কুরআনুল কারিম মহান আল্লাহ পাকের বাণী। আল্লাহ পাকের বাণী সব প্রকার সংশয়-দ্বন্দ্ব-সন্দেহ থেকে মুক্ত। আর এর প্রত্যেকটি শব্দ লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত। সুতরাং এই মহাগ্রন্থের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে কোনো প্রকার সন্দেহ-সংশয় করা বাতুলতা মাত্র। ইহলৌকিক জীবনের যেকোনো বিষয়ে প্রামাণিকতার বিষয়ে মানুষ আগ্রহী হয়ে ওঠে, চাই সেটি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান হোক কিংবা ধর্মীয় কোনো বিষয় হোক। তাই যুগ জিজ্ঞাসার প্রয়োজনে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
* আল-কুরআনের বিশুদ্ধতা ও অলৌকিক গ্রন্থের প্রামাণিকতার বিষয়ে মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, ‘এটি এমন একটি কিতাব যার মধ্যে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই, পথ প্রদর্শনকারী পরহেজগারদের জন্য।’ (সূরা বাকারা, আয়াত-০২)
‘বরং এটা মহান কুরআন, লওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ।’ (সূরা বুরুজ, আয়াত-২১, ২২)
‘আমি যাদেরকে গ্রন্থ দান করেছি, তারা তা যথাযথভাবে পাঠ করে। তারাই তৎপ্রতি বিশ্বাস করে। আর যারা তা অবিশ্বাস করে, তারাই হবে ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সূরা বাকারা, আয়াত-১২১)
‘এতদসম্পর্কে যদি তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকে যা আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, তাহলে এর মতো একটি সূরা রচনা করে নিয়ে এসো। তোমাদের সেসব সাহায্যকারীদেরকে সাথে নাও-এক আল্লাহকে ছাড়া, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো।’ (সূরা বাকারা, আয়াত-২৩)
‘আর যদি তা না পারো-অবশ্য তা তোমরা কখনো পারবে না, তাহলে সে দোজখের আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করো, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর। যা প্রস্তুত করা হয়েছে কাফেরদের জন্য।’ (সূরা বাকারা, আয়াত-২৪)
‘এরা কি লক্ষ করে না কুরআনের প্রতি? পক্ষান্তরে এটা যদি আল্লাহ ব্যতীত অপর কারো পক্ষ থেকে হতো, তবে এতে অবশ্যই বহু বৈপরীত্য দেখতে পেত।’ (সূরা নিসা, আয়াত-৮)
‘আর কুরআন সে জিনিস নয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কেউ তা বানিয়ে নেবে। অবশ্য এটি পূর্ববর্তী কালামের সত্যায়ন করে এবং সে সমস্ত বিষয়ের বিশ্লেষণ দান করে যা তোমার প্রতি দেয়া হয়েছে, যাতে কোনো সন্দেহ নেই-তোমার বিশ্বপালনকর্তার পক্ষ থেকে।’ (সূরা ইউনুস, আয়াত-৩৭)
‘মানুষ কি বলে যে, এটি বানিয়ে এনেছ? বলে দাও, তোমরা নিয়ে এসো একটিই সূরা, আর ডেকে নাও, যাদেরকে নিতে সক্ষম হও আল্লাহ ব্যতীত, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো।’ (সূরা ইউনুস, আয়াত-৩৮)
‘কিন্তু কথা হলো এই যে, তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে আরম্ভ করেছে যাকে বুঝতে, তারা অক্ষম। অথচ এখনো এর বিশ্লেষণ আসেনি। এমনিভাবে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে তাদের পূর্ববর্তীরা। অতএব, লক্ষ করে দেখ, কেমন হয়েছে পরিণতি।’ (সূরা ইউনুস)
‘বলুন, যদি মানব ও জ্বিন এই কুরআনের অনুরূপ রচনা করে আনয়নের জন্যে জড়ো হয় এবং তারা পরস্পরের সাহায্যকারী হয়; তবুও তারা কখনো এর অনুরূপ রচনা করে আনতে পারবে না।’ (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত-৮৮)
‘আমি এই কুরআনে মানুষকে বিভিন্ন উপকার দ্বারা সব রকম বিষয়বস্তু বুঝিয়েছি। কিন্তু অধিকাংশ লোক অস্বীকার না করে থাকেনি।’ (সূরা কাহফ, আয়াত-৫৪)
* কুরআনের প্রামাণিকতার ব্যাপারে মনীষীদের উক্তিÑ কুরআনের ইংরেজি অনুবাদক খ্রিষ্টান পণ্ডিত ড. সেলর কুরআন সম্পর্কে অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, ‘কুরআনের ন্যায় এমন সুগভীর অর্থবহ গ্রন্থ মানব রচনার বহির্ভূত। কুরআন একটি জীবন্ত মুজিজাসদৃশ গ্রন্থ। যেই মুজিজা মৃতকে জীবিত করার চাইতেও বিস্ময়কর।’
ভারতের বিশ্ব বিখ্যাত পণ্ডিত মিসেস সরোজিনি নাইডু বলেন, ‘ন্যায়পরায়ণতা ইসলাম ধর্মের এক অপূর্ব আদর্শ। আমি কুরআন অধ্যায়ন করে এতে জীবনের প্রগতিশীল ব্যবস্থাই লক্ষ করেছি সর্বাধিক। সমগ্র বিশ্ব উপযোগী বাস্তব জীবনের ন্যায়নীতিই এতে লক্ষ করেছি বেশি।’
এফ এফ আর্বুথন্ট বলেন, ‘কুরআন অতি উৎসাহী অনুবাদক এবং বহু বিকৃতকারকে উপেক্ষা করে এ পর্যন্ত অপরিবর্তিত অবস্থায় অবিকৃত রয়েছে। কেননা স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তাঁর পবিত্র কুরআনের ভাষায় ঘোষণা করেছেন, ‘আমিই এই কুরআন নাজিল করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।’
ডেভিড উয়োহার্টি বলেন, ‘বিশ্ব মানবমণ্ডলী নিজেরা পুরোপুরি অনুসন্ধান চালিয়ে দেখুক। পড়ুক তারা পবিত্র কুরআন। বুঝতে চেষ্টা করুক, তখন তারা পেতে পারে সেই শান্তি, সবাই যার অনুসন্ধান করছেন।’ (গ্রন্থ দ্য স্পিরিট অব দ্য ইস্ট)
প্রফেসর এলভি ভিজিলিয়েনের কুরআন সম্পর্কে মন্তব্য, ‘কুরআন কখনো মুহাম্মদের নিজ মনের রচনা নয়। গ্রন্থটি আল্লাহ কর্তৃক তার নিকট অবতীর্ণ হয়েছে। গ্রন্থটি পদ্ধতিতে নিখুঁত হওয়া ছাড়াও বক্তব্যের অনুকরণ বহির্ভূত বলে প্রমাণিত। কুরআনের উৎস থাকতে পারে কেবল তাঁরই মধ্যে যার জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত আরশ ও মাটিতে যা কিছু আছে সব কিছুর।’
শিখ জাতির ধর্মীয় নেতা গুরু নানক বলেন, ‘বেদ পুরানের যুগ চলে গেছে, এখন বিশ্ব পরিচালনার জন্য পবিত্র কুরআনই একমাত্র গ্রন্থ। মানুষ অবিরত ব্যাকুল এবং নরকে যাওয়ার কারণ ইসলামের নারীর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধহীনতা নেই।’
নেপোলিয়ান বোনাপার্ট বলেন, ‘আমি প্রশংসা করছি আমার স্রষ্টার এবং আমার শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে পবিত্র নবী ও পবিত্র কুরআনের প্রতি। কেননা আমার বিশ্বাস, সেই সময় খুব বেশি দূরে নয়, যখন সব কয়টি দেশের বিজ্ঞ ও শিক্ষিত লোকদের আমি ঐক্যবদ্ধ করতে পারব এবং পবিত্র কুরআনের নীতিমালাই একমাত্র পরম সত্য। আর যে নীতিমালা মানুষকে একমাত্র স্বস্তির পথে পরিচালিত করতে সক্ষম, সেসব নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে একই সমরূপ মানুষের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবো।’
এডওয়ার্ড গিবন বলেন, ‘কুরআন আল্লাহর অদ্বিতীয়ত্বের গৌরবময় সাক্ষ্য।’ (গ্রন্থ-দি ডিক্লাইন অ্যান্ড ফল অব রোমান এম্পায়ার)
স্যার উইলিয়াম ম্যুর পবিত্র কুরআনের ওপর অভিমত রেখেছেন, ‘ধর্মের ব্যাপারে যেমন, নীতিতত্ত্ব ও বিজ্ঞানের সমুদয় ব্যাপারেও ঠিক তেমনই সমভাবে একমাত্র কুরআনই চূড়ান্ত এবং এর বেশির ভাগ বাক্য এতই সুস্পষ্ট যে, প্রতিযোগী সাম্প্রদায়িকদেরও তাতে প্রশ্নের কোনো অবকাশ থাকছে না।’ (গ্রন্থ-দ্য লাইফ অব মুহাম্মদ)
তিনি আরো বলেন, ‘কুরআনের সংগ্রাহকরা কুরআনের কোনো অংশ, বাক্য বা শব্দ বাদ দিয়েছেন এমন কথা কখনো শোনা যায়নি। আবার কুরআনে এমন কোনো বাক্যেরও সন্ধান পাওয়া যায়নি যা বাইরে থেকে কুরআনে প্রবেশ করেছে। যদি এমন হতো তাহলে অবশ্যই হাদিস গ্রন্থে তার উল্লেখ থাকত, যা থেকে সামান্য বিষয়ও বাদ পড়েনি।’ (এ ছাড়া এটা সম্ভবও নয়, কেননা অসংখ্য হাফেজ কুরআন হিফজ করে রেখেছিলেন)
ইমানুয়েল ডাম বলেন, ‘একটিমাত্র গ্রন্থ (আল কুরআন) যার সাহায্যে আরবরা মহান আলেকজান্ডার অপেক্ষা এবং রোম সাম্রাজ্য অপেক্ষা পৃথিবীর বৃহত্তম ভূ-ভাগ জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। রোমে যত শতক বছর লেগেছিল তার জন্য জয় সম্পন্ন করতে, আরবদের লেগেছিল তত দশক। এরই (কুরআনের) সমস্ত সেমেটিক জাতির মধ্যে কেবল আরবরাই এসেছিলেন ইউরোপে। রাজার বেশে এবং সেখানে ফিনিসিয়রা এসেছিল, বণিকরূপে আর ইহুদিরা এসেছিল পলাতক কিংবা বন্দীরূপে।’
পাশ্চাত্য পণ্ডিত স্যার ডায়মন্ডবার্স বলেন, ‘কুরআনের বিধানাবলি শাহানশাহ থেকে শুরু করে কুটিরে বসবাসকারী পর্যন্ত সবার জন্যই সমান উপযোগী ও কল্যাণকর। বিশ্বের অন্য কোনো ব্যবস্থায় এর বিকল্প খুঁজে পাওয়া একেবারেই অসম্ভব।’ গিবন বলেন, ‘জীবনের প্রতিটি শাখায় কার্যকরী বিধান কুরআনে মজুদ রয়েছে।’
জর্জ সেল বলেন, ‘নিঃসন্দেহে কুরআন আরবি ভাষায় সর্বোত্তম এবং বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ। কোনো মানুষের পক্ষেই এ ধরনের একটি অলৌকিক গ্রন্থ রচনা করা কিছুতেই সম্ভব নয়। কুরআন মৃতকে জীবিত করার চাইতেও শ্রেষ্ঠ মুজিজা। একজন নিরক্ষর ব্যক্তি কী করে এ ধরনের ত্রুটিমুক্ত ও নজিরবিহীন বাক্যাবলির রচনা করতে পারে তা ভাবতেও আশ্চর্য লাগে।’
বিখ্যাত খ্রিষ্টান ঐতিহাসিক বাডল বলেন, ‘কেবল কুরআনই এমন একটি গ্রন্থ যাতে এক হাজার ৩০০ বছরের ব্যবধানেও কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। ইহুদি ও খ্রিষ্টান ধর্মের এমন কোনো নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ নেই, যা আদৌ কোনো দিক থেকে কুরআনের সমকক্ষ হতে পারে।’
জানফাস এই বলে কুরআন সম্পর্কে উক্তি করেছেন যে, ‘প্রাচীন আরবিতে অবতীর্ণ কুরআন অত্যন্ত মনোরম ও আকর্ষণীয়। কুরআনের বাক্যবিন্যাস পদ্ধতি ও প্রকাশভঙ্গি খুবই মনোমুগ্ধকর। কুরআনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাক্যগুলোতে যে বলিষ্ঠ ও শক্তিশালী যুক্তির অবতারণা করা হয়েছে, তা খুবই বিস্ময়কর। কুরআনের গর্ব যারা অন্য কোনো ভাষায় যথাযথ প্রকাশ করা খুবই কঠিন।’ (গ্রন্থ-দ্য ইউসডম অব দ্য কুরআন)