বকশিরহাট পেরিয়ে খাতুনগঞ্জে ঢোকার মুখেই কোলাহল কানে এল। সড়কে সারি সারি ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান আর ঠেলাগাড়ি। কোনো গাড়ি থেকে পণ্যভর্তি বস্তা নামিয়ে দোকানে রাখছেন শ্রমিকেরা। বস্তা মাথায় নিয়ে আরেক গাড়িতে তুলছেন কেউ কেউ। মাস দুয়েক আগের চেয়ে গাড়ির জট বেড়েছে। আর মানুষের ভিড়ও কিছুটা চোখে পড়ার মতো। পণ্যবাহী গাড়ি আর কিছুটা ভিড় ঠেলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে ভোগ্যপণ্যের বড় এই পাইকারি বাজারের আসল চিত্র পাওয়া গেল।
খাতুনগঞ্জের আর এম এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার শাহেদ উল আলম জানালেন, করোনার প্রভাবে এপ্রিল–জুনে বেচাকেনা ৪০ শতাংশে নেমে এসেছিল। এখন তা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ের মতো বেচাকেনা না হলেও ক্রেতা–বিক্রেতাদের আস্থা ফিরে আসতে শুরু করেছে।
শাহেদ উল আলমের কথার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া গেল পাইকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে গিয়ে। করোনার ঝুঁকি কমাতে দোকানের সামনে সাঁটানো কাগজে লেখা ‘ভেতরে প্রবেশ নিষেধ’। তারপরও প্রতিষ্ঠানের ভেতরে মাথা ঝুঁকে ক্রেতা–বিক্রেতাদের দরদাম চলছে। চেয়ার–টেবিল দূরত্বে চলছে ক্রেতা–বিক্রেতার দর কষাকষি। সব মিলিয়ে বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে।এক–দুই মাস আগেও অনেক ব্যবসায়ী বাসায় বসে টেলিফোনে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের দিকনির্দেশনা দিতেন। ধীরে ধীরে সেসব ব্যবসায়ী আসতে শুরু করেছেন বাজারে। বেচাকেনা সামাল দিতে এখন যেন আর ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই।
করোনার ঝুঁকি কমাতে দোকানের সামনে সাঁটানো কাগজে লেখা ‘ভেতরে প্রবেশ নিষেধ’। তারপরও প্রতিষ্ঠানের ভেতরে মাথা ঝুঁকে ক্রেতা–বিক্রেতাদের দরদাম চলছে। চেয়ার–টেবিল দূরত্বে চলছে ক্রেতা–বিক্রেতার দর কষাকষি। সব মিলিয়ে বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শতবর্ষের বেশি পুরোনো খাতুনগঞ্জ সর্ম্পকে কয়েকটি তথ্য জেনে নেওয়া যাক। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা ভোগ্যপণ্যের প্রায় ৪০ শতাংশ খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বেচাকেনা হয়। এখানকার প্রায় দেড় হাজার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব পণ্য সারা দেশে যায়। ভোজ্যতেল, চিনি, গম, ডাল, মসলা ও কাঁচা পণ্য থেকে শুরু করে রাসায়নিক, ঢেউটিন, রংসহ নানা ধরনের পণ্য বেচাকেনা হয়। আমদানি করা চালও বিক্রি হয় এ বাজারে। তবে চালের মূল আড়ত খাতুনগঞ্জের পাশে চাক্তাই বাণিজ্যকেন্দ্রে। খাতুনগঞ্জ ও আশপাশের বাণিজ্যকেন্দ্র মিলিয়ে পাঁচ হাজারের মতো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।
গত মার্চে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সাধারণ ছুটি ঘোষণার আগে খুচরা বাজারে ক্রেতাদের চাপে পাইকারি বাজারেও বাড়তি চাপ এসে পড়েছিল। এপ্রিলে ধীরে ধীরে খাতুনগঞ্জে ক্রেতা–বিক্রেতারে সংখ্যা কমে আসে। সাধারণ ছুটির সময় বাজারে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাই দোকান খুলে বসতেন। আর ব্যবসায়ীরা বাসায় বসে টেলিফোনে ব্যবসা পরিচালনা করতেন।
এখন বাজারে যে বেচাকেনা বেড়েছে, তা মূলত ঈদের ছুটির পর। ব্যবসায়ীরা জানালেন, তিন সপ্তাহ ধরে বেচাকেনা বেড়েছে। হোটেল–রেঁস্তোরা খুলেছে। তাতে পণ্যের চাহিদা কিছুটা বেড়েছে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে পাম তেল, সয়াবিন তেল, গম ও চিনির দাম বাড়ছে। এর প্রভাব দেশেও পড়েছে। দাম বাড়ার অর্থই হলো বেচাকেনার কোনো না কোনো স্তরে লাভের মুখ দেখা। পড়তি বাজার উঠতির দিকে থাকায় পাইকারি বাজারে যাঁরা বেচাকেনা করেন, তাঁরা সরব হয়ে উঠছেন।
খাতুনগঞ্জের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, এপ্রিলে পাইকারি বাজারে যে পাম তেল কেজিপ্রতি প্রায় ৫৯ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এখন তা ৭১ টাকায় উঠেছে। সয়াবিন তেলও কেজিপ্রতি ৫ টাকা বেড়ে ৮৬ টাকায় উঠেছে। চিনির দামও কেজিপ্রতি দেড় টাকা বেড়েছে। দাম বাড়ার উত্তাপ আছে কাঁচা পণ্যেও। আড়তে পেঁয়াজ ও আদার দাম বাড়তি। রসুনের দামও বাড়তির দিকে। খাতুনগঞ্জের মেসার্স বাছা মিঞা সওদাগরের কর্ণধার মোহাম্মদ ইদ্রিস জানান, এপ্রিল–মে মাসের তুলনায় বেচাকেনা ভালোর দিকে। তবে এখনো তা স্বাভাবিক সময়ের অবস্থায় ফেরেনি।
খাতুনগঞ্জে সবচেয়ে বেশি পণ্য বিক্রি করে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। এস আলম, টি কে গ্রুপ, বিএসএম গ্রুপসহ বহু আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানই আছে এ তালিকায়। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে পণ্য কিনে নেন বড় পাইকারি ব্যবসায়ীরা। কেনার পর চট্টগ্রামের বিভিন্ন গুদাম থেকে ট্রাকে করে খাতুনগঞ্জে নিয়ে আসেন। অপ্রস্তুত পণ্য মাড়াইয়ের জন্য নেওয়া হয় প্রক্রিয়াজাত কারখানায়। কারখানা ঘুরে বাজারজাত হয় খাতুনগঞ্জে।
পড়তির দিকে থাকা অনেক পণ্যের দাম বেড়েছে। বেড়েছে বেচাকেনাও। ক্রেতা–বিক্রেতার উপস্থিতিও বেড়েছে।
ব্যবসা–বাণিজ্যের অবস্থা জানতে পাইকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে সর্বশেষ গন্তব্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বিএসএম গ্রুপের কার্যালয়। বিএসএম সেন্টারে নিজ কার্যালয়ে বসে গ্রুপটির চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী জানালেন, করোনার কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। চাহিদাও কম। এরপরও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এখন ৬০–৭০ শতাংশ বেচাকেনা হচ্ছে। আবার আমদানি পণ্যেরও সংকট নেই। কিছুটা বাড়লেও বিশ্ববাজারে অস্থিরতা নেই। বাজারের জন্য এটাই ইতিবাচক খবর।