বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:৩৫ অপরাহ্ন

করোনাকালীন কোরবানি : আমাদের করণীয়

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২০
  • ৪১ জন নিউজটি পড়েছেন

কোরবানি আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম আ:-এর অপূর্ব আত্মত্যাগের ঘটনারই স্মৃতিবহ। তখন থেকে কোরবানির ধারা অব্যাহত রয়েছে। এ জন্য এটাকে ইবরাহিম আ:-এর সুন্নাতও বলা হয়। মুসলমানদের বড় দু’টি ধর্মীয় উৎসবের অন্যতম ঈদুল আজহা। এই ঈদে পশু কোরবানি ধর্মীয় বিধান, সামর্থ্যবানদের জন্য ওয়াজিব। হজ পালন এবং কোরবানি ঈদুল আজহা উৎসবের দু’টি বিশেষ অংশ। রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’
হজের প্রচলন শুরু হওয়ার পর থেকে অনেকবারই বিভিন্ন অনিবার্য কারণে হজ কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়নি। তবে গত ২০০ বছর পর এবারই হজ নিয়ে এক অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয় মূলত বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর কারণে। তবে, মক্কা-মদিনার পরিস্থিতির কিছুটা উন্নত হওয়ায় সীমিতসংখ্যক হাজির অংশগ্রহণে এবারের হজ অনুষ্ঠিত হবে বলে ইতোমধ্যেই জানিয়েছে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। এতে কেবলমাত্র সৌদি আরবে অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে অংশ নিতে পারবেন। নতুন করে কেউ হজ পালনের উদ্দেশ্যে দেশটিতে যেতে পারবেন না বলেও জানানো হয়।

প্রত্যেক হাজিই যেমন হজ করতে গিয়ে কোরবানি দেন তেমনি সামর্থ্যবান মুসলমানরা হজে না গিয়েও কোরবানি করেন। কোরবানি আল্লাহর রাহে নিজের সম্পদের একটি অংশ বিলিয়ে দেয়ার এক দৃপ্ত শপথের নাম। আল্লাহর কাছে কখনো জবেহকৃত পশুর গোশত ও রক্ত পৌঁছে না, পৌঁছে কেবল তাকওয়া। (সূরা হজ, আয়াত ৩) কোরবানির সাথে জড়িয়ে আছে কর্তব্যবোধ, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধে বৈশিষ্ট্য। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্প্রীতির ভাবটা এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কোরবানির গোশত গরিব আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করার যে বিধান তার মধ্যে নিহিত রয়েছে সামাজিক সমতার মহান আদর্শ।
ঈদুল আজহার উৎসবে হজ কার্যক্রমেও কোরবানি সূত্রে সমাজ ও অর্থনীতিতে বিশেষ প্রভাব ও কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রাসহ বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়ে থাকে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ থেকে এক লাখ ১০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশী হজে গিয়েছিলেন। প্রতিজন গড়ে তিন লাখ টাকা ব্যয় নির্বাহ করলে এ খাতে মোট অর্থ ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় তিন হাজার ৩০০ কোটি টাকা, যা ডলারের হিসেবে ৪১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। হাজীদের যাতায়াতসহ সেখানকার ব্যয় বৈদেশিক মুদ্রাতেই নির্বাহ হয়। এর সাথে হজের ব্যবস্থাপনা ব্যয়েও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাংলাদেশী টাকা ও বিদেশী মুদ্রা ব্যয়ের সংশ্লেষ থাকে।
পশু কোরবানি উপলক্ষে জাতীয় অর্থনীতিতে এক ব্যাপক আর্থিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ৩৫ লাখ গরু ও ৬০ লাখ খাসি কোরবানি হয়েছে। গরুপ্রতি গড় মূল্য ৫০ হাজার টাকা দাম ধরলে ৩৫ লাখ গরু বাবদ লেনদেন হবে ১৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ৬০ লাখ খাসি (গড়ে ৪০০০ টাকা দরে) দুই হাজার ৪০০ কোটি টাকা লেনদেন হয়। অর্থাৎ পশু কোরবানিতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসায় হয়েছে। এই হিসাবের মধ্যে হজে গিয়ে যারা কোরবানি করেছেন তাদের কোরবানি ধরা হয়নি।

কোরবানি করা পশুর চামড়া আমাদের অর্থনীতিতে রফতানি বাণিজ্যে, পাদুকা শিল্পে, পোশাক, হস্তশিল্পে এক অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এ চামড়া সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, বিক্রয় ও ব্যবহার উপলক্ষে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের ও প্রতিষ্ঠানের কর্মযোজনা সৃষ্টি হয়। এ চামড়া সংগ্রহ-সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকরণের সাথে এক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ও ব্যবসায় জড়িত। ব্যাংকগুলো প্রতি বছর প্রায় ৬০০ কোটি টাকা বিশেষ ঋণ দিয়ে থাকে। লবণ চামড়া সংরক্ষণের একটি অন্যতম উপাদান। প্রতি বছর গড়ে সরকারকে ৪০ হাজার টন লবণ শুল্কমুক্ত আমদানির উদ্যোগ নিতে হয়, যাতে সিন্ডিকেট করে লবণের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি না হয়। গোশত রান্নার কাজে ব্যবহৃত মশলা বাবদ প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার ব্যবসায় হয়ে থাকে কোরবানির সময়ে।
ঈদ উপলক্ষে পরিবহন ব্যবসায়ও ব্যাপক কর্মতৎপরতা বেড়ে যায়। শহরের মানুষ আপনজনের সাথে ঈদ উদযাপনের জন্য গ্রামে ছোটে। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায় কোরবানির সময় পরিবহন খাতে সাকুল্যে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বাড়তি ব্যবসায় বা লেনদেন হয়ে থাকে। এটিও অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। এ বছর ঈদ উপলক্ষে মানুষের চলাফেরা অনেক কম হবে অবশ্যই, তবে পরিবহন ভাড়াও শতকরা ৬০ ভাগ বেড়েছে; সুতরাং যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে চলাফেরা করলে পরিবহন ব্যবসাও তেমন খারাপ হওয়ার কথা নয়।
মোট কথা ঈদুল আজহা মুসলমানদের জন্য যেমন বিশেষ আনন্দের তেমনি দেশের অর্থনীতির জন্য বিশাল কর্মচাঞ্চল্যের। কিন্তু বিশ্বব্যাপী মহামারীর কারণে মুসলমানদের এই পবিত্র হজ যেমন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে তেমনি কোরবানি করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেরই ধারণা, পশুর হাটের মাধ্যমে করোনা ব্যাপকভাবে সংক্রমিত হতে পারে, তাই হাট বন্ধ করে দেয়া প্রয়োজন। অনেকেই আবার এর সাথে একমত নন। কারণ, কোরবানির সাথে শুধু ধর্মীয় বিধানই জড়িত নয়, এর সাথে বহু মানুষের জীবন-জীবিকা ও দেশের অর্থনীতিও জড়িত।

কোরবানির জন্য অনেক খামারি এমনকি ব্যক্তি পর্যায়েও অনেকেই বছরব্যাপী পশু লালন-পালন করেন ঈদে বিক্রি করে জীবনযাপনের জন্য, কিছু অর্জনের জন্য। কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করে অনেক মাদরাসা, এতিমখানার কিছু আয় হয়। দেশের চামড়া শিল্পের কাঁচামালের জোগানের বেশির ভাগ পূরণ করে এই চামড়া দিয়ে। এই শিল্পের সাথেও বিভিন্ন পর্যায়ের বহু শ্রমিক ও ব্যবসায়ী জড়িত। অনেক গরিব, শ্রমিক এবং মজুরের জীবন-জীবিকা ব্যবস্থা জড়িত পশুর হাটের ক্রয় বিক্রয়ে, পশু বাড়িতে আনা, কোরবানি দেয়া, কাটাকাটির সাথে। অনেক গরিব-মিসকিন আছেন, যাদের বছরে একবার গোশত খাওয়ার সুযোগ হয় এই কোরবানির ঈদে।
সুতরাং,শুধু ঝুঁকির কথা চিন্তা করে, ধর্মীয় বিধিবিধান উপেক্ষা করে এবং দেশের আর্থ-সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় না নিয়ে পশুর হাট বন্ধ করা ঠিক হবে না। ঝুঁকি আমাদের এখন সব ক্ষেত্রে, সুতরাং অন্যান্য কার্যক্রমের মতোই ঝুঁকি মোকাবেলা করে কোরবানিও চালিয়ে যেতে হবে। তবে ঝুঁকি কমাতে ক্রেতা-বিক্রেতা, হাটের ইজারাদার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় সরকারকে যথাযথ সমন্বয়ের মাধ্যমে সচেতনভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, প্রয়োজনে মানতে বাধ্য করতে হবে।
ইতোমধ্যে সরকারের নীতিনির্ধারকরা পরামর্শও দিয়েছেন, এমনকি হয়তো উদ্যোগও নেবেন যেন করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে এবার যত্রতত্র হাট না বসানোর। বড় ও খোলা জায়গায় হাট বসাতে হবে এবং বিক্রেতাদের দূরত্ব বজায় রেখে পশু নিয়ে বসতে হবে যেন ক্রেতাদের পক্ষে শারীরিক দূরত্ব মানা সম্ভব হয়। কোরবানির অংশীদাররা সবাই একসাথে হাটে না গিয়ে সবার পক্ষ থেকে একজন অথবা দু’জন, গরু ক্রয় করতে যেতে পারেন। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কেই আবশ্যিকভাবে মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, মাথার ক্যাপ ও সম্ভব হলে গাউন পরতে হবে। অনেক ক্রেতা আছেন যারা কয়েকটি হাট ঘুরে যাচাই-বাছাই করে পশু কেনেন, পশু নিয়ে প্রতিযোগিতা করেন। এবারের ঈদে এই প্রবণতা পরিহার করতে হবে। ইদানীং অবশ্য অনলাইনে গরু ছাগল ক্রয়-বিক্রয় হয়। সেভাবেও গরু ছাগল ক্রয়-বিক্রয় করা যেতে পারে। গ্রামে অবশ্য এই সুযোগ এখনো শুরু হয়নি। সুতরাং সেখানে বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
হাটের ইজারাদাররা হাটে পর্যাপ্ত স্যানিটাইজার বা সাবান-পানির ব্যবস্থা রাখবেন, যাতে ক্রেতা-বিক্রেতারা হাত পরিষ্কার রাখতে পারেন। এ ছাড়া ইজারাদারেরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাহায্য নিয়ে হাটে স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়টি নিশ্চিত করবেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও বিষয়টি তদারকি করতে হবে। সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করলে এবং স্বাস্থ্যবিধি মানলে ধর্মীয় বিধান ও জীবন দুটোই রক্ষা পাবে, করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে আসবে।

সর্বোপরি, আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, কোরবানিতে এমন পরিস্থিতিতে আমরা আগে কখনো পড়িনি। তবে জাতি হিসেবে অনেক কঠিন পরিস্থিতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমরা মোকাবেলা করেছি। সুতরাং আমরা সবাই যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে সচেতনভাবে নাগরিক দায়িত্বও পালন করি তাহলে এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করে একটি সুন্দর ঈদ উদযাপন করতে পারব, ইনশাআল্লাহ।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English