞতা হলো যে, ধর্ষণ মামলার আসামিগণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেপরোয়া ও দুর্দান্ত প্রকৃতির। এরা ভিকটিম ও তার পরিবারের ওপর চাপ-প্রভাব বিস্তার করে আদালতে সাক্ষ্য প্রদানে ভয়-ভীতি, প্রলোভনসহ বিভিন্ন ধরনের কূটকৌশল অবলম্বন করেন। ক্ষেত্র বিশেষে সালিশের নামে সামাজিক বিচার করে ভিকটিম ও তার পরিবারকে মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য এবং আদালতে সাক্ষ্য প্রদানে বিরত থাকার জন্য চাপ প্রদান করে থাকে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে অবিলম্বে সাক্ষী সুরক্ষা আইন দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরকার প্রণয়ন করবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।
এদিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৩১(ক) ধারায় বলা হয়েছে, মামলা প্রাপ্তির তারিখ হতে ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি না হলে ট্রাইব্যুনালকে (বিচারক) তার কারণ লিপিবদ্ধ করে একটি প্রতিবেদন এক মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের নিকট দাখিল করতে হবে। অনুরূপ ক্ষেত্রে পাবলিক প্রসিকিউটর ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকেও এর কারণ লিপিবদ্ধ করে একটি প্রতিবেদন ঐ সময়ের মধ্যে সরকারের নিকট প্রেরণ করতে হবে। বিচারক, পিপি ও তদন্ত কর্মকর্তার ঐ প্রতিবেদনসমূহ পর্যালোচনার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার জন্য দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে সরকার ও সুপ্রিম কোর্ট যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। আইনের এই বিধান কার্যকরের জন্য একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করতে ‘মিলাদ হোসেন বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় রায় দেয় হাইকোর্ট। কিন্তু আজ অবধি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ধর্ষণ মামলার বিচার শেষ না হওয়ার জন্য যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। রায়ের এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে যেন অনেকটাই অনীহা ট্রাইব্যুনালের বিচারক, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি), তদন্ত কর্মকর্তাদের।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, শুধু আইন পরিবর্তন করে অপরাধ দমন করা যায় না। যে আইনটি আছে সেটার খুব কার্যকর প্রয়োগ করা দরকার। যতগুলো ধর্ষণের বিচার হয়েছে, সেখানে সাজার হার মাত্র তিন ভাগ। কিন্তু হারটা যদি ৯৭ ভাগ হত তাহলে ধর্ষণের ঘটনা ঘটত না।