করোনা মহামারীর মধ্যেও কমছে না জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা। আগামী ২০২৫ সালে দেশে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াবে ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ। কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে ২০১৯-২০ এবং ২০২০-২১ সালে কমে গেলেও ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে অর্থনীতি আবারও ঘুরে দাঁড়াবে ধরে নিয়েই এ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্য, কৃষি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নসহ বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার খসড়ায় এই লক্ষ্য ধরা হচ্ছে। খসড়া পরিকল্পনাটির ওপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মতামত চাওয়া হয়েছে। আজ মতামত দেয়ার সময় শেষ হচ্ছে।
তবে প্রবৃদ্ধির এই লক্ষ্য অর্জন বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, এ ধরনের লক্ষ্য কীভাবে ধরা হল, সেটিই বড় প্রশ্ন। কেননা আমাদের তথ্য-উপাত্তের মান খুবই খারাপ। যেমন গত অর্থবছরের হিসাবে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের তথ্যে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। তাই এ ধরনের প্রক্ষেপণ হয়তো ধরা হতে পারে, কিন্তু সেটি অর্জন সম্ভব হবে না।
এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনাটি তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম বুধবার বলেন, করোনা না থাকলে সদ্যসমাপ্ত ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ১৯ শতাংশ অর্জিত হতো। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রাথমিক হিসাবে সেটি ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ এসেছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আশা করা যাচ্ছে ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে করোনার প্রভাব কেটে যাবে। গতি বাড়বে অর্থনীতির। ফলে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে না।
খসড়া পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, করোনা না থাকলে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হতো ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ; কিন্তু এখন করোনা মহামারীর কারণে সেটি কমিয়ে ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। তবে যেহেতু সামনের দিনগুলোয় পরিস্থিতি উন্নতি হবে বলে আশা করা যাচ্ছে, সেহেতু ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি অর্জনের এই লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ।
২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য লক্ষ্য হচ্ছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং পরিকল্পনার শেষ অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ অর্জিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, করোনা মহামারী দেশের মানুষের জীবন এবং সম্পদের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এ অবস্থা মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জনগণের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা শক্তিশালীকরণ, জেলা পর্যায় পর্যন্ত মানসম্মত ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার সেবা চালু করার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় কোভিডের টিকা সংগ্রহ এবং তা সবার নাগালের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। সেই সঙ্গে দেশীয় যেসব সংস্থা টিকা নিয়ে গবেষণা করছে তাদের আর্থিক প্রণোদনা দেয়া দরকার। ইতোমধ্যে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা ও সহায়তা প্যাকেজগুলোর বাস্তবায়ন দ্রুত করতে বলা হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির শক্তিশালী বাস্তবায়ন এবং দারিদ্র্য কমানোর মতো কর্মসূচি যুক্ত করা হবে। আরও বলা হয়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ। দেশের ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থানই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। এক্ষেত্রে ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রচেষ্টা থাকবে। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষ কর্মীর অভাব রয়েছে। তাই মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণের চলমান প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হবে।