শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:৩০ পূর্বাহ্ন

আতঙ্কমুক্ত থাকার উপায়

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২০
  • ৩৭ জন নিউজটি পড়েছেন

আতঙ্ক একটি নীরব ঘাতক। আতঙ্ক একটি মানসিক দুরাবস্থা হলেও এটি আপনাকে শারীরিক দিক থেকেও মারাত্মক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। আতঙ্কজনক অবস্থা আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার দুর্গে আঘাত করে তা তছনছ করে দেয়, ফলে কোভিড-১৯ বা অন্য কোনো রোগ-বিমার-বিপদ-দুর্যোগ আপনাকে সহজেই কাবু করে ফেলতে পারে। এ কারণেই কোভিড-১৯ দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি আতঙ্ককে দূরে ঠেলে দিয়ে মানসিক শক্তি দৃঢ় রাখতে পরামর্শ দিচ্ছে।
মজার বিষয় হলো, পবিত্র কুরআন ও নবীজীর শিক্ষা আমাদের ১৫০০ বছর পূর্বেই এই নির্দেশনা দিয়ে রেখেছে। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ থেকে আমরা যে শিক্ষা পাই তার আলোকে নিম্নোক্ত পাঁচটি উপায় অবলম্বনে চরম বিপদ-আপদ কিংবা মন্দ অবস্থায়ও আপনি পর্বতের মতো মানসিক দৃঢ়তা ধরে রাখতে এবং আতঙ্ককে দূরে ঠেলে দিতে সক্ষম হবেন, ইনশাআল্লাহ :
০১. দৃঢ় বিশ্বাস : মহান আল্লাহর অস্তিত্ব, একত্ব, প্রভুত্ব, ক্ষমতা ও গুণাবলির ওপর নিশ্চিত বিশ্বাস রাখুন। তিনি এক ও একক সত্তা। তিনি চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী। নিদ্রা-তন্দ্রা-অলসতা তাঁকে স্পর্শ করে না। আসমান-জমিনে যা আছে সবই তাঁর সৃষ্টি। আমরা কী করছি, কী অবস্থায় আছি আমাদের মনিব-অভিভাবক সবই দেখছেন, শুনছেন, অবগত রয়েছেন। তিনি তাঁর দয়া ও জ্ঞানে সব কিছু পরিবেষ্টন করে আছেন। সব কিছুর পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ তিনিই করেন। তিনি ভুল করেন না, ভুলেও যান না। সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ তাঁরই হাতে। তিনি তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে বেখবর নন। তিনি যেমন পরীক্ষাস্বরূপ অথবা শাস্তিস্বরূপ বিপদ-মুসিবত দেন তেমনি তিনি ছাড়া তা দূর করারও কেউ নেই। কিসে বান্দার চূড়ান্ত কল্যাণ এটি কেবল তিনিই জানেন। তিনি মহাপ্রতাবশালী ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। আকাশ ও পৃথিবীতে এমন কোনো শক্তি নেই যা তাঁকে পরাজিত বা অক্ষম করে দিতে পারে…। আল্লাহর ওপর নিশ্চিত বিশ্বাস একজন মুমিনের মনোবলের আধার, ভরসারস্থল। একজন নিশ্চিত বিশ্বাসী কখনো আতঙ্কিত ও ভীত হতে পারে না।
০২. তদবির (প্রস্তুতি ও প্রচেষ্টা) : যেকোনো বিপদে-দুর্যোগে সাধ্য অনুযায়ী প্রস্তুতি নিন, সঠিক উপায়-উপকরণ ব্যবহার করুন এবং সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য চূড়ান্ত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখুন। আল্লাহ আরো বলেন, ‘মানুষের জন্য তার চেষ্টা-প্রচেষ্টার বাইরে কিছুই (করার) নেই।’ (সূরা নাজম : ৩৯) করোনা দুর্যোগের ক্ষেত্রে চেষ্টা-প্রচেষ্টা হলো, সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে সতর্কতা অবলম্বন করা। আল্লাহর নির্দেশ হলো, ‘ওহে যারা ঈমান এনেছো! তোমরা সতর্কতা অবলম্বন করো।’ (সূরা নিসা, আয়াত : ৭১) নবীজী সা: বলেছেন, ‘তোমরা ওষুধ ব্যবহার করো।’ তিনি আরো বলেন, ‘আল্লাহ এমন কোনো রোগ অবতীর্ণ করেননি যার শেফা/প্রতিষেধক তিনি অবতীর্ণ করেননি’। (বুখারি, হাদিস নং- ৫৩৫৪)
০৩. আল্লাহর ওপর ভরসা : আপনি যখন আপনার সর্বাত্মক প্রস্তুতি ও প্রচেষ্টা তথা উপায়-উপকরণ অবলম্বন করলেন তখন আপনার অবস্থাকে আল্লাহর ওপর সঁপে দিন। যেমন সঁপে দিয়েছিলেন হজরত ইয়াকুব আ:। তিনি প্রাণপ্রিয় সন্তানকে হারানোর আতঙ্ক আল্লাহর নিকট সঁপে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি আমার দুঃখ-অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তার বিষয় কেবল আল্লাহর নিকট ব্যক্ত করছি।’ (সূরা ইউসুফ : ৮৬) ভরসা করুন তাঁরই ওপর। তাঁর চেয়ে করুণাময়, দয়ালু, ক্ষমতাশালী তো আর কেউ নেই। বিশ্বাস রাখুন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর কাজ পূর্ণ করেন। অবশ্যই আল্লাহ সব কিছুর জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন।’ (সূরা তালাক : ৩) আল্লাহ তায়ালা আপনাকে নির্দেশ দিচ্ছেন, ‘আল্লাহর ওপর ভরসা করো, আর অভিভাবক হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।’ (সূরা নিসা : ৮১) সুতরাং ‘আমাদের কী হয়েছে যে আমরা আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করব না অথচ তিনিই আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন।’ (সূরা ইবরাহিম : ২২) নবীজী সা: নির্দেশনা দিয়েছেন, ‘তোমরা (প্রথমে) রশি বাঁধ তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে ও রাতের আঁধারে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চেয়ে তাঁর রহমত ভিক্ষা করা বা দোয়া করাও আল্লাহর ওপর ভরসা করার অংশ।
০৪. তাকদির (নির্ধারণ) : আপনি আল্লাহর ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রেখেছেন, প্রস্তুতি-প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, তাওয়াক্কুলও করেছেন এখন আপনার পক্ষ থেকে আর তেমন কিছুই করার নেই। এখন আল্লাহ আপনার জন্য যা যতটুকু নির্ধারণ করছেন বা করবেন সেটা তাঁর অধিকারে। আপনি তাঁর নিকট উত্তম ফয়সালার আশা রাখুন; হতাশ হবেন না। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-হতাশা কোনোটাই একজন মুমিনের কাজ নয়। তাকদিরের ওপর ঈমান তো আমাদের ঈমানের অংশ। আল্লাহ তাকদিরে যা নির্ধারণ করেছেন এর বাইরে কিছুই ঘটবে না। আল্লাহ বলেন, ‘বলো, আমাদের জন্য আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন তা ছাড়া আমাদের কিছুই স্পর্শ করবে না। তিনিই আমাদের অভিভাবক। আর উত্তম অভিভাবক হিসেবে তিনি তাঁর বান্দার জন্য যা নির্ধারণ করেন তা আপাত দৃষ্টিতে যা-ই মনে হোক চূড়ান্তভাবে তাই তার জন্য কল্যাণকর। হতে পারে এমন কিছুকে তোমরা অপছন্দ করছ অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং হতে পারে এমন কিছুকে তোমরা পছন্দে করছ অথচ এটি তোমাদের জন্য অনিষ্টকর।’ (সূরা বাকারা : ২১৬) সুতরাং ‘বিশ্বাসীদের আল্লাহর ওপরই ভরসা করা উচিত।’ (সূরা তাওবা, আয়াত : ৫১)
০৫. তাসলিম (সর্বান্তকরণে মেনে নেয়া) : আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন বা করবেন তা বিনাদ্বিধায় সর্বান্তকরণে ও সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিতে হবে। একজন ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য হলো, সে আল্লাহর ফায়সালা নিঃসঙ্কোচে মেনে নেবে। (সূরা নিসা : ৬৫) এবং তাঁর ওপর (সর্বাবস্থায়) সন্তুষ্ট থাকবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে, তারাই সর্বোত্তম সৃষ্টি। তাদের প্রতিপালকের নিকট রয়েছে তাদের প্রতিদানÑ স্থায়ী জান্নাতসমূহ… আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে …।’ (সূরা বায়িনাহ : ৭-৮)
একজন মুমিন বিশ্বাস করে যে, দুনিয়ার জীবনই শেষ নয়, আখিরাতের সফলতাই চূড়ান্ত সফলতা। তাই সে আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের আমি পরীক্ষা করব, ভয় এবং ক্ষুধা দিয়ে, ধন-সম্পদের ক্ষতি দিয়ে, জীবনহানি আর ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে। আর শুভ সংবাদ দাও তাদেরকে যারা ধৈর্যশীল, যারা বিপদে পড়লে বলে, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন (আমরা তাঁর কাছ থেকে এসেছি আবার তাঁর কাছেই আমরা ফিরে যাবো)। (সূরা বাকারা : ১৫৬)
আতঙ্ক, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কোনো মুমিনের জন্য শোভনীয় নয়। মুমিন তো আল্লাহর কাছে তার জান-মাল পূর্বেই বিক্রি করে দিয়েছে। ‘নিশ্চয় আল্লাহ মুমিন ব্যক্তির জান-মালকে কিনে নিয়েছেন, জান্নাতের বিনিময়ে…।’ সুতরাং তাঁর ফায়সালার ওপর সন্তুষ্ট থেকে প্রশান্ত মনে থাকাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English