রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০৪:৫১ পূর্বাহ্ন

আত্মসমালোচনা

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২০
  • ৪৫ জন নিউজটি পড়েছেন

আমরা মানুষ, আমাদের মূল বৈশিষ্ট্য হলো ভুলে যাওয়া, ভুল করা। আমরা প্রতিনিয়ত ভুলের সমুদ্রে সাঁতার কাটি, তীর খুঁজতে গিয়ে সাঁতার কাটতে কাটতে ক্লান্ত হই। অদ্ভুত ব্যাপার হলোÑ আমরা আমাদের ভুলটা দেখার চেয়ে অন্যেরটা ভালো করে দেখি, অথচ নিজেরাই ভুলের শিকলে হই বন্দী।
কথা হলো, আমি নিজেকে নিজে কী করে শুধরাব? এ প্রশ্নটা কমবেশি আমাদের সবার মাথায় কোনো না কোনো সময় আসে! আদৌ কি আমরা তার সঠিক উত্তর খুঁজে পাই? একটা পদ্ধতির মাধ্যমে কিছুটা হলেও নিজেকে নিজে চেনা যায়, আবিষ্কার করা যায় আমার এক আমিকে, আর তা হলোÑ ‘আত্মসমালোচনা’।
আগে জানতে হবে এই আত্মসমালোচনাটা কী? আত্মসমালোচনার আভিধানিক অর্থ ‘নিজের সম্পর্কে সমালোচনা করা, নিজের কাজ সম্পর্কে আলোচনা করা। একে আরবিতে বলা হয়, নিজ আত্মার হিসাব গ্রহণ করা। ইংরেজিতে একে বলা হয়, সেলফ ক্রিটিসিজম বা সেলফ অ্যাকাউন্টিবিলিটি অর্থাৎ আত্মসমালোচনা। বলা যায় ‘আমরা নিজেদের কার্যাবলি নিয়ে নিজেরা আলোচনা করা।’
আমার কোনটা ভালো কাজ যা আমি অব্যাহত রাখব, আর কোন কাজটি আমার মন্দ, যা থেকে আমি বিরত থাকব, সে সব বিষয় নিয়ে ভাবা। নিজের কাছে নিজের জবাবদিহিতা চাওয়া।
এই ‘আত্মসমালোচনা’ করার বৈশিষ্ট্যটি আমাদের অনেকখানি পরিবর্তন, পরিবর্ধন করতে পারে। একজন মানুষ নিজে নিজের সম্পর্কে যতটুকু জানে, বুঝে তা অন্য কেউ বুঝতে বা বলতে পারবে না। আর তাই নিজেই নিজের অন্যায়, ভুল আর মিথ্যাগুলো সম্পর্কে অবগত হয়ে তা থেকে নিজেকে পরিত্রাণ করে, সুন্দর, সত্য এবং ভালোর দিকে মনোনিবেশ করাই আত্মসমালোচনার মূল লক্ষ্য।
পবিত্র ইসলামে আত্মসমালোচনার প্রতি ব্যাপক জোর দেয়া হয়েছে।
আল্লøাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য উচিত আগামীকালের জন্য (অর্থাৎ আখিরাতের জন্য) সে কী প্রেরণ করেছে, তা চিন্তা করা। আর তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, ফলে আল্লাহ তাদেরকে আত্মভোলা করে দিয়েছেন। নিশ্চয়ই তারা ফাসিক।’ (সূরা-হাশর, আয়াত-১৮)
আমার আজকের দিনটা কেমন তা নিয়ে ভাবনা শেষে আমার আগামীকালের দিনটা কতটা ভালো করতে পারব তার চেষ্টা করে যাওয়া।
ব্যক্তিগতভাবে ‘আত্মসমালোচনা’ আমার কাছে আয়নার মতো মনে হয়। আয়নায় আমরা যেমন আমাদের প্রতিবিম্ব দেখতে পাই, আমাদের শরীরে, মুখে কোথায় কী আছে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখি, ঠিক তেমনি আমাদের প্রাত্যহিক কার্যাবলি ঠিক না বেঠিক তা আত্মসমালোচনার মাধ্যমে বুঝতে পারি।
আত্মসমালোচনার অভাবে আমরা অনেক কিছু থেকে সম্পূর্ণ বেখবর হয়ে থাকি। এক ব্যক্তি প্রতিদিন সিগারেট খান, তিনি জানেনও বটে এটা খাওয়া উচিত নয়, স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ। তারপরও তিনি খান কিন্তু তিনি এটা হিসাব করে কখনো দেখেননি যে, প্রতিদিন ৫০ টাকার সিগারেটে মাসে এক হাজার ৫০০, বছরে ১৮ হাজার এবং ১০ বছরে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয় করছেন ; যা সম্পূর্ণ অনর্থক। কারণ তিনি কখনো নিজেকে নিয়ে নিজে ভাবেননি, করেননি আত্মসমালোচনা।
নেশায় ডুবে থাকা টগবগে তরুণ-তরুণীটি কখনো নিজেকে নিয়ে ভেবে দেখেনি কী করছে বা কী করবে? বরঞ্চ কোনো ক্ষুদ্র কারণে হতাশার ছায়া একটু ছুঁয়ে দিলে জীবনকে অর্থহীন বানিয়ে ফেলে। ভাবে, এই বুঝি সব শেষ। তখন পালহীন নৌকার মতো জীবনকে উদ্দেশ্যহীনভাবে পরিচালনা করতে থাকে।
অথচ এটা ভেবে দেখে না, জীবন তো এখানেই শেষ নয়! বেঁচে থাকলে পড়ে আছে বিশাল একটা পথ, সেই পথটা কোনো ফুলের বিছানা নয়। নিজেকে নিজে শুধরে নিয়ে চলতে হবে। সেই সুন্দর চলার পাথেয়র জন্য আত্মসমালোচনার গুরুত্ব অপরিসীম।
আত্মসমালোচনা অর্থাৎ নিজেকে নিজে পাঠ করা। নিজের কর্মের সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য নির্ণয় করা। ভবিষ্যৎ এর মানচিত্র অঙ্কন করা। স্রষ্টার সান্নিধ্য অর্জন করা।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর রা: আত্মসমালোচনা সম্পর্কে চমৎকার একটি কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা নিজেদের আমলনামার হিসাব নিজেরাই গ্রহণ করো, চূড়ান্ত হিসাব দিবসে তোমাদের কাছ থেকে হিসাব গৃহীত হওয়ার আগেই। আর তোমরা তোমাদের আমলনামা মেপে নাও চূড়ান্ত দিনে মাপ করার আগেই। কেননা, আজকের দিনে নিজের হিসাব নিজেই গ্রহণ করতে পারলে আগামী দিনের চূড়ান্ত মুহূর্তে তা তোমাদের জন্য সহজ হয়ে যাবে। তাই সেই মহাপ্রদর্শনীর দিনের জন্য তোমরা নিজেদেরকে সুসজ্জিত করে নাও, যেদিন তোমরা (তোমাদের আমলসহ) উপস্থিত হবে এবং তোমাদের কিছুই সেদিন গোপন থাকবে না।’ (তিরমিজি-২৪৫৯, সনদ মওকুফ সহিহ)
আত্মসমালোচনা সম্পর্কে হাসান বসরি রহ: বলেন, ‘মুমিন ব্যক্তিকে স্বীয় আত্মার পরিচালক হিসেবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই আত্মসমালোচনা করতে হবে। যারা দুনিয়াতে আত্মসমালোচনা করবে, কিয়ামতের দিন অবশ্যই তাদের হিসাব হালকা হবে। আর যারা এ থেকে বিরত থাকবে, কিয়ামতের দিন তাদের হিসাব কঠিন হবে।’ (ইগাছাতুল লাহফান (মাকতাবাতুল মা’আরিফ, তাবি ১/৭৯)
আত্মসমালোচনার নানাবিধ উপকারিতা রয়েছে। প্রথমত, নিজের দোষত্রুটি, অন্যায়, মিথ্যা নিজের সামনে প্রকাশ করার মাধ্যমে স্বীয় ভুলত্রুটি সম্পর্কে জানতে পারা যায়। ফলে আমাদের বিবেক, মন ভালো কাজের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং মন্দ কাজ থেকে দূরে থাকতে পারে।
আত্মসমালোচনা দ্বীনের ওপর দৃঢ়তা অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম, যা আমাদেরকে আল্লাহর দরবারে খাঁটি ঈমানদার বান্দাদের কাতারে অন্তর্ভুক্ত করে।
আত্মসমালোচনার মাধ্যমে আমাদের মধ্যে পরকালীন জবাবদিহিতার চিন্তা ও উপলব্ধি সৃষ্টি হয়। এই যে আমরা দুনিয়াতে যা ইচ্ছা তা করে যাচ্ছি, একদিন তো এসবের সমাপ্তি হবে, তখন আল্লøাহর দরবারে গিয়ে কী জবাব দেবো?
আত্মসমালোচনা জীবনের লক্ষ্যকে সবসময় সজীব, পরিপাটি করে রাখে। এর মাধ্যমে আমরা অনুভব করতে পারি আমাদেরকে এই পৃথিবীর বুকে অকারণে সৃষ্টি করা হয়নি। পার্থিব জীবন শুধু খাওয়া-দাওয়া, হাসি-ঠাট্টার নয়, এ জীবনের পরবর্তী যে অনন্ত এক জীবন, তার জন্য যে আমাদের সবসময় তৈরি থাকতে হবে, আত্মসমালোচনা আমাদের সর্বক্ষণ তা স্মরণ করিয়ে দেয়।
সবচেয়ে বড় কথা হলোÑ আত্মসমালোচনার মাধ্যমে আমরা সতর্ক হয়ে যাই, যার ফলে দ্বিতীয়বার কোনো অন্যায়, ভুল করতে গেলে বিবেক আমাদের বাধা দেয়।
তাই আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত, সারা দিনের কার্য শেষে রাত্রিতে যখন ঘুমাতে যাই, তখন কিছুটা সময় নিজেকে নিজে দেই, আত্মসমালোচনা করি। নিজেকে নিজে প্রশ্ন করি, আজ সারা দিন আমি কী কী করেছি? নামাজ কাজা করেছি কি না? কয়টা মিথ্যা কথা বলেছি? আল্লাহকে কয়বার স্মরণ করেছি? কারো সাথে অন্যায় করেছি কি? কয়টা ভালো কাজ করেছি? আর কয়টা মন্দ কাজ করেছি?
নিজের কাছে নিজেকে হিসাব দেয়া, সর্বোপরি সারা দিনের কৈফিয়ত নিজেকে নিজে দেয়া। আর তাতেই নিজের কাছে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যাবে, যেখানে কোনো কিছু লুকানোর অপশন থাকবে না। মানুষ নিজেকে নিজে কখনো মিথ্যা বলতে পারে না, নিজের কাছে নিজেকে লুকাতে পারে না।
আর যখন প্রত্যেহ এসব হিসাব কষা হবে তখন আপনাআপনিই আমাদের মন-মস্তিষ্ক একটা শুদ্ধ ও আলোকরশ্মির পথ ধরে হাঁটতে থাকবে। যে আলোর পথটা ধরে আমরা হেঁটে যেতে পারব অনন্তকালের সেই গন্তব্যে, যেখানে আমাদের হিসাব সহজ থেকে সহজতর হয়ে যাবে।
আজকের দিনের নিজের করা হিসাব পরবর্তী কালের ফাইনাল এক্সামে (বিচার দিনের হিসাব) আমাদের সহজ করে দেবেন বিচার দিনের মালিক। জাজাকাল্লাহ খায়রান।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English