শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ০৪:৪৫ পূর্বাহ্ন

করোনাকালে কোরবানি

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২০
  • ৪৪ জন নিউজটি পড়েছেন

কোরবানি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি ইসলামের নিদর্শন। বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির এ কঠিন সময়ে কিভাবে কোরবানি আদায় করা যেতে পারে, সে সম্পর্কে লিখেছেন ড. মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন তালুকদার

কোরবানির বিধান

ইসলামে কোরবানির বিধান নিয়ে আলেমরা দুটি অভিমত ব্যক্ত করেছেন :

১. ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মুহাম্মদ, ইমাম জুফার, রবিআহ, লাঈস ইবন সাআদ, ইমাম আওজায়ি, সুফিয়ান সাউরির মতে কোরবানি করা ওয়াজিব। এ অভিমতের পক্ষে দলিল হলো—

ক. মহান আল্লাহর বাণী—‘তুমি তোমার রবের উদ্দেশে সালাত আদায় করো ও কোরবানি দাও।’ (সুরা আল-কাউসার : ২)

এ আয়াতে আল্লাহ আদেশসূচক শব্দ ব্যবহার করেছেন; যা সাধারণভাবে আবশ্যকতার হুকুম রাখে। আর রাসুল (সা.)-এর জন্য আবশ্যক হলে তা উম্মতের জন্যও আবশ্যক।

খ. মহানবী (সা.)-এর বাণী—‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কোরবানি করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ (ইবনে মাজাহ)

হাদিসটিতে কোরবানি পরিত্যাগকারীদের বিরুদ্ধে কঠিন সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে, এ ধরনের সতর্কবার্তা সাধারণত ওয়াজিব পরিত্যাগকারীদের ব্যাপারেই দেওয়া হয়।

গ. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী—‘যে ব্যক্তি (ঈদের) নামাজের আগে কোরবানি করেছে সে যেন (নামাজের পরে) তার পরিবর্তে পুনরায় একটি ছাগী জবেহ করে, পক্ষান্তরে যারা এখনো জবেহ করেনি তারা যেন আল্লাহর নামে জবেহ করে।’ (সহিহ মুসলিম) এ হাদিস থেকেও কোরবানি ওয়াজিব হওয়া প্রমাণিত হয়।

২. ইমাম মালিকের অধিকতর নির্ভরযোগ্য অভিমত, শাফিয়ি ও হাম্ব্বলি মাজহাবের সিদ্ধান্ত মতে কোরবানি সুন্নতে মুআক্কাদাহ। আবু বকর (রা.), উমর (রা.), বেলাল (রা.), আবু মাসউদ (রা.) এবং তাবেয়িদের মধ্যে সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, আতা, আলকামা (রহ.) প্রমুখ এ মত পোষণ করতেন।

তাঁদের দলিল হলো :

ক. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী—‘যখন জিলহজ মাসের প্রথম দশক শুরু হবে এবং তোমাদের কেউ যদি কোরবানি করতে চায় সে যেন তার চুল ও নখ না কাটে।’ (মুসলিম)

এ হাদিসে ‘কোরবানি করতে চায়’ দ্বারা প্রতীয়মান হয় কোরবানি করা বা না করার এখতিয়ার আছে, যদি এটা ওয়াজিব হতো তাহলে এ ধরনের এখতিয়ার থাকত না।

খ. ইমাম বায়হাকি (রহ.) বর্ণনা করেছেন, আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.) এক-দুই বছর পর পর কোরবানি করতেন—এই আশঙ্কায় যেন অন্যরা এটাকে ওয়াজিব মনে না করে।

কোরবানির ধরন

হানাফি মাজহাব অনুযায়ী প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর কোরবানি ওয়াজিব। তাই একই পরিবারে একাধিক ব্যক্তি যদি সামর্থ্যবান হয় তাহলে প্রত্যেককে আলাদা আলাদা কোরবানি করতে হবে। একটি ছাগল/ভেড়া/দুম্বা বা গরুর সাত ভাগের এক ভাগ দ্বারা শুধু একজনের কোরবানি আদায় হবে।

বর্তমানে কিভাবে কোরবানি করব

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে কোরবানির পশু ক্রয়ের জন্য বাজারে গমন, জবেহ, প্রক্রিয়াকরণ ইত্যাদি জনসমাগম এড়িয়ে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে পালন করা কষ্টকর হলে সে ক্ষেত্রে আমরা নিম্নোক্ত পন্থা অবলম্ব্বন করতে পারি :

১. মধ্যপ্রাচ্য, পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের বিভিন্ন উন্নত রাষ্ট্রের মতো সরকারি ব্যবস্থাপনায় অথবা সরকার অনুমোদিত সংস্থার অধীনে নাম রেজিস্ট্রেশন করে কোরবানি করা যেতে পারে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে এ কাজ সম্পন্ন করবে, ফলে কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

২. ইসলাম মানুষের কল্যাণ বিবেচনা করে ও কোরবানির বিধান পালনের সুবিধার্থে যেহেতু জিলহজ মাসের ১০, ১১, ১২—এই তিন দিন কোরবানি আদায় করার সুযোগ দিয়েছে, সেহেতু সবাই ১০ তারিখে একত্রে ভিড় না করে প্রত্যেক এলাকাকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলে বিভক্ত করে পর্যায়ক্রমে ১০-১২ তারিখের মধ্যে কোরবানি সম্পন্ন করা যেতে পারে।

৩. একটি ছাগল/ভেড়া কোরবানি করে ইসলামের এ গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত পালন করা যায়। এ ক্ষেত্রে কোরবানির জন্য বাজেটের বাকি টাকা গরিব-অসহায় ও কর্মহীন মানুষকে দিয়ে তাদের আহার ও মানবিক প্রয়োজন পূরণে সদকা করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, গত বৎসর যে পরিবারে এক লাখ টাকার গরু কোরবানি করেছিলেন তারা এ বছর সীমিত পরিসরে একটি ছাগল কোরবানি করবেন। ছাগলের মূল্য ১০ হাজার টাকা হলে বাকি ৯০ হাজার টাকা দান করতে পারবেন।

নির্ধারিত দিনে কোরবানি করতে না পারলে অর্থ সদকা করা

আলেমদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সাধারণ অবস্থায় কোরবানি না করে সে অর্থ দান করা যাবে না; বরং কোরবানিই করতে হবে। কেননা কোরবানি ওয়াজিব, কারো কারো মতে সুন্নতে মুআক্কাদাহ। পক্ষান্তরে দান-সদকা হলো নফল। কোনো নফল ওয়াজিব বা সুন্নতের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না। তা ছাড়া কোরবানির ব্যাপারে সরাসরি কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশ রয়েছে। রাসুল (সা.), সাহাবি, তাবেয়ি, তাবে তাবেয়িদের কেউ কোরবানি না করে সে অর্থ দান-সদকা করেছেন মর্মে কোনো প্রমাণ নেই। আর কোরবানির বিধানের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, অসহায়-দরিদ্র ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নততর খাদ্যের (হালাল ও পবিত্র গোশত) সংস্থান করা। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কোরবানির পশুর গোশত খাও ও নিঃস্ব ফকিরদের খাওয়াও।’ (সুরা হজ, আয়াত : ২৮)

আর কোরবানির পরিবর্তে সমপরিমাণ অর্থ দান করলে সে উদ্দেশ্য অর্জিত হয় না। তথাপি হানাফি মাজহাবে জটিল পরিস্থিতির কারণে যদি কোরবানি আদায় করা সম্ভব না হয় এবং কোরবানির নির্দিষ্ট তিন দিন অতিবাহিত হয়ে যায়, তাহলে কোরবানির পশুর সমপরিমাণ অর্থ সদকা করার অভিমত বর্ণিত হয়েছে। (আল-হিদায়াহ, কোরবানি অধ্যায় : ৪/৩৫৮)

একেবারে নিরুপায় হলে এ সুযোগ গ্রহণ করা যেতে পারে; আর সে ক্ষেত্রে কোরবানির জন্য বাজেটের পুরো অর্থই সদকা করা উত্তম। আশা করা যায়, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে এটি কবুল করবেন। মহান আল্লাহই সমধিক জ্ঞাত।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English