বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:২৩ অপরাহ্ন

করোনাকালীন সমাজসেবায় আলেম সমাজ

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২০
  • ৪২ জন নিউজটি পড়েছেন

মানুষ বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন এক শ্রেষ্ঠ প্রাণী। তবে সবার বিবেক-বুদ্ধি এক সমান নয়। বিভিন্ন শিক্ষাদীক্ষা, অভিজ্ঞতা মানুষকে জ্ঞানী করে তোলে। যারা জানে আর যারা জানে না তারা সমান নয়। সুতরাং যারা জানে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য অনেক বেশি। অনেক দেশেই মসজিদ বা ইবাদত গৃহকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থা দেখা যায়। আর সে সমাজ পরিচালনায় সামাজিক নেতাদের সাথে যারা ভূমিকা রাখেন তারা হলেন আলেম সমাজ।
ইসলাম সম্পর্কে যিনি বিস্তর জ্ঞান রাখেন তিনি আলেম, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যাই থাকুক না কেন। আলেমরা সর্বাধিক আল্লাহকে ভয় করেন। সাধারণ মানুষ এবং আলেমের মর্যাদা কখনো সমান নয়। কুরআনে এসেছে, হে নবী সা: আপনি বলুন! যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান হতে পারে? বোধশক্তিসম্পন্ন লোকেরাই শুধু উপদেশ গ্রহণ করে। (সূরা আজ-জুমার : ৯)
সমাজের সাথে নবী-রাসূলগণের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড়। তাঁরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো পেশা গ্রহণ করেছেন, কৃষি, মিস্ত্রি, রাখাল, ব্যবসা, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন কাজে তারা নিয়োজিত ছিলেন। ফলে সমাজের সমস্যা সম্পর্কে তারা খুব সহজে অবহিত ছিলেন এবং তার সমাধানে সচেষ্ট থেকেছেন। তাঁদের সমাজমুখিতার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দ্বীনের প্রচার ও প্রসার।
ইসলামের প্রচার-প্রসারে বক্তৃতা-বিবৃতির চেয়ে সেবামূলক কর্মকাণ্ডের গুরুত্ব অনেক বেশি। মানবসেবায় এগিয়ে আসার মাধ্যমেই সমাজের মানুষের মন জয় করা সম্ভব। সেবা মানুষকে পরস্পরের খুব নিকটতম করে দেয়, আত্মিক সম্পর্ক উন্নয়ন করে, শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করে দেয়, সর্বোপরি পরস্পরের মাঝে সহযোগিতা ও সহমর্মিতার ভাব সৃষ্টি করে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মসজিদকেন্দ্রিক সমাজ পরিচালিত হতে দেখা যায়। আলেমরা সমাজে সত্যের প্রচার ও অসত্যের নিবৃতির দায়িত্ব পূর্ণরূপে পালন করলে সমাজ থেকে যাবতীয় অন্যায়-অবিচার খুব সহজেই দূর করা সম্ভব। রাসূল সা: নবুওয়াত লাভের আগে থেকে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত সমাজসেবার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। প্রথম অহি লাভের পর তিনি অস্বস্তি বোধ করলে স্ত্রী খাদিজা রা: তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আল্লাহর শপথ! কখনো নয়, আল্লাহ আপনাকে কখনো অপমানিত করবেন না। কারণ আপনি আত্মীয়দের প্রতি দয়াশীল, পীড়িতদের ব্যয় বহন করেন, নিঃস্বদের জন্য উপার্জন করেন, আপনি অতিথিপরায়ণ এবং সত্যিকারের বিপদাপদে সাহায্যকারী। (বুখারি : ৩)
আলেমরা সমাজের অন্যতম সচেতন প্রতিবেশী। প্রতিবেশীর অন্যতম দায়িত্ব হলো ক্ষুধার্তদের খোঁজখবর নেয়া। রাসূল সা: বলেন, যে তার প্রতিবেশীকে অনাহারে রেখে নিজে পেটপুরে খায়, সে মুমিন নয়। তা ছাড়া অসুস্থ প্রতিবেশীকে দেখভাল করার মধ্যে রয়েছে প্রভূত সাওয়াব। রাসূল সা: বলেন, ‘কোনো মুসলিম যখন তার (অসুস্থ) মুসলিম ভাইয়ের সেবায় নিয়োজিত হয়, সে ফিরে আসা পর্যন্ত জান্নাতের ফলবাগানে (তার ছায়ায়) অবস্থান করতে থাকে।’ (মুসলিম)
সুস্থতা-অসুস্থতা আল্লাহর নিয়ামত। স্বাভাবিক রোগব্যাধির পাশাপাশি পৃথিবীকে আক্রান্ত করেছে এখন কোভিড-১৯। ইসলাম রোগীর সেবাকে ‘মুসলমানের আবশ্যক কর্তব্য হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। তার পরও করোনায় আক্রান্ত সন্দেহে সন্তান তার বাবা-মাকে রাস্তায় ফেলে যাচ্ছে। এটির মূল কারণ হলো অজ্ঞতা ও সচেতন জ্ঞানের অভাব। আলেমরা তাদের বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে এ ব্যাপারে জনগণকে সতর্ক করতে ভূমিকা রাখতে পারেন। এ ছাড়া যেকোনো মহামারী আবর্তিত হওয়ার কারণ সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করাও আলেমদের অন্যতম দায়িত্ব। মূলত এ ধরনের মহামারী আমাদের কর্মফল ও তাকদিরের সাথে সংশ্লিষ্ট। মহান আল্লাহ বলেন, হে নবী আপনি বলে দিন! কখনো কারো জন্য যা তাকদিরে লিপিবদ্ধ নেই তা স্পর্শ করবে না। (সূরা আত তাওবা : ৫১)
মানসিকভাবে শক্তিশালী থাকলে যেকোনো বিপদ মুসিবত থেকে সহজে মুক্তি লাভ সম্ভব। করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসাসেবায় নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ আবিষ্কৃত না হওয়ায় জনগণের মাঝে এ ব্যাপারে আতঙ্ক ও অস্বস্তি কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানো প্রয়োজন। মহান আল্লাহ বলেন, যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে তিনি তার জন্য অনেক পথ উন্মুক্ত করে দেন। (সূরা আত তালাক : ২) আলেমরা সমাজের মানুষের কাছে এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে তুলে ধরতে পারেন।
বর্তমান সময়ে সামাজিক দূরত্ব নয়, বরং শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার সাথে সাথে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে সচেষ্ট হতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, আর অবশ্যই আপনার আগে আমরা বহু জাতির কাছে রাসূল পাঠিয়েছি; অতঃপর তাদের অর্থসঙ্কট ও দুঃখকষ্ট দিয়ে পাকড়াও করেছি, যাতে তারা অনুনয়-বিনয় করে। (সূরা আল আনআম : ৪২)
আমাদের সমাজে একটি কথা বহুল প্রচলিত আছে যে, আলেমরা সেবা গ্রহণে অভ্যস্ত, সেবা দিতে আগ্রহী কম। অথচ আমাদের দেশের বেশির ভাগ স্থানে মসজিদকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থা রয়েছে। আলেমরা সমাজের নেতাদের সাথে নিয়ে সেবামূলক কাজে নিজেদের নিয়োজিত করতে পারেন। বর্তমান দুর্যোগ ও মহামারীতে মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে মানবসেবায় এগিয়ে আসতে হবে। রাসূল সা: বলেন, সম্প্রদায়ের নেতা হলেন তাদের খাদেম বা সেবক।
আশার কথা হলো, বর্তমান সময়ে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে আলেমরা করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তির লাশ দাফনে দিনরাত নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা করোনা আক্রান্তের সেবায় আত্মনিয়োগ করছেন। ফলে তারা অনেক বেশি সাওয়াবের কাজে নিয়োজিত আছেন। তা ছাড়াও ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও সংস্থা-ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অনেকে ত্রাণ বিতরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। প্রতিটি পাড়া-মহল্লার মসজিদগুলোকে সমাজসেবার কেন্দ্র হিসেবে তৈরি করা গেলে এসব সেবাকে আরো বেশি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া সম্ভব।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English