শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ০৬:৪৭ অপরাহ্ন

উচ্চ মাধ্যমিকের পাঠ্যবই নিয়ে নানা কারসাজি

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২০
  • ৫১ জন নিউজটি পড়েছেন

একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ক্লাস অবশেষে নির্ধারিত সময়ের তিন মাস পর আজ শুরু হচ্ছে। করোনার কারণে এসব শিক্ষার্থী অনলাইনে ক্লাস করবে। উচ্চ মাধ্যমিকের এসব শিক্ষার্থীর পাঠ্যবই ১ অক্টোবর বাজারে বিক্রি শুরু হয়েছে। তবে এ বই নিয়ে চলছে নানা কারসাজি। এই শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে ১৩ লাখ ছাত্রছাত্রী। কিন্তু প্রতিটি বিষয়ে ১০ লাখ বই ছাপাচ্ছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এতে প্রশ্ন উঠেছে, বাকি তিন লাখ শিক্ষার্থী বই পাবে কোথায়?

অন্যদিকে কার্যাদেশ অনুযায়ী অনুমোদিত ঠিকানায় বই মুদ্রণের কথা। কিন্তু হঠাৎ করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভিন্ন ঠিকানায়ও বই ছাপানোর সুযোগ দেয়া হয়েছে। কমসংখ্যক ও ভিন্ন ঠিকানায় বই মুদ্রণের কারণে সরকারের কয়েক লাখ টাকা রাজস্ব বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি বিভিন্ন প্রকাশক অনুমোদিত বইয়ে পৃষ্ঠা ও মূল্য বাড়িয়ে বিক্রি করছে। এতে শিক্ষার্থীদের পকেট থেকে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে কয়েক কোটি টাকা। রহস্যজনক কারণে এর বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।

জানতে চাইলে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা বলেন, এবারে বই মুদ্রণে মাত্র ছয়দিন সময় পেয়েছে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলো। অল্পসময়ে একটি স্থানে বই মুদ্রণ ও বাঁধাই শেষ করা সম্ভব হবে না বলে কেউ কেউ আবেদন করে ভিন্ন ঠিকানায় যেতে চেয়েছে। এ কারণে আলাদা ঠিকানায় যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। আর বেসরকারি তত্ত্বাবধানে থাকা বইগুলোতে সরকারের অনুমতির বাইরে পৃষ্ঠা যুক্ত করে দাম বাড়িয়ে নিচ্ছে কিনা- সেটা লোকবলের অভাবে এতদিন আমাদের পক্ষে তদারকি করা সম্ভব হয়নি।

উচ্চ মাধ্যমিকে মোট ৩৯টি বিষয়ে পাঠদান করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে ৩৫টি বইয়ের কারিকুলাম সরকার তৈরি করে দেয়। পরে সেটার আলোকে পাঠ্যবই রচনা করে বেসরকারি প্রকাশকরা এনসিটিবি থেকে অনুমোদন নিয়ে বাজারজাত করে থাকে। এর বিনিময়ে একটি ফি জমা নেয় এনসিটিবি। অন্যদিকে বাংলা, ইংরেজি, বাংলা সহপাঠ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) এই চার বিষয়ের বই সরকারিভাবে বাজারজাত করা হচ্ছে। এসব বিষয়ের কারিকুলাম ও গ্রন্থ রচনা করে এনসিটিবি। এরপর বেসরকারি প্রকাশকদের প্রণীত গ্রন্থ বাজারজাত করতে কার্যাদেশ দেয়া হয়। এর বিনিময়ে নির্দিষ্ট হারে রয়্যালটি নিয়ে থাকে সরকার। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেইে এবার ছয়টি প্রতিষ্ঠান কাজটি পেয়েছে।

রহস্যঘেরা অনুমতি : বই বাজারজাত করার চার দিন আগে হঠাৎ করে কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রকাশকদেরকে অনুমোদিত ঠিকানার বাইরে পাঠ্যবই মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে রহস্য। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, যেহেতু কমসংখ্যক বই ছাপানোর অনুমতি দেয়া হয়েছে তাই যাতে বাড়তি বই ছাপাতে পারে বা নিম্নমানের কাগজে ছাপাতে পারে সেজন্যই এনসিটিবি যোগসাজশ করে এমন নির্দেশনা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, আলাদা ঠিকানায় বা প্রতিষ্ঠানে এই ছাপানোর অনুমতি দিয়ে এনসিটিবি স্ববিরোধী কাজ করেছে। কেননা, মাধ্যমিকের ২১০ লটের বিনামূল্যের পাঠ্যবই মুদ্রণের কার্যাদেশের ক্ষেত্রে ‘সক্ষমতা’ শর্ত কঠোরভাবে পালন করেছে। এটা করতে গিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান সক্ষমতার বাইরে কাজ নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে মুদ্রণ করাতে পারে তাদের ‘নন-রেসপনসিভ’ (অযোগ্য) করেছে। ফলে দ্বিতীয় বা তৃতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে অন্তত ১২৫ লটের কাজ দিয়েছে। এটা করতে গিয়ে প্রতি লটে গড়ে ১০ লাখ টাকা করে বেশি খরচ হলেও সরকারের অন্তত সাড়ে ১২ কোটি টাকা বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে। উচ্চ মাধ্যমিকের বইয়ের মতো বাইরের প্রতিষ্ঠানে ছাপানোর অনুমতি থাকলে এই অর্থ বেশি খরচ হতো না। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, যখন যেই প্রক্রিয়ায় এনসিটিবির অসৎ কর্মকর্তাদের সুবিধা হয় তখন সেই কৌশল তারা প্রয়োগ করে। এতে গচ্চা যায় সরকারের। বিনামূল্যের ২১০ লটের কাজের ক্ষেত্রে ‘অর্ধেক তোমার-অর্ধেক আমার’ নীতি অনুসরণ হয়েছে কিনা তা তদন্ত করে দেখতে সংশ্লিষ্টরা অনুরোধ করেছেন।

এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, ঠিকানা অবহিত না করে কারও ভিন্ন স্থানে মুদ্রণের সুযোগ নেই। নতুন ঠিকানাও আমাদের তদারকির মধ্যে থাকবে। তিনি বলেন, ২১০ লটে কিছু কাজ দ্বিতীয় ও তৃতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে দিতে হয়। এতে কত টাকা ব্যয় বেড়েছে সেটা অবশ্য আমার জানা নেই।

আইসিটি সমাচার : আইসিটি বিষয়ের বই এতদিন বেসরকারিভাবে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান মুদ্রণ ও বাজারজাতের জন্য অনুমোদিত ছিল। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাম্প্রতিক এক সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ের বইও বেসরকারি প্রকাশকদের কাছ থেকে এনে সরকারি তত্ত্বাবধানে বাজারজাত করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় রহস্যজনক কারণে ভুল করে এনসিটিবি। বইটির অনুমোদন আরও এক বছর ছিল। কিন্তু তা বাতিল না করে মুদ্রণের দরপত্র দিলে ইতোপূর্বে অনুমোদন পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ‘ভয়েজার পাবলিকেশনস’ আইনের আশ্রয় নেয়। মামলা দায়েরের অনুমোদন বাতিল করলে ফের আরেক আমলা করে প্রতিষ্ঠানটি। পরে আইনি লড়াইয়ে ‘ভয়েজার’ বইটি বাজারে রাখার অনুমতি পেয়েছে দাবি করেন এর লেখক প্রকৌশলী মুজিবুর রহমান। ফলে সরকারের পাশাপাশি তার গ্রন্থটিও বাজারে থাকছে। ফলে সরকারের বইটি কতটা বিক্রি হবে সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এবারে অনুমোদন পাওয়া ছয় প্রতিষ্ঠান। নাম প্রকাশ না করে একজন প্রকাশক বলেন, এই বইয়ে তাদের বিনিয়োগ এবার গচ্ছা যেতে পারে।

বেশি পাতায় অধিক দাম : অনুসন্ধানে জানা গেছে, আইসিটি বইয়ের অনুমোদন ভয়েজার পাবলিকেশনস পেলেও কৌশলে বাজারে আরেকটি বইও ছেড়ে দিয়েছে। সেই বইটির পৃষ্ঠা বেশি এবং দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কৌশলে দ্বিতীয়টিই পাঠ্য করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের পকেট থেকে লাখ লাখ টাকা চলে যাচ্ছে। এ বিষয়ে লেখক প্রকৌশলী মুজিবুর রহমান বলেন, এনসিটিবি থেকে অনুমোদন পাওয়া বইটি অবিকৃত এবং অবিকল দামেই বাজারে আছে। তারা যেটি বাজারে ছেড়েছেন সেটি অনুশীলনমূলক বই। কলেজগুলো যদি সেটি পাঠ্যভুক্ত করে থাকে তাহলে সে দায় তাদের নয়।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, একইভাবে বেসরকারি খাতে থাকা ৩৫টি পাঠ্যবইয়েরই বিকল্প বাজারে আছে। বেশির ভাগ গ্রন্থই ভয়েজারের উল্লিখিত আইসিটি গ্রন্থের মতো পৃষ্ঠা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে দাম। এতে শিক্ষার্থীদের পকেট থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই স্তরের ১৫টি বইয়ের ওপর একটি অনুসন্ধান। এতে দেখা গেছে, এনসিটিবি অনুমোদিত আইসিটি বইয়ে গড়ে পৃষ্ঠা সংখ্যা ২২০ থেকে ২৪২। আর গত ১৪ আগস্টে বাজারে পাওয়া বইগুলোর পৃষ্ঠা সংখ্যা ৫০০ থেকে ৬৮০। পদার্থ বিজ্ঞানের প্রথমপত্রে এনসিটির অনুমোদিত বইয়ে পৃষ্ঠা ৩৩০ থেকে ৩৬৩। বাজারে পাওয়া বইয়ে পৃষ্ঠা ৬০০-৮০০। পদার্থ দ্বিতীয়পত্রে ৩৩০ থেকে ৩৬৩ পৃষ্ঠার বদলে বাজারে ৬০০-৮৫০ পৃষ্ঠার বই পাওয়া গেছে। এভাবে বাজারে আরও আছে, রসায়ন প্রথমপত্রে ২৫০-২৭৫ পৃষ্ঠার স্থলে ৫০০-৭০০; দ্বিতীয় পত্রে ২৫০-২৭৫ এর স্থলে ৬০০-৮০০ পৃষ্ঠা; জীববিজ্ঞান প্রথমপত্রে ২৩০-২৪০ এর স্থলে ৪৫০-৫০০; দ্বিতীয়পত্রে ২৩০-২৪০ এর স্থলে ৪০০-৪৫০; হিসাববিজ্ঞান প্রথমপত্রে ৩০০-৩৩০ পৃষ্ঠা বদলে ১০০০-১৩০০; দ্বিতীয়পত্রে ৩০০-৩৩০ এর স্থলে ১০০০-১৪০০; উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও বিপণন প্রথমপত্রে ২২০-২৪০ এর স্থলে ৬০০-৭২৫; দ্বিতীয়পত্রে ২০০-২২০ এর স্থলে ৬০০-৭২৫; অর্থনীতি প্রথমপত্রে ২৩০-২৪০ এর স্থলে ৪৫০-৬০০; দ্বিতীয়পত্রে ২৩০-২৪০ এর স্থলে ৪০০-৪৫০; ভূগোল প্রথপত্রে ২৫০-২৭৫ এর স্থলে ৩০০-৪০০ আর দ্বিতীয়পত্রে ২৫০-২৭৫ এর স্থলে ৩০০-৪০০ পৃষ্ঠার বই।

বাংলায় নতুনত্ব : জানা গেছে, বাংলা গ্রন্থে এবার সাতটি গদ্য ও পাঁচটি পদ্য বা কবিতা নতুন সংযোজন করা হয়েছে। প্রায় ৩০টি করে গদ্য ও পদ্য আছে এই গ্রন্থে। এর মধ্যে ১২টি করে পাঠ্যভুক্ত করা হয়েছে।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English