কিস্তিভিত্তিক ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতি : বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ কৃষিখামার ও শিল্প-কারখানার জন্য কাঁচামাল এবং হালকা ও ভারী যন্ত্রপাতি ক্রয় করে তা ওইসব কারখানায় বিক্রয় করে থাকে। এ ধরনের বিনিয়োগের শর্তাবলি হলোÑ
ক. কাঁচামালের পরিমাণ একটা উৎপাদন চক্রের জন্য যা প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি হতে পারবে না; খ. কাঁচামালের ক্ষেত্রে ব্যাংকের বিনিয়োগ পরিশোধের সময়কাল এক বছরের বেশি হতে পারবে না; গ. পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে কস্ট-প্লাস ভিত্তিতে; ঘ. যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে ব্যাংকের বিনিয়োগ পরিশোধের সময়কাল ওইসব যন্ত্রপাতির ব্যবহারিক জীবনের চেয়ে বেশি হবে না; গণনা শুরু হবে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় তার ব্যবহার শুরুর তারিখ থেকে। যন্ত্রপাতির ব্যবহারিক জীবনকাল নির্ধারণ করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ঙ. আবাসিক গৃহায়ন প্রকল্পেও ব্যাংক কিস্তিভিত্তিক বিনিয়োগ প্রদান করে থাকে।
ভাড়া-ক্রয়ভিত্তিক বিনিয়োগ পদ্ধতি : ইরানি ব্যাংকগুলো শিল্পের যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রয় করে শিল্প-কারখানায় ভাড়া দিয়ে থাকে। শর্ত হলোÑ ক. চুক্তির সময় সংশ্লিষ্ট শিল্প-কারখানাকে এ মর্মে অঙ্গীকার করতে হবে যে, সে চুক্তির মেয়াদ শেষে ওই প্রপার্টি কিনে নেবে; খ. এই লেনদেনের সময়কাল ওইসব যন্ত্রপাতির ব্যবহারিক জীবনের চেয়ে বেশি হবে না; গ. যেসব যন্ত্রপাতির দুই বছরের কম সেসব যন্ত্রপাতির জন্য এ প্রকার বিনিয়োগ প্রযোজ্য হবে না।
জুআলা (কমিশনভিত্তিক) বিনিয়োগ পদ্ধতি : এই পদ্ধতিতে ব্যাংক গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সেবা দিয়ে থাকে। বিনিময়ে কমিশন বা ফি আদায় করে। প্রদত্ত সেবার জন্য কী পরিমাণ কমিশন বা ফি আদায় করা হবে তা চুক্তি স্বাক্ষরকালেই নির্ধারণ করে নিতে হয়।
মুজারাআ (ফসলের জমি বর্গাচাষ) বিনিয়োগ পদ্ধতি : ইরানের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের মালিকানাধীন বা দখলে থাকা জমি চাষাবাদের জন্য কৃষকদের দিতে পারে। সেটা করতে হয় একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য। জমি থেকে যে ফসল উৎপাদিত হবে তার কত ভাগ কে পাবে তা চুক্তিকালেই ঠিক করে নিতে হয়। এ ধরনের চাষাবাদে ব্যাংক প্রয়োজনে বীজ ও সার সরবরাহ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে উৎপাদিত ফসলে ব্যাংকের শেয়ার বেশি হয়ে থাকে। মুজারাআ চুক্তির বিষয়বস্তু হলো শস্য ও ফসল।
মুসাকাত (বাগান বর্গাচাষ) বিনিয়োগ পদ্ধতি : বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নিজেদের মালিকানায় বা দখলে থাকা ফলের বাগান বা গাছ-গাছালি সেচ ও পরিচর্যার জন্য কৃষক বা মালিদের দিতে পারে। সেটা করতে হয় একটা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য। বাগান বা গাছ-গাছালি থেকে যে ফল বা ফসল উৎপাদিত হয় তার কত অংশ কে পাবে তা আগেই চুক্তি মারফত ঠিক করে নিতে হয়। মুসাকাত চুক্তির বিষয়বস্তু হলো গাছ।
কর্জে হাসানা বিনিয়োগ পদ্ধতি : কর্জে হাসানা দেয়ার জন্য ইরানের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের সম্পদের একটা অংশ বরাদ্দ রাখতে বাধ্য। কর্জে হাসানা বা কল্যাণ-ঋণের হকদার হলো ক্ষুদ্র উৎপাদনকারী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক কৃষক, যাদের পক্ষে বিকল্প অর্থায়ন বা কার্যকরী মূলধন জোগাড় করা সম্ভব নয়। ছোট ছোট ব্যবসায়ী ও কৃষক ছাড়াও গরিব ভোক্তারা কর্জে হাসানা পেয়ে থাকেন। কর্জে হাসানা ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে ব্যাংক শুধু তার প্রশাসনিক খরচ উসুল করে থাকে।
সরাসরি বিনিয়োগ : ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যেকোনো আর্থিক কারবারে সরাসরি বিনিয়োগ করতে পারে। সরাসরি বিনিয়োগে অংশগ্রহণের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে কতগুলো শর্ত মেনে চলতে হয়। যেমনÑ ক. বিলাসদ্রব্য ও অপ্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত কোনো প্রকল্পে অংশগ্রহণ করা যাবে না; খ. প্রকল্পের প্রাথমিক তহবিল মোট প্রয়োজনীয় তহবিলের ৪০ শতাংশের কম হতে পারবে না; গ. প্রকল্পের পুরো ফিক্সড ক্যাপিটাল আসতে হবে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সম্পদ থেকে; ঘ. কোনো প্রকল্পে সরাসরি বিনিয়োগ করার আগে প্রকল্পটি ভালোভাবে মূল্যায়ন ও যাচাই করতে হবে। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত ন্যূনতম মুনাফা অর্জন নিশ্চিত হতে হবে; ঙ. প্রকল্পে ব্যাংক নিজের তহবিল কত ও ডিপোজিটরের তহবিল কত বিনিয়োগ করেছে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে হবে; চ. বিনিয়োগকৃত প্রকল্পটি উৎপাদন শুরু করার পর ব্যাংক তার শেয়ার জনগণের কাছে বিক্রি করে দিতে পারবে এবং ছ. বাণিজ্যিক ব্যাংক কর্তৃক সরাসরি বিনিয়োগকৃত প্রকল্পগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক অডিট করতে পারবে।
এ ছাড়া ইরানের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এক বছরেরও কম সময়ে মেয়াদ পূর্ণ করবে এমন ডেট ইনস্ট্রুমেন্টগুলো ক্রয় করতে পারে। শর্ত হলোÑ ডেট ইনস্ট্রুমেন্টটি বাস্তব সম্পদের বিপরীতে ইস্যুকৃত হতে হবে।
ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ব্যাংক মারকাজি’র কর্তৃত্ব : ক. বিভিন্ন প্রকার ব্যাংক আমানতের বিপরীতে বিধিবদ্ধ সঞ্চিতি সংরক্ষণ; খ. মুদারাবা ও মুশারাকা কারবারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সর্বনি¤œ ও সর্বোচ্চ কত ভাগ মুনাফা নিতে পারবে তা নির্ধারণ; গ. ট্রাস্টি হিসাবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যেসব বিনিয়োগ হিসাব পরিচালনা করে তার ওপর সে সর্বোচ্চ কত পার্সেন্ট কমিশন আদায় করতে পারবে তা নির্ধারণ ইত্যাদি।
ইরানের নয়া আর্থিক নীতি : ক. ন্যূনতম অনুমিত মুনাফা হার : অনুমিত মুনাফা হলো কোনো ব্যাংকিং অপারেশন হতে উদ্ভূত ভবিষ্যৎ নিট ইনকাম। এটা হলো কোনো প্রকল্পে ব্যাংক বিনিয়োগ করবে কি করবে না তার মানদণ্ড। কোনো বিনিয়োগ প্রস্তাব পর্যালোচনা করে যদি তার সম্ভাব্য মুনাফার হার এমএআরআরের সমান বা বেশি পাওয়া যায় তবেই সেই প্রকল্পে ব্যাংক বিনিয়োগ করতে পারবেÑ অন্যথায় নয়।
খ. সর্বোচ্চ মুনাফা হার : আর্থিক নীতিনির্ধারণী কর্তৃপক্ষই ঠিক করে দেয় সর্বোচ্চ মুনাফা হার। ইরানের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো গ্রাহকের কাছে কোনো এসেট বা পণ্য বিক্রি করে তার মূল্যের ওপর কত পার্সেন্ট লাভ করবে তা নির্ধারণ করে দেয় এই এমআরপি।