শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:৩৫ অপরাহ্ন

‘আমি নিজেও ভেবেছি, কে বিয়ে করবে আমাকে?’

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০
  • ৪২ জন নিউজটি পড়েছেন

বেশ কিছুদিন আগে কথায় কথায় পাতার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ী সাদেক বাচ্চুুুর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল। অনিবার্য কারণে সুদীপ কুমার দীপের নেওয়া সাক্ষাৎকারটি তখন পত্রস্থ করা সম্ভব হয়নি। সদ্যঃপ্রয়াত অভিনেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আজ তা প্রকাশ করা হলো।

আমি কখনো পুরস্কারের কথা চিন্তা করে কাজ করিনি। তার চেয়ে বড় কথা, আমার পুরস্কার তো অনেক আগেই জুটেছিল। দর্শকরা অফুরন্ত ভালোবাসা দিয়েছেন আমাকে। তবে শেষ কয়েকটা বছর একটু খারাপ লাগত। অনেক চরিত্রই করেছি, যেগুলো পুরস্কার পাওয়ার মতো; কিন্তু কেন জানি জুরিদের চোখে পড়ছিলাম না। অবশেষে পত্রিকায় একটা সংবাদ প্রকাশ পেয়েছিল আমাকে নিয়ে। সেখানে উঠে এসেছিল আমার আক্ষেপের কথা। সেটা ২০১৮ সালের জুরি বোর্ডসহ অনেকে দেখেছিলেন। কেউ কেউ অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলেন, ‘সত্যিই কি আমি এখনো পুরস্কার পাইনি?’ যা হোক, ‘একটি সিনেমার গল্প’ ছবির জন্য পেয়ে গেলাম কাঙ্ক্ষিত পুরস্কারটি। ছবিতে আমার চরিত্রটি সবার মনে রাখার মতোই ছিল।

আপনার জন্ম, বেড়ে উঠা, ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে?

আমার জন্ম ১৯৫৫ সালে, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে নানার বাড়িতে। তবে বেড়ে উঠেছি ঢাকার হাতিরপুলে। ধানমণ্ডির গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছিলাম। পাঁচ বোন ও তিন ভাইয়ের সংসার। বাবা ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ডাক বিভাগে চাকরি করতেন। বেশ সুনামও ছিল, কিন্তু হঠাৎ বাবা মারা গেলেন। সংসারের সব ভার এসে পড়ল আমার ওপর। তখন আমার বয়স কত হবে! সবে এসএসসি পাস করেছি। ওহ! মনে পড়েছে, ১৫ বছর সাত মাস। কতটুকু আর বুঝি! তার পরও মেনে নিলাম নিয়তি।

ওই বয়সে সংসারের ভার বইলেন কিভাবে?

আমার বাবা ছিলেন ডাক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তাঁকে সহকর্মীরা খুব ভালোবাসতেন। বাবার মৃত্যুর খবর শুনে সেদিন বাসায় এসেছিলেন তাঁরা। বাবার অফিসেই একটা চাকরি পরিবারের কাউকে দিতে চেয়েছিলেন তাঁরা। বলছি ১৯৭০ সালের কথা। আমিই ভাই-বোনদের মধ্যে সবার বড়। তখন তো ১৮ বছরের নিচে কেউ সরকারি চাকরি করতে পারত না। আর আমার বয়স ১৫ বছর সাত মাস। কী করা যায়—ভেবে সবাই অস্থির। এদিকে চাকরিটা পরিবারের কারো না হলে বানে ভেসে যাওয়া ছাড়া উপায়ও নেই! শেষ পর্যন্ত ডাক বিভাগের এক বিশেষ অনুমতি নিয়ে তাঁরা আমাকে শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একটা চাকরি দিলেন। কথা ছিল যত দিন না ১৮ বছর পূর্ণ হবে তত দিন আমি বেতন পাব ঠিকই; তবে আমাকে বয় সার্ভিস (অপ্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য বিশেষ সুবিধা) হিসেবে গণ্য করা হবে এবং ১৮ বছর হলে সেটা মূল চাকরিতে যোগ হবে না।

পড়াশোনা শেষ করেননি?

ডাক বিভাগে চাকরিটা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মতিঝিল টিঅ্যান্ডটি কলোনিতে বাসা পেয়ে গেলাম। তখন দিনে চাকরি করার পাশাপাশি নাইট কলেজে ভর্তি হলাম। সেখান থেকেই এইচএসসি পাস করেছি। এরপর বাকি পড়াশোনাও করেছি অনেক কষ্ট করে। বলতে গেলে প্রখর ইচ্ছা না থাকলে কোনোভাবেই হয়তো সম্ভব হতো না।

পরের বছরই তো মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। আপনার কোনো স্মৃতি?

আমি সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিতে পারিনি। পরিবারকে ছেড়ে যদি যুদ্ধে যেতাম, তবে সবাইকে না খেয়ে মরতে হতো। তবে আমার পুরো সমর্থন ছিল মুক্তিযুদ্ধের ওপর। মনে পড়ে, বেশ কয়েকবার নদী সাঁতরে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ওষুধ আর শুকনা খাবার পৌঁছে দিয়েছিলাম। তা ছাড়া মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ভাইয়ের কর্মীদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখতাম। তাঁরা কখন কোন মিশনে যাবেন, সে খবরও পৌঁছে দিতাম অন্য লিডারদের কাছে।

আপনি নাকি শুরুর দিন থেকে অবসর নেওয়া পর্যন্ত একই চেয়ার ব্যবহার করেছেন?

সুন্দর একটি বিষয় মনে করিয়ে দিলেন। আমি ডাক বিভাগে যোগ দেওয়ার প্রথম দিন যে চেয়ারটিতে বসেছিলাম, সেই চেয়ারটিই ছিল আমার পুরো চাকরিজীবনের সঙ্গী। আমার পদ পরিবর্তন হয়েছে অনেকবার। অনেকবার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছি। পিয়ন প্রতিবারই চেয়েছে ভঙ্গুর চেয়ারটি বদলাতে। আমি কখনোই সেটা বদলাতে দিইনি। কারণ আমার প্রথম দিনের জরাজীর্ণ সেই সময়টার সাক্ষী যে চেয়ার, কালের পরিবর্তনে তো তাকে দূরে ঠেলতে পারি না! তাতে আমার মনে অহংকার চলে আসত। আমি কক্ষচ্যুত হতাম সততা থেকে।

নাটকের সঙ্গে যুক্ত হলেন কিভাবে?

আমার ছেলেবেলা কেটেছে রাজধানীর হাতীরপুল। জায়গাটা ষাটের দশকে খুব আলোচিত ছিল। সে সময় যত নাট্যব্যক্তিত্ব ছিলেন, সবাই হাতীরপুল এসে আড্ডা দিতেন। অভিনেতা আনোয়ার হোসেন, গোলাম মোস্তাফা, আক্তার হোসেন থেকে শুরু করে নায়করাজ রাজ্জাক—কে আসতেন না! আমি বয়সে ছোট হলেও তাঁদের আড্ডায় হাজির হতাম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনতাম কী বলছেন। তখন রেডিও সেন্টার ছিল শাহবাগ। সেখানেও যেতে শুরু করলাম। এভাবে কখন যে নাটকের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়লাম, বুঝতেই পারিনি।

আপনার প্রথম নাটক মঞ্চস্থ হয় কখন?

পরিষ্কার করে বলতে গেলে আমি প্রথম নাটকে অভিনয় করি ধানমণ্ডি স্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ার সময়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটকের অমল চরিত্রটি করি। অবশ্য তখনো ভাবিনি অভিনয় একসময় আমাকে পেয়ে বসবে। পরে সেটা ঘটল আমার গুরু আনিস মোহাম্মদের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর। এসএসসির ঠিক আগে আগে। গুরুর কাছ থেকে যতই অভিনয়ের কলাকৌশল শিখতে শুরু করলাম, ততই দুর্বল হতে শুরু করলাম।

মঞ্চে নিয়মিত হলেন কবে থেকে?

মুক্তিযুদ্ধের পরপরই ‘গণ নাট্য পরিষদ’ নামে একটি নাট্যসংগঠন যাত্রা শুরু করে। সেটায় ছিলেন আনোয়ার হোসেন, আমজাদ হোসেন, ফরিদ আলী, নারায়ণ চক্রবর্তী থেকে শুরু করে অনেকে। আমিও ছিলাম সংগঠনটিতে। এরপর আমরা কয়েকজন মিলে ‘উন্মোচন’ নামে আরেকটি সংগঠন তৈরি করি ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে। তবে কোনো নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার আগেই সংগঠনটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। শেষে ‘পদক্ষেপ’ নামের আরেকটি সংগঠন তৈরি করি। এটি থেকেই আমি একের পর এক নাটকে অভিনয় করা শুরু করলাম। ‘আমি মন্ত্রী হবো’, ‘অবক্ষয়’, ‘নির্ভরযোগ্য গুজবে প্রকাশ’সহ অনেক নাটক দর্শকপ্রিয়ও হয়েছিল তখন।

রেডিও-টেলিভিশনে কাজ শুরু করলেন কিভাবে?

১৯৭৬ সালের দিকে রেডিওতে নিয়মিত হই। আসলে তত দিনে যাঁরা নাট্যজগতে প্রতিষ্ঠিত সবাই আমার পরিচিত হয়ে গেছেন। তাই রেডিওতে ঢুকতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। আর টেলিভিশনে কাজ করার সুযোগটা তো কাকতালীয়ভাবে এলো। ১৯৭৬ সালের শেষের দিকের কথা, মহিলা সমিতিতে আমার অভিনীত ‘নির্ভরযোগ্য গুজবে প্রকাশ’ নাটকটি মঞ্চস্থ হচ্ছে। তখন মঞ্চের সামনের সারিতে বসে আছেন আবদুল্লাহ ইউসুফ ইমাম। নাটক শেষে তিনি আমাকে ডাকলেন। বললেন টেলিভিশনে যেতে। সেই সময়ে ‘নবকল্লোল’ নামের একটি অনুষ্ঠান প্রযোজনা করতেন আশরাফুজ্জামান খান। অনুষ্ঠানটি ছিল ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় অভিনেতাদের নিয়ে। আমার সুযোগ হয়ে গেল ‘নবকল্লোল’-এ। এরপর তো ‘মণিহার’, ‘হিরামন’, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’, ‘ইমিটেশন’সহ অনেক নাটকে অভিনয় করলাম। ‘মণিহার’ ছিল সাহিত্যভিত্তিক নাটক। আর ‘হিরামন’ ছিল লোককাহিনিভিত্তিক নাটক। এ ছাড়া আমি ‘সুজন বাদিয়ার ঘাট’, ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’, ‘কবর’—এই নাটকগুলোতে অভিনয় করে পরিচিতি পাই। বিশেষ করে সেলিম আল-দীনের ‘গ্রন্থিকগণ কহে’ নাটক করে সমালোচকদের নজর কাড়ি।

চলচ্চিত্রে শুরুটা কবে?

তখন নাটক নিয়ে দারুণ ব্যস্ত ছিলাম। তবে চলচ্চিত্রের প্রতি আলাদা একটা টান ছিল। হঠাৎ একদিন শহীদুল আমিন ডাকলেন। গেলাম তাঁর কাছে। তিনিই সুযোগ করে দিলেন ‘রামের সুমতি’ ছবিতে অভিনয় করার। পার্শ্বনায়কের চরিত্রে অভিনয় করলাম। দারুণ লাগল নিজেকে বড় পর্দায় দেখতে। এরপর শহীদুল হক খানের ‘সুখের সন্ধানে’, শহীদুল আমিনের ‘মায়ামৃগ’সহ বেশ কয়েকটি ছবিতে কাজ করি।

নিজেকে প্রথম প্রমাণ করেছিলেন কোন ছবির মাধ্যমে?

আমাকে সারা দেশ চিনেছিল এহতেশাম দাদুভাইয়ের ‘চাঁদনী’ ছবির মাধ্যমে। এই ছবিতেই প্রথম কিন্তু আমি খল চরিত্রে অভিনয় করি। ভাবতে পারিনি দর্শক এক ছবিতেই আমাকে এভাবে লুফে নেবে। এরপর আর আমাকে পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক ছবি হাতে এসেছে, আমিও অভিনয় করেছি। দর্শকও পছন্দ করেছে।

অভিনেতা হিসেবে খল চরিত্র কেন বেছে নিলেন?

আমি মনে-প্রাণে একজন অভিনেতা হতে চেয়েছিলাম। শিল্পী হওয়ার ইচ্ছাটাই মনে ছিল সব সময়। তার কারণে কোনটা খল চরিত্র আর কোনটা ভালো চরিত্র, সেটা দেখার সময় পাইনি। এহতেশাম দাদুভাই যখন চরিত্রটি শুনিয়েছিলেন তখন মনের মধ্যে চরিত্রটি ধারণ করেছিলাম। বুঝতে পেরেছিলাম অভিনয় করার সুযোগ আছে। আর সেই সুযোগ কাজেও লাগিয়েছি। তা ছাড়া আরেকটু খুলে বললে, নায়ক হতে গেলে যে যে গুণ থাকা দরকার তার অন্যতম হলো চেহারা। আমি অতটা সুন্দর চেহারার নই। তাই চেষ্টাও করিনি।

ঢাকাই চলচ্চিত্রে আপনাকে ‘স্যার’ সম্বোধন করা হয়…

আমি কি এতটা সম্মান পাওয়ার যোগ্য! মাঝে মাঝে ভাবলে চোখে জল এসে যায়। শুধু সাধারণ মানুষই নয়, ইন্ডাস্ট্রির সবাই আমাকে ভালোবাসেন। সম্মান করেন। এটা অনেক বড় পাওয়া। সত্যি বলতে আমি যাঁর শিষ্য, তিনি (মোহাম্মদ আনিস) ছিলেন রাজ্জাক, আনোয়ার হোসেন থেকে শুরু করে আনোয়ারাদের অভিনয়শিক্ষক। গুরুর কাছেই শিখেছিলাম কিভাবে অভিনয় শেখাতে হয়, গ্রুমিং করাতে হয়। সেটা এহতেশাম দাদুভাই কিভাবে যেন জেনেছিলেন। ‘চাঁদনী’ শুরু করার আগেই তিনি আমাকে ডাকলেন। নতুন মুখ নাঈম-শাবনাজকে আমার হাতে দিয়ে বললেন, দ্রুত শিখিয়ে নিতে হবে, কারণ খুব শিগগির শুটিং। আমিও তাঁর কথা ফেলতে পারলাম না। শুরু করলাম ক্লাস। ওদেরও আগ্রহ ছিল অনেক। অল্প কয়েক দিনেই শিখে নিল অনেক কিছু। এই খবর ছড়িয়ে পড়তে এবং ‘চাঁদনী’ ব্লকবাস্টার হিট হওয়ায় আমার শিক্ষকতার কথা ছড়িয়ে পড়ল সবখানে। সেই যে শুরু, এখনো চলছে।

এখন পর্যন্ত তারকাদের মাঝে কে কে আপনার ছাত্র?

আমি তাদের ছাত্র বলতে নারাজ। এতে হয়তো অনেকে কষ্টও পাবে। বরং আমি বলতে পারি কার কার সঙ্গে অভিনয়ের কলাকৌশল ভাগ করে নিয়েছি। এ ক্ষেত্রে নাঈম-শাবনাজ তো আছেই। পরবর্তী সময়ে আমিন খান, শাহীন আলম, শাবনূর, পূর্ণিমা, রিয়াজ, শাকিব খান, বাপ্পী চৌধুরী, সাইমন—যখন যে আমার কাছে শিখতে চেয়েছে, বুঝতে চেয়েছে, চরিত্র নিয়ে আমি অকপটে সবাইকে শিখিয়েছি। আমি এখনো বলি, আমার জ্ঞান সীমিত। এই সীমিত জ্ঞান থেকে যদি সামান্যটুকুও কারো কাজে লাগে আমি তার জন্য উজাড় করে দিতে রাজি আছি।

আপনি নিজেও একজন নাট্যকার!

এখন পর্যন্ত আমি বেশ কয়েকটি নাটক লিখেছি। যদিও আমার শুরুটা ‘ক্ষুদিরামের মা’র নতুন করে চিত্রনাট্য ও সংযোজন-বিয়োজন করে। এরপর প্রথম মৌলিক নাটক লিখি ‘কতোদিন এই দিন’। এরপর ‘কতিপয়ের বৃত্তান্ত’, ‘কুলাঙ্গার’, ‘কাফনের পকেট নাই’ ও ‘কালাকাল’। তার মধ্যে আগের নাটকগুলোর বেশির ভাগেরই ৪০-৫০টি করে শো হয়েছে। ‘কালাকাল’ নতুন নাটক। এর মধ্যে ১৫টির মতো শো হয়েছে।

নতুন নাটক কী লিখছেন?

অভিনয়ে ব্যস্ততার কারণে নাটক লেখায় ওভাবে সময় দিতে পারি না। তার পরও মনের ক্ষুধা থেকে লিখতে হয়। এখন ‘কুসুম চুপ একদম চুপ’ নামে একটি নাটক লিখছি। প্রায় শেষের পথে। এ বছরের মাঝামাঝি হয়তো মঞ্চস্থও হতে পারে।

আপনার লেখা সব নাটকের নামের প্রথম অক্ষর ‘ক’। কেন?

দারুণ একটা বিষয় ধরেছেন। কিন্তু আমার খুলে বলার সুযোগ নেই। হ্যাঁ। আমি ভবিষ্যতেও যতগুলো নাটক লিখব সেগুলোরও নামের প্রথম অক্ষর ‘ক’ থাকবে। তবে কেন, সেটা শুধু আমিই জানব। অন্য কেউ নয়। বলতে পারেন লেখক হিসেবে এটা আমার একটা কৌশল।

হুমায়ুন ফরীদি, রাজীব, এ টি এম শামসুজ্জামান থেকে শুরু করে এই সময়ের মিশা সওদাগরের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। কাকে আপনার চোখে সেরা খল অভিনেতা মনে হয়?

আমি প্রত্যেককে খুব কাছ থেকে দেখেছি। প্রত্যেকেই তাঁর জায়গায় সেরা। আপনি যাঁদের বিচার করতে বলছেন তাঁরা সবাই লিজেন্ড। আমি কি বিচার করার যোগ্যতা রাখি? তবে এটুকু বলতে পারি, এতগুলো প্রজন্মের সঙ্গে অভিনয় করেছি; কিন্তু কারো সঙ্গে কখনো মনোমালিন্য হয়নি। সবাই আমাকে ভালোবাসা দিয়েছেন। আমার সুখে হেসেছেন, আমার দুঃখে কেঁদেছেন। এটাই তো সবচেয়ে বড় অর্জন।

একবার আপনি আইসিইউয়ে ভর্তি ছিলেন…

সেই দিনের কথা কখনোই ভুলতে পারব না। আমার ব্রেনস্ট্রোক হয়েছিল। ডাক্তার নাকি ক্লিনিক্যালি ডেথও বলেছিলেন। হয়তো মানুষের ভালোবাসাই আমাকে ফিরিয়ে এনেছে। সত্যি, তখন যদি আমার কিছু হয়ে যেত, পরিবারটা পথে বসত। কারণ আমার বিয়ে হয়েছে তখন খুব বেশিদিন হয়নি। সবে ভাই-বোনদের প্রতিষ্ঠিত করে নিজের পরিবারের প্রতি মন দিয়েছি। বাচ্চারাও ছোট। সেই যাত্রায় রক্ষা পেয়ে আমি শুধু জীবনই ফিরে পাইনি, পেয়েছি আলোর পথের দেখা।

আপনার বিয়ে নিয়ে একটা মজার ঘটনা আছে…

পরিবারের সবাই আমার বিয়ে নিয়ে আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। আমার বয়স বেড়ে ৪০ পেরিয়েছে। ৫০ ছুঁই ছুঁইও বলতে পারেন। আমি নিজেও ভেবেছি, কে বিয়ে করবে আমাকে? তবে মা কিন্তু আশা ছাড়েননি। তিনি প্রায় সময় আমাকে বোঝাতেন। বলতেন, ‘দেখ বাবা, তুই যে এই দেরি করে বিয়ে করছিস এটা তো আনন্দ করে নয়। তুই ভবঘুরেও না।

পরিবারকে রক্ষা করতে গিয়ে, ভাই-বোনকে পড়াতে গিয়েই তো তোর দেরি হলো। আল্লাহ সব দেখেছেন। তাঁর বিচার (ফয়সালা) তিনি করবেনই। আশা ছাড়িস না।’ এর মধ্যে একদিন অফিসে গেলাম। এক সহকর্মী এলেন আমার টেবিলে। চা খেতে খেতে বললেন, ‘ভাই, একজন মেয়ে আছে। আমি আপনার কথা বলেছি তার পরিবারকে। তারা কথা বলতে চায়। প্লিজ, না করবেন না!’ ভাবলাম বরাবরের মতোই হবে। আমার বয়স জেনে চুপটি করে ‘না’ বলে চলে যাবেন। তার পরও একটা দিন ধার্য করলাম। সেদিন মেয়ের পরিবার এলো। আমার সঙ্গে কথা বলল। মেয়ের বড় ভাই প্রফেসর ড. সেলিম রেজা আমাকে একান্তে ডেকে বললেন, ‘আমরা সব জেনে-বুঝেই এসেছি। আদতে আপনি পর্দায় মন্দ চরিত্র করলেও বাস্তবে অনেক ভালো মানুষ। যে মানুষ তার পরিবারের জন্য নিজের ভবিষ্যৎ জলাঞ্জলি দিতে পারে, আর যা-ই হোক তাকে তো আমরা হেলায় হারাতে পারি না। আমার বোনের জন্য আপনাকে চাই।’ মা এ কথা শুনে খুশিতে আত্মহারা। আরো খুশি হলেন যখন মেয়ের ছবি দেখলেন। আমাকে ডেকে বললেন, ‘আল্লাহ মহান! আমার চাওয়াকে পূরণ করেছেন। দেখ কত সুন্দর তোর বউ!’ আমি ছবিটা দেখলাম। আসলেই সুন্দরী। কখনো ভাবিনি এমন মেয়ে ওপরওয়ালা আমার জন্য তুলে রেখেছেন।

ডাক বিভাগ থেকে অবসর নিয়েছেন কবে?

অবসর নিয়ে একটা স্মৃতি আছে। আমি তখন হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে। ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর। জানতাম না যে আমার রিটায়ার্ডের সময় হয়েছে। মেট্রোপলিটন সার্কেলের পোস্টমাস্টার জেনারেল (অফিস) পদে থাকা অবস্থায় আমি অবসর নিয়েছিলাম।

চাকরির পাশাপাশি অভিনয়—কোনো সমস্যা হয়নি?

চিরকৃতজ্ঞতা জানাই আমার সহকর্মীদের। অফিসের সহকর্মীরা আমাকে সব সময় যেমন সাহায্য করেছেন, তেমনি মিডিয়ার বন্ধুরাও পাশে ছিলেন। আমার বিষয়ে একটা কথা চাউর ছিল, ‘সাদেক বাচ্চু হলেন শুক্র ও শনিবারের শিল্পী। বাকি দিনগুলোতে ইভিনিং শিফটে ছাড়া তাঁকে পাওয়া যাবে না।’ আসলেও তাই। শুক্র ও শনিবার ছাড়া আমি দুপুর ২টার পর কখনো স্পটে যেতে পারতাম না। তবে এ নিয়ে নায়করাজ রাজ্জাক, আলমগীর, সোহেল রানা থেকে শুরু করে এই সময়ের শাকিব খান—কেউ কখনো প্রশ্ন তোলেননি। আমার জন্য বরং অপেক্ষা করেছেন। আমি তাঁদের এই ঋণ ভুলব না। তাঁরা আমার প্রতি আন্তরিক না হলে আজ আমি সাদেক বাচ্চু হতে পারতাম না।

চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থা দেখে কী মনে হয়?

জানি না, কেন যে দিন দিন চলচ্চিত্র এমন অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে। পাঁচ দশকের অভিনয়জীবন দিয়ে যদি চলচ্চিত্রকে মূল্যায়ন করতে বলা হয় তাহলে বলব, উজ্জ্বল অতীত, অস্থির বর্তমান আর অন্ধকার ভবিষ্যতের পথে দাঁড়িয়ে আছে ঢাকাই চলচ্চিত্র। তার পরও আমি আশাবাদী মানুষ। আশা পুষে রাখি, একদিন হয়তো ঘুরে দাঁড়াবে সব। ফিরে আসবে হারানো ঐতিহ্য।

মঞ্চ নিয়ে কিছু বলতে চান?

মঞ্চের মানুষগুলোর প্রতি সব সময় শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। চলচ্চিত্রে তবু কিছু পারিশ্রমিক পাওয়া যায়। কিন্তু মঞ্চে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা নিজের পকেটের টাকা খরচ করেন বছরের পর বছর। কত ত্যাগ, কত ভালোবাসা থাকলে একজন বেকার ছেলে পায়ে হেঁটে রিহার্সাল করতে আসেন, একজন চাকরিজীবী তাঁর বেতনের টাকা দিয়ে শো মঞ্চস্থ করেন! এই মানুষগুলোকে হয়তো আমরা সময়মতো মূল্যায়ন করতে পারি না। তাঁদের ধন্যবাদ দিতে পারি না। একজন শিল্পী হিসেবে আমি তাঁদের স্যালুট জানাই।

শেষ পর্যন্ত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলেন…

আমি কখনো পুরস্কারের কথা চিন্তা করে কাজ করিনি। তার চেয়ে বড় কথা, আমার পুরস্কার তো অনেক আগেই জুটেছিল। দর্শকরা অফুরন্ত ভালোবাসা দিয়েছেন আমাকে। তবে শেষ কয়েকটা বছর একটু খারাপ লাগত। অনেক চরিত্রই করেছি যেগুলো পুরস্কার পাওয়ার মতো, কিন্তু কেন জানি জুরিদের চোখে পড়ছিলাম না।

অবশেষে একটা সংবাদ প্রকাশ পেয়েছিল আমাকে নিয়ে। সেখানে উঠে এসেছিল আমার আক্ষেপের কথা। সেটা ২০১৮ সালের জুরি বোর্ডসহ অনেকে দেখেছিলেন। কেউ কেউ অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলেন, ‘সত্যিই কি আমি এখনো পুরস্কার পাইনি?’ যা হোক, ‘একটি সিনেমার গল্প’ ছবির জন্য পেয়ে গেলাম কাঙ্ক্ষিত পুরস্কারটি। ছবিতে আমার চরিত্রটি সবার মনে রাখার মতোই ছিল।

আপনার পরিবার সম্পর্কে বলুন।

আমার স্ত্রী শাহনাজ। দুই মেয়ে—মেহজাবীন এবার এইচএসসি প্রথম বর্ষে এবং নওশিন দশম শ্রেণিতে পড়ে। একমাত্র ছেলে সোয়ালেহিন পড়ছে ষষ্ঠ শ্রেণিতে। এদের নিয়েই আমার সংসার।

১৩ এপ্রিল ২০২০, রাজারবাগ, ঢাকা।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English