শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ০৬:৪৪ পূর্বাহ্ন

কোরবানির অন্তর্নিহিত শিক্ষা

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২০
  • ৫২ জন নিউজটি পড়েছেন

‘কোরবানি’ একটি চিরন্তন ইবাদত। মানবজাতির পিতা হজরত আদম আ:-এর সময় থেকেই এই ইবাদতের শুরু হয়েছে। এরপর থেকে পৃথিবীতে আগমনকারী প্রত্যেক জাতির ওপরই আল্লাহর উদ্দেশ্যে এই প্রতীকী ভালোবাসারূপ উৎসর্গের প্রচলন ছিল (সূরা আল হজ : ৩৪)। পৃথিবীর ইতিহাসের সেই প্রথম কোরবানিতেই প্রমাণিত হয়েছিল হৃদয়ের শ্রদ্ধা, ভয় আর ভালোবাসা উজাড় করার প্রক্রিয়াই কোরবানির উদ্দেশ্য। তাইতো হজরত আদম আ:-এর দুই সন্তানের মধ্যে হাবিলের কোরবানি আল্লাহ্ তায়ালা কবুল করেছিলেন, কিন্তু কাবিলের কোরবানি কবুল করেননি (আল মায়িদা : ২৭)।
মুসলমানরা যে কোরবানি করেন তা হলো হজরত ইব্রাহিম আ:-এর প্রবর্তিত সুন্নত। তিনি এত বড় ব্যক্তিত্ব এবং আল্লাহ্ পাকের এত প্রিয় বান্দা ছিলেন যে, তাঁর কোরবানির স্মৃতিকে ধরে রাখার ঘোষণা আল্লাহ্ পাক পবিত্র কালামে পাকে দিয়েছেন (সূরা আল সাফ্ফাত ৩৭ : ১০৮)। মানবজাতির ইতিহাসে কোনো বান্দাহ আল্লাহর পরীক্ষায় নিপতিত হয়ে সাফল্যের সাথে কৃতকার্য হওয়া ও সাথে সাথে আল্লাহর স্বীকৃতি লাভ করার অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন হজরত ইব্রাহিম আ:। আল্লাহ্ পাক তাঁকে বেশ কিছু পরীক্ষার সম্মুখীন করেছিলেন। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল প্রাণ প্রিয় ছেলেকে কোরবানি করার পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে পাস করার সাথে সাথেই আল্লাহ্ পাক তাঁর এই সফলতার স্বীকৃতি দিয়ে তাঁকে মহাপুরস্কৃত করার ঘোষণা দিলেন এবং সন্তানের পরিবর্তে একটি বেহেশতি পশু কোরবানির ব্যবস্থা করে দিলেন। (সূরা আল সাফ্ফাত : ১০৩-১১৩) আর পুরস্কারস্বরূপ তাঁকে বানিয়ে দিলেন বিশ্বনেতা (সূরা আল বাকারাহ : ১২৪), মুসলিম জাতির পিতা (সূরা আল হজ : ৭৮) এবং ইতিহাসের ধর্মীয় নেতা। (সূরা আল বাকারাহ : ১০৩)

এই কোরবানির একমাত্র শিক্ষা হলো আল্লাহ্ তায়ালার কাছে বান্দাহর বিনাবাক্য ব্যয়ে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ, যেটা করেছিলেন হজরত ইব্রাহিম আ:। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন তাঁকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানালে তিনি সাথে সাথে অকুণ্ঠচিত্তে বলেছিলেন, ‘আমি জগতসমূহের প্রতিপালকের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম’। (সূরা আল বাকারাহ : ১৩১) তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও আল্লাহ্র দ্বীনে নিজেদেরকে পুরোপুরি সঁপে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। (সূরা আল বাকারাহ : ১৩২) এই আত্মসমর্পণ আর কিছু নয়, তা হলো মহান রবের ইচ্ছার কাছে, তাঁর দ্বীনের কাছে, তাঁর আদেশ-নিষেধের কাছে ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে নিজের ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষাকে বিলীন করে দেয়া; সবদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করা। (আল আনআম : ৭৯) এভাবে আত্মসমর্পণটাকেই বলা হয় তাকওয়া। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা: থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল সা: বলেন, ‘তাকওয়ার হক হলো প্রত্যেক কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা, আনুগত্যের বিপরীত কোনো কাজ না করা, আল্লাহকে সর্বদা স্মরণে রাখাÑ কখনো বিস্মৃত না হওয়া এবং সর্বদা তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, অকৃতজ্ঞ না হওয়া। (পবিত্র কুরআনুল করিম, মাওলানা মহিউদ্দীন খান, পৃ: ১৯১)

কাজেই মুসলিম উম্মাহর পিতা হজরত ইব্রাহিম আ:-এর আদর্শ গ্রহণ করাই হলো কোরবানির তাৎপর্য। আর সেই আদর্শ হলো, রবের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। (সূরা আল বাকারাহ : ১৩১, ১৩২) নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ হলো তাকওয়ার বহিঃপ্রকাশ। জিলহজ মাসের আগে রমজান মাসে দীর্ঘ একটি মাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আমরা তাকওয়া অর্জনের চর্চা করেছি। (সূরা আল বাকারাহ : ১৮৩) সেই তাকওয়াকে ধরে রেখে তাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যই আমরা কোরবানি নিয়ে হাজির হই আল্লাহর সম্মুখে। সূরা হজের ২৮ থেকে ৩৭ নম্বর আয়াত থেকে এই কোরবানির দুই ধরনের উদ্দেশ্য পাওয়া যায়। প্রথমত হলো বাহ্যিক উদ্দেশ্য : পশু জবাই করার সময় আল্লাহ্ তায়ালার শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা। (সূরা আল হজ : ৩৮, ৩৪, ৩৬)। কারণ, এই পশুর মাধ্যমেই তিনি আমাদের বিভিন্ন জীবনোপকরণ (সূরা আল হজ : ৩৪) দিয়েছেন। (বাহন, কৃষিকাজ, কাপড়, জুতা এবং পশুর বিশাল বাণিজ্যের বাজার) এর গোশত অত্যন্ত উপাদেয় খাবার আর আমাদের শরীরের প্রয়োজনীয় অধিকাংশ প্রোটিন ও চর্বি আমরা পশু থেকেই আহরণ করে থাকি। আবার সেখান থেকে আমরা গরিব-দুস্থদের খাবার সরবরাহ করে সবাই মিলে আহার করে থাকি। অপর দিকে এই পশু অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও আল্লাহ্ তায়ালা দয়া পরবশ হয়ে সেগুলোকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন। (সূরা আল হজ : ৩৬, ৩৭) এই যে আল্লাহ্ আমাদের পশু ব্যবস্থাপনার কৌশল শিখিয়ে দিয়েছেন এবং আমাদের কোরবানির মাধ্যমে মহান পালনকর্তার শুকরিয়া আদায় করার এবং তাঁর বড়ত্ব প্রকাশ করার পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়েছেন তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্যই কোরবানি। আর দ্বিতীয়ত, কোরবানির অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া বা আল্লাহর সাথে মনোজগতের নিবিড় সংযোগ স্থাপন। কারণ, বান্দাহর কোরবানির পেছনের অনুঘটক তাকওয়াটাই আল্লাহর কাছে পৌঁছে। (সূরা আল হজ : ৩৭)। এই তাকওয়ার অধিকারী বান্দাহ তখনি হবে (সূরা আল হজ : ৩৪, ৩৫) যখন সে হবে : (ক) আল্লাহর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণকারী (খ) সে হবে অত্যন্ত বিনয়ী (গ) আল্লাহর কথা স্মরণে তার হৃদয়-মন ভালোবাসা ও আল্লাহর বড়ত্বের ভারে শিউরে উঠবে (ঘ) বিপদ-আপদের পরীক্ষায় আল্লাহর জন্যই ধৈর্য ধারণ করবে (ঙ) আল্লাহ্ যে রিজিক দিয়েছেন তা থেকে জাকাত আদায় করবে ও দান-সাদকা করবে এবং (ঙ) সৎকর্মপরায়ণ হবে। (সূরা আল হজ : ৩৭) আর সেই সাথে আল্লাহর শরিয়ার বিধানাবলি এবং নিদর্শনাবলির প্রতি হৃদয় উৎলানো সম্মান ও ভালোবাসা পোষণ করবে। (সূরা আল হজ : ৩০, ৩২)
মহান আল্লাহ্ পাক রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে কোরবানির সঠিক বুঝ দান করুন। আমাদের উচিত কোরবানির অন্তর্নিহিত শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেকে আল্লাহর কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করে তাঁর কাছে মনের তাকওয়া পৌঁছানোর জন্য মনেপ্রাণে উচ্চারণ করা ‘নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার (আনুষ্ঠানিক) কাজকর্ম, আমার বেঁচে থাকা, আমার মরে যাওয়া, সবই মহাবিশ্বের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। (সূরা আল আনআম : ১৬২)

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English