এ ধরার যে একজন স্রষ্টা রয়েছেন তার বহু নিদর্শন বিদ্যমান। প্রথমত তাঁর সৃষ্টির মধ্যেই তাঁর পরিচয় পাওয়া যায়। উপমহাদেশের অন্যতম জ্ঞানতাপস, যুগশ্রেষ্ঠ হাদিসবিশারদ শাহ ওলিউল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলভি রহ: বলেছেন, আল্লাহ তায়ালার তথা ইসলামের সেরা প্রতীক বা নিদর্শন চারটি। এ চারটি হলোÑ ১. কুরআন মাজিদ; ২. কাবা শরিফ; ৩. নবী সা: ৪. নামাজ।
১. কুরআন মাজিদ : কুরআন মাজিদ সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ আসমানি কিতাব। কুরআন মাজিদ মহানবী সা:-এর অন্যতম চিরস্থায়ী মুজেজা। তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘এ সেই কিতাব যাতে কোনোই সন্দেহ নেই।’ (সূরা বাকারা : ২) কুরআন মাজিদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা ভাষাবিদ পণ্ডিতদের চ্যালেঞ্জ করেছেনÑ ‘এতদসম্পর্কে যদি তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকে যা আমি আমার বান্দার প্রতি নাজিল করেছি, তাহলে এর মতো একটি সূরা রচনা করে নিয়ে এসো।’ (সূরা বাকারা : ২৩) আরো ইরশাদ করেন, ‘আর যদি তোমরা (চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে) না পারো, অবশ্য (চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে) তোমরা কখনো পারবে না।’ (সূরা বাকারা : ২৪) কুরআন মাজিদ ভবিষ্যতের যেসব সংবাদ দিয়েছে তা হুবহু ঘটেছে। তাতে পূর্ববর্তী জাতি, তাদের শরিয়ত ও ইতিহাস পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। কুরআন মাজিদ এমন কিতাব যা যত পাঠ করা হয় ততই আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। জ্ঞানের এক অফুরন্ত সাগর। তার শব্দচয়ন, ভাষার লালিত্য, ভাব ও ছন্দের মিল আরবের ভাষাবিদ পণ্ডিতদের অবাক করেছে। ফলে তারা কুরআন মাজিদের কাছে মাথানত করতে বাধ্য হয়েছে। শাহ ওলিউল্লাহ দেহলভি রা: বলেন, কুরআন যেন রাজার পক্ষ থেকে প্রজাদের কাছে রাজকীয় ফরমান। প্রজার জন্য রাজার সম্মান করা যেমন অপরিহার্য, তেমনি তার ফরমানের সম্মান করা, তা অনুযায়ী জীবন গড়া এবং তার রঙে নিজেকে রঙিন করা অপরিহার্য। কুরআন মাজিদকে সম্মান করার অর্থ আল্লাহকে সম্মান করা।
২. কাবা শরিফ : কাবাগৃহ ইসলামের অন্যতম প্রতীক। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্য তৈরি করা হয়েছে, তা হলোÑ এ ঘর যা মক্কায় অবস্থিত এবং সমস্ত জগতের মানুষের জন্য হিদায়াত ও বরকতময়। এতে রয়েছে মাকামে ইবরাহিমের ন্যায় প্রকৃষ্ট নিদর্শন। আর যে ব্যক্তি তাতে প্রবেশ করবে, সে নিরাপত্তা লাভ করবে। আর এ ঘরের হজ করা মানুষের ওপর আল্লাহর প্রাপ্য।’ (সূরা আলে ইমরান : ৯৬-৯৭) এ আয়াতদ্বয়ে কাবাঘরের পাঁচটি গুরুত্বের কথা বলা হয়েছে। যথাÑ ১. তা প্রথম ঘর; ২. তাতে রয়েছে হিদায়াত ও বরকত; ৩. তাতে রয়েছে মাকামে ইবরাহিম; ৪. তা নিরাপত্তা দানকারী; ৫. সামর্থ্যবানদের ওপর এর হজ করা ফরজ।
৩. নবী সা:Ñ নবী সা: আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত। আল্লাহ তাঁকে নবুয়তের জন্য বাছাই করেছেন। কেউ স্বেচ্ছায় নবী হতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ এ বিষয়ে সুপরিজ্ঞাত যে, কোথায় স্বীয় পয়গাম পাঠাতে হবে।’ (সূরা আনয়াম : ১২৪) নবীর ওপর ঈমান আনা ব্যতীত কেউ মুমিন হবে না। নবী সা: পৃথিবীতে আল্লাহর দূত। নবীর আনুগত্য করা ব্যতীত আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়া যাবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘(হে হাবিব) বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তাহলে আমার আনুগত্য করো, তাতে আল্লাহও তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপ মার্জনা করবেন। আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু।’ (সূরা আলে ইমরান : ৩১) নবী সা:কে ভালোবাসা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মহানবী সা: বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের জীবন, বাবা-মা, সন্তান-সন্ততি এবং সবকিছু থেকে আমাকে অধিক ভালো না বাসবে ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না।’ (বুখারি) মহানবী সা: বলেছেন, যে আমাকে কষ্ট দিলো সে যেন আল্লাহকে কষ্ট দিলো। তাঁর আদেশ-নিষেধ পালন করা যেন আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালন করা। কেননা, আল্লাহ আদেশ না করলে তিনি কোনো কথা বলেন না। আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীর সাথে কী ধরনের আচরণ করবেন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর তোমাদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না এবং তোমরা একে অপরের সাথে যেরূপ উচ্চস্বরে কথা বলো, তাঁর সাথে সেরূপ উঁচুস্বরে কথা বলো না। এতে তোমাদের কর্মফল নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তোমরা টেরও পাবে না।’ (সূরা হুজরাত : ২) সাহাবায়ে কেরাম বিভিন্ন যুদ্ধে কঠিন মুহূর্তে মহানবী সা:কে জীবন দিয়ে বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন। তার গায়ে একটা কাঁটা বিদ্ধ হওয়া তাঁরা সহ্য করতেন না।
৪. নামাজ : ইসলামের অন্যতম প্রতীক নামাজ। নামাজি নিজেকে অসহায় এবং তুচ্ছজ্ঞান মনে করে প্রভুর সামনে দাঁড়ায়। নামাজ হলো মুমিনের মিরাজ। নামাজে দাঁড়িয়ে সে স্বীয় প্রভুর সাথে কথোপকথন করে। ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের দ্বিতীয় স্তম্ভ হলো নামাজ। নামাজের ফরজিয়াত অস্বীকারকারী যেন আল্লাহকে অস্বীকারকারী। নামাজ প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ, জ্ঞানবান নর-নারীর ওপর ফরজ। শরিয়তসম্মত ওজর ছাড়া স্বেচ্ছায় নামাজ ছেড়ে দেয়া কবিরা গুনাহ। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমার নামাজ, ঈদের নামাজ মুমিনদের জন্য সম্মেলন। নামাজের মাধ্যমে স্রষ্টা ও বান্দার মধ্যে গভীর সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের সুযোগ লাভ হয়। মহানবী সা: বলেছেন, ‘বান্দাহ সিজদারত অবস্থায় তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়।’ (মুসলিম) মুমিন যতক্ষণ নামাজে থাকে ততক্ষণ আল্লাহর সামনে থাকে নামাজের মাধ্যমে মুমিন আল্লাহর যত কাছে চলে যায় অন্য ইবাদতের মাধ্যমে যায় না। কুরআন মাজিদে নামাজের ব্যাপারে যত নির্দেশ দেয়া হয়েছে, অন্য ইবাদত প্রসঙ্গে দেয়া হয়নি। মহানবী সা: বলেন, বিচার দিবসে সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেয়া হবে।’ (তিরমিজি) সত্যিকার মুমিনের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা নামাজ কায়েম করে এবং আমার প্রদত্ত রিজিক ব্যয় করে তারা সত্যিকার মুমিন।’ (সূরা আনফাল : ৩-৪) নামাজ দ্বীনের উৎস, তা প্রকৃত জীবন। ইসলামের আওতায় প্রবেশের প্রমাণ হলো নামাজ। ইসলামী নেতৃত্বের উদ্দেশ্য হলো নামাজ কায়েম করা। নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য পাওয়া যায়। সবর, দৃঢ়তা ও রুহানি শক্তির উৎস হলো নামাজ।