মুসলিম নামের জনগোষ্ঠীএকটি বিরাটসংখ্যক মানুষ এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষ প্রায় শতভাগই মনে করে, ইসলাম একটি ধর্মের নাম এবং আরবের নবী মুহাম্মদ সা: এই ধর্মের প্রবর্তক। আর যারা ইসলাম ধর্মের অনুসারী তাদেরই মুসলিম বলা হয়। বলা যায় এটি একটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা। কিন্তু আসলে কি এটি ঠিক?
প্রায় চার হাজার বছর আগের কথা। প্রাচীন ইরাকের এক দোর্দণ্ড প্রতাপশালী বাদশাহ, ইতিহাসে যার পরিচিতি ‘নমরুদ’ নামে। তার নেতৃত্বে গোটা জাতিই মূর্তিপূজায় লিপ্ত। এ সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল ‘উর’ নগরী। এখানেই জন্ম নিয়েছিলেন আল্লাহর এক বান্দাহ ইবরাহিম আ:। তিনি এমন এক প্রেরিত মহাপুরুষ যিনি আল্লাহর বন্ধু বা ইবরাহিম খলিলুল্লøাহ নামেই বিখ্যাত। বর্তমান বিশ্বের প্রধান তিনটি একেশ্বরবাদী ধর্ম অর্থাৎ ইসলাম, খ্রিষ্ট ধর্ম এবং ইহুদি ধর্মের অনুসারীরা তাঁকে আল্লাহর প্রেরিত নবী হিসেবে স্বীকার করে।
বাপ-চাচাসহ গোটা জাতির এই মূর্তিপূজা ইবরাহিম আ: মোটেই বরদাশত করতে পারলেন না। তিনি জাতিকে বোঝাতে লাগলেন, ‘এই মূর্তিগুলোর কোনো ক্ষমতা নেই এবং এগুলো নিতান্তই মানুষের হাতে গড়া অক্ষম কিছু মূর্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু দেশবাসী তাদের বাদশাহ নমরুদের নেতৃত্বে ইবরাহিম আ:কে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করল। আল্লøাহর রহমতে আগুন তাকে পুড়ল না। অবশেষে বাপ-দাদার বাস্তুভিটা ত্যাগ করতে বাধ্য হলেন কিন্তু মূর্তিপূজার সাথে আপস করলেন না। তিনি চলে গেলেন ফিলিস্তিনের হেবরন অঞ্চলে। আল্লøাহর নির্দেশে শিশুপুত্র ইসমাইল এবং স্ত্রী হাজেরাকে পুনর্বাসিত করলেন হেজাজের এক জনমানবহীন ঊষর মরুতে এবং তাদেরকে কেন্দ্র করেই সেখানে গড়ে উঠল মক্কা নগরী। এখানেই বাপ-বেটা নির্মাণ করলেন আল্লাহর ঘর তথা বাইতুল্লাহ।
যখন কাবার দেয়াল উঁচু করছিলেন তখন তারা আল্লাহর কাছে দোয়া করছিলেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের উভয়কে তোমার একান্ত অনুগত মুসলিম বানাও এবং আমাদের বংশধরদের মধ্য থেকে তোমার এক অনুগত মুসলিম উম্মাহ গঠন করো, আমাদের ইবাদতের নিয়মকানুন বলে দাও এবং আমাদের তাওবা কবুল করো। নিশ্চয়ই তুমি বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (সূরা আল-বাকারাহ : ১২৮)।
আল্লøাহ তায়ালা হজরত ইবরাহিমকে মানব জাতির হিদায়াতের জন্য মনোনীত করলেন এবং তাকে আত্ম সমর্পণের নির্দেশ দিলেন। তিনি আল্লাহর নিকট আত্ম সমর্পণের ঘোষণা দিলেন। দেখুন আল-কুরআনের শব্দচয়নটা কেমন ছিল! যখন তার প্রতিপালক তাকে বললেন, ‘তুমি আত্মসমর্পণ করো, তখন তিনি বললেনÑ আমি বিশ্ব জাহানের প্রতিপালকের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম’ (সূরা আল বাকারাহ : ১৩১)।
এবার চোখ ফিরানো যাক আরেকটি দৃশ্যের দিকে। হজরত ইবরাহিম আ:-এর দৌহিত্র হজরত ইয়াকুব আ: মৃত্যুশয্যায়। তার ১২টি পুত্রসন্তান যার মধ্যে নবী হজরত ইউসুফ আ: একজন ছিলেন। ছেলেদের কাছে ডাকলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমার মৃত্যুর পর তোমরা কার ইবাদত করবে?’ তারা বলল, আমরা আপনার ইলাহ এবং আপনার পূর্বপুরুষ ইবরাহিম, ইসমাইল ও ইসহাকের ইলাহের ইবাদত করব। তিনিই একমাত্র ইলাহ এবং আমরা তাঁর অনুগত মুসলিম’ (সূরা আল বাকারাহ : ১৩৩ )।
এখন এ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই করা যায় যে, ইসলাম যদি মুহাম্মদ সা:-এর প্রবর্তিত ধর্ম হয় এবং সেই ধর্মের অনুসারীকে মুসলিম বলা হয়, তা হলে তাঁর জন্মের প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ইবরাহিম আর ইসমাইল আ: নিজেদেরকে ‘মুসলিম’ হিসেবে কবুল করার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন কিভাবে? কেমন করে হজরত ইয়াকুব আ:-এর সন্তানরা বলেন যে, ‘আমরা তাঁর অনুগত মুসলিম?
আমরা অনুসন্ধান করে দেখি ইসলাম আর মুসলিম বিষয়টি কী? ভাষাগতভাবে ইসলাম শব্দটি আরবি তিনটি অক্ষর সিন, লাম, মিমের সমষ্টি। এটির মূল ধাতু সলম যার অর্থ আত্মসমর্পণ করা, বাধ্য হওয়া, অনুগত হওয়া ইত্যাদি। এই মূল থেকে একাধিক শব্দ তৈরি হয় যেমনÑ আসলামা-আত্মসমর্পণ করেছে, অনুগত হয়েছে। আসলেম-আত্মসমর্পণ করো, অনুগত হও। মুসলিম-আত্মসমর্পিত, অনুগত ইত্যাদি। আল-কুরআনে এ সব অর্থে এ শব্দটি অসংখ্য স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে।
‘তারা কি আল্লাহর দ্বীনকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো দ্বীন (আনুগত্যের বিধান) চায়? অথচ আসমান ও জমিনের সব কিছুই ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে এবং তাঁরই কাছে তাদের ফিরে যেতে হবে’ (সূরা আল ইমরান : ৮৩)। এখানে আসলামা শব্দটি সিন লাম মিম বা সলম থেকে এসেছে, যার অর্থ আত্মসমর্পণ করেছে বা অনুগত হয়েছে।
‘এবং তিনি বললেন (ইবরাহিমকে) আত্মসমর্পণ করো; জবাবে (ইবরাহিম) বললেন, ‘আমি বিশ্বজাহানের প্রতিপালকের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম (অনুগত) হলাম’ (সূরা আল বাকারাহ : ১৩১)। ‘সম্রাজ্ঞী বললেন (সাবার রানী), ‘হে আমার প্রভু! নিশ্চয়ই আমি নিজের ওপর জুলুম করেছি এবং আমি সুলায়মানের সাথে মহাবিশ্বের প্রতিপালকের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম’ (সূরা আন নমল : ৪৪ )।
সুলায়মান আ: সাবার রানীর কাছে চিঠি লিখেছিলেন। আল-কুরআন কারিমে যে ভাষায় তা বর্ণিত হয়েছে আমরা একটু লক্ষ করি। তিনি লিখেছিলেনÑ ‘পত্রটি সুলায়মানের পক্ষ থেকে এবং তা হলো পরম দয়াময় আল্লøাহর নামে। আমার বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শন করো না এবং আত্মসমর্পণ করে (বশ্যতা স্বীকার করে) আমার দরবারে উপস্থিত হও’ (সূরা আন নমল : ৩০-৩১ )।
‘ইবরাহিম তো ইহুদিও ছিলেন না আর খ্রিষ্টানও ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান মুসলিম এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না’ (সূরা আল ইমরান : ৬৭)।
কুরআনুল কারিমে বর্ণিত উল্লিøখিত ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে আয়াত কয়টির ভাষা ও ভাব থেকে আমরা সহজেই অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি যে, ইসলামের প্রবর্তক স্বয়ং আল্লøাহ রাব্বুল আলামিন এবং সব নবী-রাসূলের ধর্মই ছিল ইসলাম বা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ। মুহাম্মদ সা: কোনো নতুন ধর্ম প্রচার করেননি, বরং হজরত আদম থেকে যত নবী-রাসূল দুনিয়ায় এসেছেন সবাই ইসলাম তথা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের দাওয়াত দিয়েছেন আর তাদের মতোই দাওয়াত দিয়েছেন নবী মুহাম্মদ সা:। তবে হ্যাঁ, তার মাধ্যমে ইসলামের পূর্ণতা সাধিত হয়েছে এবং নবী-রাসূল আগমনের ধারাটি সমাপ্ত হয়েছে। তার কাছে প্রেরিত আসমানি কিতাব ‘কুরআনুল কারিম অবিকৃত অবস্থায় সংরক্ষিত আছে যা মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ পথপ্রদর্শক।