করোনার সংক্রমণে লণ্ডভণ্ড সারা বিশ্বে সবাইকে সব কাজে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে শিক্ষা খাতকে। তবে এই পরিস্থিতি কিছু উপকারও বয়ে এনেছে। যেমন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের চর্চা বেড়েছে। দেশে-বিদেশে চাকরির রেজিস্ট্রেশন, নিবন্ধন, বিভিন্ন ধরনের অফিসিয়াল বা সরকারি ফরম সংগ্রহ, ট্যাপ বা আয়কর রিটার্ন দাখিল, টেন্ডার বা দরপত্রে অংশগ্রহণ ইত্যাদি কাজকর্ম অনলাইনেই সম্পন্ন করা যাচ্ছে।
অনলাইনে ব্যবসা-বাণিজ্য, ই-নথি, ই-প্রকিউরমেন্ট ইত্যাদির মতো শিক্ষাক্ষেত্রেও এসেছে ডিজিটাল প্রযুক্তির বৈপ্লবিক ছোঁয়া। তবে গতানুগতিক বা মুখোমুখি শিক্ষা থেকে অনলাইনে স্থানান্তরিত হওয়া বিশ্বজুড়ে অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে মোটেও সহজ ছিল না, বাংলাদেশের পক্ষে ছিল আরও কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং। ডিজিটাল দক্ষতা, পাঠশাস্ত্র জ্ঞান, পরীক্ষা মূল্যায়নের কৌশলগুলোর ক্ষেত্রে একগুচ্ছ পরিবর্তন, সমর্থন ইত্যাদি প্রাতিষ্ঠানিক নীতি এবং অনুশীলনে খাপ খাইয়ে নেওয়া খুবই দুরূহ কাজ ছিল। এতদসত্ত্বেও মহামারি কভিড-১৯ শিক্ষাক্ষেত্রে যেমন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে, তেমনি বিশ্বব্যাপী উচ্চশিক্ষার নানা রকম সুযোগ, অনুসন্ধান ও অন্বেষণের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে।
সংগত কারণেই বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই সংকটকালীন সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য কার্যক্রমের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থায়ও মারাত্মক হোঁচট লেগেছে। কিন্তু ডিজিটাল সক্ষমতা এবং তথ্যপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব সাফল্যের ফলে সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে বাংলাদেশ আজ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অনলাইনে লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বেড়েছে অনেক। যদিও ইন্টারনেট কানেক্টিভিটি, মোবাইল ডাটা ও প্রয়োজনীয় ডিভাইসের অভাবে শতভাগ শিক্ষার্থী এই জার্নিতে সংযুক্ত হতে পারছে না। তবুও নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে গত একটি বছর শিক্ষাব্যবস্থায় ডিজিটাল টেকনোলজি ব্যবহারে যথেষ্ট দক্ষতা ও সক্ষমতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ।
শিশু থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থী, শিক্ষক সবাই নতুন এই প্রযুক্তির সঙ্গে এখন মোটামুটিভাবে অভ্যস্ত। বলা চলে অনলাইনে ক্লাস পরিচালনা করার ধারণাটি এখন শহর থেকে গ্রামে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কলেজ-স্কুল পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীদের কাছে একটি বিকল্প মাধ্যম হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। শিক্ষকদেরও পাঠদানে এসেছে স্বচ্ছতা, অডিও ও ভিডিও রেকর্ডিং পদ্ধতি নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে। অনলাইনে ক্লাস পরিচালনা (ই-লার্নিং), ভর্তি রেজিস্ট্রেশন, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট, কুইজ, ফলাফল প্রণয়ন, ই-বুক ইত্যাদি সংযোজিত হয়েছে এগুলো হচ্ছে বাংলাদেশে ডিজিটাল রেনেসাঁ বা নবজাগরণের অল্প কয়েকটি নমুনা।
শ্রেণিকক্ষে গিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী (ফেস টু ফেস) দীর্ঘদিন যাবৎ যেভাবে ক্লাস পরিচালিত হয়ে এসেছিল সেটা হচ্ছে অফলাইন লার্নিং। অনলাইন ক্লাসের বিষয়টি বিশ্বে করোনাকালীন এই সময়ে বেশি পরিচিতি লাভ করেছে। এখানে শিক্ষক তার পাঠ্যসূচি অনলাইনের মাধ্যমে পরিচালনা করে থাকেন। শিক্ষার্থীরা যে যেখানে থাকে, সেখানে থেকেই ওই অনলাইন ক্লাসে সংযুক্ত হয়। পাঠ্যসূচির ডিজিটাল কনটেন্ট রেকর্ডিং এবং আপলোড করার সুযোগ থাকে, শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট সময়ে অনলাইন ক্লাসে সংযুক্ত হতে না পারলেও পরে যে কোনো সময় কিংবা নিজের সুবিধামতো সময়ে রেকর্ডকৃত পাঠ্যসূচিটি ডাউনলোড করে দেখে নিতে পারে। (অনলাইনের ক্ষেত্রে) শিক্ষার্থীকে ডাউনলোডকৃত পাঠ্যসূচির ওপরই নির্ভরশীল থাকতে হয়। কোনো কিছু বুঝতে না পারলে কিংবা প্রশ্ন-উত্তর পর্বের কোনো সুযোগ থাকে না।
ব্লেন্ডেড বা হাইব্রিড পদ্ধতিতে সবকিছুই অনলাইনের মতো এবং অনলাইনের সব ফিচার এখানে বিদ্যমান থাকে। তবে এ ক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে সময়, স্থান বা লোকেশন (ক্লাসের আইডি বা লিংক) এবং নির্দিষ্ট কনটেন্ট (বিষয়বস্তু পূর্বনির্ধারিত থাকে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত সময়ে, নির্দিষ্ট লোকেশনে ওই নির্দিষ্ট কনটেন্ট নিয়ে আলোচনা করে। শিক্ষার্থীরা না বুঝলে শিক্ষক আবার আলোচনা করেন, প্রশ্ন করেন, উত্তর পান ইত্যাদি। শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করলেও অনেকটা সরাসরি শ্রেণিকক্ষের মতোই অংশগ্রহণমূলক, আকর্ষণীয় (ইন্টারেক্টিভ) ও জীবন্ত মনে হয়। অর্থাৎ ক্লাসটি অনলাইনে হলেও এখানে অফলাইন (ফেস টু ফেস) ক্লাসের ফ্লেভার পাওয়া যায়। আবার সময় ও সুযোগ বুঝে কিছু ক্লাস সরাসরিও নেওয়া হয়ে থাকে। এভাবে অফলাইন, অনলাইন এবং তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয়ে গঠিত পাঠ্যব্যবস্থাকে হাইব্রিড বা ব্লেন্ডেড (মিশ্রিত) লার্নিং বলা হয়।
ইউরোপ-আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলো ই-লার্নিং এবং অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা এবং চর্চা করোনার বহু পূর্বে থেকেই প্রচলিত ছিল। ফলে গত একটি বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও এসব দেশগুলোতে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে তেমন কোনো বেগ পেতে হয়নি। অর্থাৎ করোনা তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে তেমন কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। কিন্তু আমাদের অনেক ক্ষতি করেছে আবার অনেক কিছু শিখিয়েছে। এসব শিক্ষা আমাদের কভিড-পরবর্তী সময়েও কাজে লাগাতে হবে। ডিজিটাল এবং ফিজিক্যাল শিক্ষার সমন্বয় ঘটাতে হবে। ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত দেশে পরিণত হবে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শিক্ষাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় ফিজিক্যাল এবং ডিজিটাল টেকনোলজির সমন্বয়ে গঠিত ফিজিটাল তথা ব্লেন্ডেড লার্নিয়ের কোনো বিকল্প নেই। যদিও অনলাইন বা ব্লেন্ডেড লার্নিং কখনোই সরাসরি ক্লাসের বিকল্প নয়।
করোনার সংক্রমণ কবে নাগাদ শেষ হবে কেউ বলতে পারছে না। যখন এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটবে, তখন শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত অর্জিত এই জ্ঞান ও দক্ষতা ছেড়ে পুনরায় প্রথাগত শ্রেণিকক্ষে সরাসরি ফিজিক্যালি (ফেস টু ফেস) ক্লাস পরিচালনা করা হবে, নাকি ফিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দিকে এগিয়ে যাবে, তা এখন বিবেচ্য বিষয়। অর্থাৎ, ডিজিটাল বাংলাদেশে কভিড-পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থায় আমাদের কৌশলগুলো কী হওয়া উচিত, সেটা এখনই ঠিক করতে হবে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ‘ফিজিটাল শিক্ষা’ (শারীরিক এবং ডিজিটাল শিক্ষার সংমিশ্রণ) বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করছে এবং এই খাতকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া এবং সতর্কতার সঙ্গে বিবেচিত করা হলে পোশাকশিল্পের পরে এই খাতে রেমিট্যান্স অর্জনে বৃহত্তম উৎস হিসেবে গণ্য হতে পারে। এ লক্ষ্যে বেসিস, এটুআই এবং আইসিটি ডিভিশনের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা যেতে পারে। উন্নত বিশ্বে কীভাবে ব্লেন্ডেড লার্নিং সাফল্য পেয়েছে তা খতিয়ে দেখা এবং বাংলাদেশে যেসব পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন এই সেক্টরে কাজ করে আসছে তাদের পরামর্শক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। প্রয়োজনীয় উৎসাহ ও উদ্যোগ নেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।