মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ১১:০১ অপরাহ্ন

ইসলামের দৃষ্টিতে মূর্তি ও ভাস্কর্য

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ৬৬ জন নিউজটি পড়েছেন

আজকাল রাস্তা-ঘাটসহ প্রায় জায়গায় বিভিন্ন আকৃতির মূর্তি ও মানুষের ভাস্কর্য দেখা যায়। আর এটা কত বড় পাপ সে সম্পর্কে আমরা সবাই জানলেও তার গুরুত্ব দেই না। ইসলাম এ সম্পর্কে বলেছে, কোনো প্রাণীর-মূর্তি নির্মাণ করা বা ঘরে রাখা ইসলামী শরিয়তে কঠিন কবিরা গুনাহ ও হারাম। মূর্তি সংগ্রহ, মূর্তি সংরক্ষণ এবং মূর্তির বেচাকেনা ইত্যাদি সব বিষয় কঠিনভাবে নিষিদ্ধ। মূর্তি ও ভাস্কর্যের মধ্যে বিধানগত কোনো পার্থক্য নেই। ইসলামের দৃষ্টিতে মূর্তি ও ভাস্কর্য দুটোই পরিত্যাজ্য। কুরআন মজিদ ও হাদিস শরিফে এ প্রসঙ্গে যে শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলো মূর্তি ও ভাস্কর্য দু’টিকেই নির্দেশ করে। এ প্রসঙ্গে কুরআন মজিদে রয়েছেÑ ‘তোমরা পরিহার করো অপবিত্র বস্তু অর্থাৎ মূর্তিসমূহ এবং পরিহার করো মিথ্যাকথন।’ (সূরা হজ : ৩০)
এই আয়াতে পরিষ্কারভাবে সব ধরনের মূর্তি পরিত্যাগ করার এবং মূর্তিকেন্দ্রিক সব কর্মকাণ্ড বর্জন করার আদেশ দেয়া হয়েছে।
আরো লক্ষণীয় বিষয় এই যে, ওপরের আয়াতে সব ধরনের মূর্তিকে ‘রিজস’ শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘রিজস’ অর্থ নোংরা ও অপবিত্র বস্তু। বোঝা যাচ্ছে, মূর্তির সংশ্রব পরিহার করা পরিচ্ছন্ন ও পরিশীলিত রুচিবোধের পরিচায়ক।
অন্য আয়াতে কাফের সম্প্রদায়ের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছেÑ ‘এবং তারা বলেছিল, তোমরা কখনো পরিত্যাগ করো না তোমাদের উপাস্যদেরকে এবং কখনো পরিত্যাগ করো না ওয়াদ্দ, সুওয়া, ইয়াগুছ, ইয়াউক ও নাসরকে।’ (সূরা নূহ : ২৩)
এখানে কাফের সম্প্রদায়ের দু’টি বৈশিষ্ট্য উল্লিøখিত হয়েছেÑ ১. মিথ্যা উপাস্যদের পরিত্যাগ না করা; ২. মূর্তি ও ভাস্কর্য পরিহার না করা। তাহলে মিথ্যা উপাস্যের উপাসনার মতো ভাস্কর্যপ্রীতিও কুরআন মজিদে কাফেরদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত। অতএব এটা যে ইসলামে গর্হিত ও পরিত্যাজ্য তা তো বলাই বাহুল্য। উপরের আয়াতে উল্লিøখিত মূর্তিগুলো সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: বলেন, ‘এগুলো হচ্ছে নূহ আ:-এর সম্প্রদায়ের কিছু পুণ্যবান লোকের নাম। তারা যখন মৃত্যুবরণ করেছে তখন শয়তান তাদের সম্প্রদায়কে এই কুমন্ত্রণা দিয়েছে যে, তাদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোতে মূর্তি স্থাপন করা হোক এবং তাদের নামে সেগুলোকে নামকরণ করা হোক। লোকেরা এমনই করল। ওই প্রজন্ম যদিও এসব মূর্তির পূজা করেনি কিন্তু ধীরে ধীরে প্রকৃত বিষয় অস্পষ্ট হয়ে গেল এবং পরবর্তী প্রজন্ম তাদের পূজায় লিপ্ত হলো।’ (সহিহ বুখারি হাদিস : ৪৯২)
কুরআন মজিদে মূর্তি ও ভাস্কর্যকে পথভ্রষ্টতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এক আয়াতে এসেছেÑ ‘ইয়া রব, এরা (মূর্তি ও ভাস্কর্য) অসংখ্য মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছে!’ (সূরা ইবরাহিম : ৩)
কুরআনের ভাষায় মূর্তি ও ভাস্কর্য হলো বহুবিধ মিথ্যার উৎস। ইরশাদ হয়েছেÑ ‘তোমরা তো আল্লøাহর পরিবর্তে উপাসনা করো (অসার) মূর্তির এবং তোমরা নির্মাণ করো মিথ্যা।’ (সূরা আনকাবুত : ১৭) মূর্তি ও ভাস্কর্য যেহেতু অসংখ্য মিথ্যার উদ্ভব ও বিকাশের উৎস তাই ওপরের আয়াতে একে ‘মিথ্যা’ বলে উল্লেøখ করা হয়েছে।
এই আয়াতগুলো থেকে পরিষ্কার জানা যাচ্ছে, মূর্তি ও ভাস্কর্য দু’টিই সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য।
হাদিস শরিফেও নবী করিম সা: মূর্তি ও ভাস্কর্য সম্পর্কে পরিষ্কার বিধান দিয়েছেন।
১. হজরত আমর ইবনে আবাসা রা: থেকে বর্ণিত, নবী করিম সা: বলেন ‘আল্লাহ তায়ালা আমাকে পাঠিয়েছেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার, মূর্তিসমূহ ভেঙে ফেলার এবং এক আল্লাহর ইবাদত করার ও তাঁর সাথে অন্য কোনো কিছুকে শরিক না করার বিধান দিয়ে।’ (সহিহ মুসলিম হাদিস-৮৩২)
২. আবুল হাইয়াজ আসাদি বলেন, আলী ইবনে আবি তালেব রা: আমাকে বললেন, ‘আমি কি তোমাকে ওই কাজের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করব না, যে কাজের জন্য নবী সা: আমাকে প্রেরণ করেছিলেন? তা এই যে, তুমি সব প্রাণীর মূর্তি বিলুপ্ত করবে এবং সব সমাধিসৌধ ভূমিসাৎ করে দেবে।’ অন্য বর্ণনায় এসেছে, … এবং সব চিত্র মুছে ফেলবে।’ (সহিহ মুসলিম হাদিস-৯৬৯)
৩. আলী ইবনে আবি তালেব রা: বলেন, নবী করিম সা: একটি জানাজায় উপস্থিত ছিলেন। তখন তিনি বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে কে আছে, যে মদিনায় যাবে এবং যেখানেই কোনো প্রাণীর মূর্তি পাবে তা ভেঙে ফেলবে, যেখানেই কোনো সমাধিসৌধ পাবে তা ভূমিসাৎ করে দেবে এবং যেখানেই কোনো চিত্র পাবে তা মুছে দেবে?’ আলী রা: এই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত হলেন। এরপর নবী সা: বলেছেন, ‘যে কেউ পুনরায় উপরোক্ত কোনো কিছু তৈরি করতে প্রবৃত্ত হবে সে মুহাম্মদের প্রতি নাজিলকৃত দ্বীনকে অস্বীকারকারী।’ (মুসনাদে আহমাদ হাদিস-৬৫৭)
৪. উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা: বলেন, নবী সা:-এর অসুস্থতার সময় তাঁর জনৈকা স্ত্রী একটি গির্জার কথা উল্লেখ করলেন। গির্জাটির নাম ছিল মারিয়া। উম্মে সালামা ও উম্মে হাবিবা ইতঃপূর্বে হাবশায় গিয়েছিলেন। তারা গির্জাটির কারুকাজ ও তাতে বিদ্যমান প্রতিকৃতিগুলোর কথা আলোচনা করলেন। নবী সা: শয্যা থেকে মাথা তুলে বললেন, ‘ওই জাতির কোনো পুণ্যবান লোক যখন মারা যেত তখন তারা তার কবরের ওপর ইবাদতখানা নির্মাণ করত এবং তাতে প্রতিকৃতি স্থাপন করত। এরা হচ্ছে আল্লাহর নিকৃষ্টতম সৃষ্টি।’(সহিহ বুখারি হাদিস-১৩৪১)
৫. আবদুুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা: থেকে বর্ণিতÑ রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, প্রতিকৃতি তৈরিকারী (ভাস্কর, চিত্রকর) শ্রেণী হলো ওইসব লোকদের অন্তর্ভুক্ত যাদের কিয়ামত-দিবসে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে।’ (সহিহ বুখারি হাদিস-৫৯৫০)
৬. আবু হুরায়রা রা: নবী সা: থেকে বর্ণনা করেছেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ওই লোকের চেয়ে বড় জালেম আর কে, যে আমার সৃষ্টির মতো সৃষ্টি করার ইচ্ছা করে। তাদের যদি সামর্থ্য থাকে তবে তারা সৃজন করুক একটি কণা এবং একটি শস্য কিংবা একটি যব!’ (সহিহ বুখারি হাদিস-৫৯৫৩)
৭. আবদুুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: বলেন, আমি মুহাম্মদ সা:কে বলতে শুনেছি, ‘যে কেউ দুনিয়াতে কোনো প্রতিকৃতি তৈরি করে কিয়ামত-দিবসে তাকে আদেশ করা হবে, সে যেন তাতে প্রাণসঞ্চার করে অথচ সে তা করতে সক্ষম হবে না।’ (সহিহ বুখারি হাদিস-৫৯৬৩) এই কুরআনের আয়াত ও হাদিসগুলো থেকে প্রমাণিত হয়, ভাস্কর্য নির্মাণ অত্যন্ত কঠিন কবিরা গুনাহ। আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা কুফরিরও পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English