মানুষের দেহটাই সব কিছু নয়। দেহাভ্যন্তরে প্রাণের অস্তিত্ব যেখানে তাকে আমরা ‘রুহ’ বলি। রুহ অদৃশ্য শক্তি বা আল্লাহর আদেশ। বিজ্ঞানে আমাদের হার্টের স্পন্দনে এর অবস্থান। আজরাইল আ: শরীর থেকে রুহ অপসারণ করলেই আমাদের মৃত্যু হয়।
কালব এমন আরেকটি পেশীয় উপাদান যার অস্তিত্ব ও দৃশ্যমানতা আছে। আমাদের পুরো শরীর কালবের আবরণ মাত্র। এ কারণে দেহের হেফাজতের চেয়ে কালবের হেফাজতের গুরুত্ব অনেক বেশি। কালবই হচ্ছে মানুষের হেদায়াতের কেন্দ্রবিন্দু। আর পরিশুদ্ধ কালব ছাড়া সঠিক হেদায়াতও সম্ভব নয়।
আল্লাহ তায়ালা কুরআন পাকে ইরশাদ করেন, বিশ্বস্ত রুহ (জিবরিল) তা (কুরআন) নিয়ে অবতরণ করেছে তোমার কালবে; যাতে তুমি সতর্ককারী হতে পার। (সূরা শুআরা : আয়াত ১৯৩-১৯৪)
এ কালবই পবিত্র কুরআনুল কারিমকে অধিক অনুধাবন করার এবং তা ধারণ করার অধিকারী।
কালবের পরিচয় ও গুরুত্ব তুলে ধরে হাদিসে পাকে প্রিয়নবী সা: বলেছেন, জেনে রেখো! তোমাদের শরীরের মধ্যে এক টুকরো গোশতপিণ্ড আছে; যদি তা সংশোধিত হয়, তবে পুরো শরীরই সংশোধিত হয়। আর যদি তা খারাপ হয়; তবে সমস্ত শরীরই খারাপ হয়ে যায়। মনে রেখো তাহলো কালব বা দিল।’ (বুখারি, মুসলিম ও মিশকাত)
কলব সম্বন্ধে পবিত্র কুরআনে বহু আয়াত রয়েছে, যেসব আয়াতে কালবের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন : তাহাদের অন্তরে (কালবে) ব্যাধি রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তাদের ব্যাধি বৃদ্ধি করেছেন ও তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি, কারণ তারা মিথ্যাবাদী। (সূরা: বাকারা, আয়াত : ১০)
আমি তো বহু জিন ও মানবকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি; তাদের কালব (হৃদয়) আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না, তাদের চক্ষু আছে তা দিয়ে দেখে না এবং তাদের কর্ণ আছে তা দিয়ে শ্রবণ করে না; এরা পশুর ন্যায়, বরং এরা অধিক পথভ্রষ্ট। এরাই গাফিল। (সূরা: আরাফ, আয়াত : ১৭৯)
তাহারা কি দেশ ভ্রমণ করেনি? তা হলে তারা জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন কালব (হৃদয়) ও শ্রুতিশক্তি সম্পন্ন শ্রবণের অধিকারী হতে পারত। বস্তুত চক্ষু তো অন্ধ নয়, বরং অন্ধ হচ্ছে বক্ষস্থিত কালব (হৃদয়)। (সূরা : হজ, আয়াত : ৪৬)
কালবের কার্যক্রমকে আমরা আকল বা বিবেকের কাজ বলি। হারাম ও সন্দেহজনক কার্যাবলি থেকে বাঁচতে চাইলে প্রথমেই ব্যক্তির নিজের আকল বা বিবেককে ঠিক করতে হবে। কারণ, মানুষের বিবেকই মানবদেহরূপী কারখানার জন্য চালক যন্ত্রস্বরূপ। মানবের কর্তব্য, তার বিবেক-বুদ্ধিকে ঠিক রেখে তারপর সেই সুষ্ঠু জ্ঞান-বিবেকের দ্বারা স্বীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে পরিচালিত করা।
হাদিসে রাসূলুল্লাহ সা: ‘মুদগা’ বলে মানবদেহের যে বিশিষ্ট অংশটির প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন, সে অংশটি হচ্ছে আকল বা বিবেক। এর উন্নতিতে পূর্ণ মানবদেহের উন্নতি এবং এর অবনতিতে সম্পূর্ণ মানবদেহের অবনতি ঘটে থাকে। অর্থাৎ বিবেক রতœটির উন্নতি সাধিত হলে সমগ্র মানবদেহের উন্নতি হবে এবং তার অবনতিতে সমগ্র মানবদেহেরই অবনতি ঘটবে।
আধ্যাত্মিক জ্ঞানবিশারদেরা বিবেকের উন্নতির পাঁচটি স্তর বর্ণনা করেছেন :
১. আল্লাহকে স্মরণ করা, আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে জিকির করা ২. আল্লাহর মহৎ গুণাবলির ধ্যান করা এবং ওই ধ্যানের দ্বারা নিজের মধ্যে ওই গুণের প্রতিবিম্ব হাসিল করা ৩. আল্লাহর গুণাবলির তত্ত্বজ্ঞানের দ্বার উন্মুক্ত করা ৪. আল্লাহর গুণে মুগ্ধ ও অভিভূত হয়ে আল্লাহর আশেক ও প্রেমিকে পরিণত হওয়া এবং নিজের নফসের সব কুপ্রবৃত্তির প্রতি ঘৃণা জন্মানো এবং সেগুলো ফানা ও বিলুপ্ত করে দেয়া। অর্থাৎ সেগুলোকে পূর্ণরূপে দখল ও অধিকার করার সামর্থ্য অর্জন করা ৫. আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হওয়া, যাকে আল্লাহর খেলাফত লাভ বলে। এ অবস্থাতেই বিবেক ও আকলের পূর্ণ শুদ্ধি হয়ে যায়।
তাফসিরে মাজহারিতে কাজি সানাউল্লাহ পানিপথি রহ: কলবের ব্যাখ্যা লিখেছেন : ‘কলব এমন একটি বিষয়, যা বোধ ও জ্ঞান অর্থে ব্যবহৃত হয়। আর কলবের রোগ হলো মূর্খতা, হিংসা, কুফর ও মন্দ ধারণা বা বদ আকিদাহ (ভুল বিশ্বাস)।’ (তাফসিরে মাজহারি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৩ ও ২৬)
আল্লামা মাহমুদ আলুছি বাগদাদি রহ: তার বিখ্যাত তাফসির গ্রন্থ রুহুল মাআনিতে কলবের ব্যাখ্যা লিখেছেন : ‘আর কলব বলা হয় আল্লাহ প্রদত্ত আলোকিত জ্ঞানী সত্তাকে, যা আল্লাহর নুর অবতরণের স্থল, মানুষের কারণেই মানুষ পদবাচ্য হয়, এর দ্বারাই মানুষ নির্দেশ পালন ও নিষেধ বর্জনে সক্ষম হয়। বহু মুহাক্কিকিন মত দিয়েছেন যে, এই কলবই হলো জ্ঞানের উৎস, বলা হয়েছে নিশ্চয় তা হলো মস্তিষ্কে; আর তা হলো ইমানের কেন্দ্রস্থল।’ (রুহুল মাআনি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২০ ও ২২১)
তাফসিরে রুহুল বায়ান-এ শাঈখ ইসমাইল হাক্কি রহ : কলবের ব্যাখ্যা লিখেছেন, কলব হলো জ্ঞানশক্তির কেন্দ্রস্থল, যাকে বিবেক বলা হয়, আর কলব দ্বারা বোধ ও বিবেক উদ্দেশ্য হয়, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন, নিশ্চয় এর মধ্যে তাদের জন্য উপদেশ রয়েছে, যাদের ‘কালব’ আছে (অর্থাৎ ‘আকল’ আছে)। (তাফসিরে রুহুল বয়ান, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা : ৪৮)
আসুন, আমরা আমাদের কালবকে আল্লাহর স্মরণ দিয়ে পরিশুদ্ধ করি। আর এটাই আল্লাহর নির্দেশ।
যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহ্র স্মরণে যাদের কালব (চিত্ত) প্রশান্ত হয়; জেনে রাখো, আল্লাহ্র স্মরণেই কালব (চিত্ত) প্রশান্ত হয়। (সূরা রা’দ : ২৮)