করোনা ভাইরাসের প্রভাবে অর্থনীতির ক্ষতি কাটাতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। বিশেষ করে কর্মসংস্থান বাড়াতে জোর দেওয়া হয়েছে এবারের পরিকল্পনায়। সম্প্রতি অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার দলিল প্রকাশ করা হয়েছে।
অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মেয়াদে অর্থাত্ জুলাই ২০২০ থেকে জুন ২০২৫ মেয়াদে দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি গড় ৮ শতাংশে উন্নীতকরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই মেয়াদে প্রায় ১ কোটি ১৩ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা প্রাক্কলন করা হয়েছে। এতে অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানের অংশ ৮০ লাখ এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থানের অংশ ৩২ লাখ ধরা হয়েছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মেয়াদে অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে, যার প্রধান কারণ হলো কোভিড-১৯ পরিস্থিতির ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ধাক্কা এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ক্রমাগত জোরদার হওয়ার কারণে শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে উচ্চ কিংবা অগ্রসর প্রযুক্তির স্বয়ংক্রিয় যুগে প্রবেশ। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) এই পরিকল্পনার দলিল তৈরি করেছে।
উল্লেখ্য, করেনার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে সারা বিশ্বই একটি সংকটকালীন সময় অতিক্রম করছে। গত প্রায় এক বছর ধরে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সব দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী লকডাউনের প্রভাবে লাখ লাখ মানুষ বেকার হয়েছে। বিশেষ করে, ২০২০ সালের শুরুর দিকে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব দেশেই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমিকের অনেকেই অর্থনৈতিক স্থবিরতার শিকার হয়েছে। এমন সময়ে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। এজন্য পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কর্মসংস্থানে।
শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭ অনুযায়ী দেশে সেবা খাতে নিয়োজিত শ্রমশক্তির প্রায় ৭২ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সেবা খাতে কাঠামোগত রূপান্তর আনয়নের লক্ষ্যে সেবা খাত সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের আধুনিকীকরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সেবা খাতের উন্নয়ন কৌশল হিসেবে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, সেবা খাতে অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মদক্ষতার মানোন্নয়ন, রেমিট্যান্সের উত্পাদনমুখী ব্যবহারসহ নানা বিষয়ে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বিশদভাবে কর্মসূচি উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সেবা রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিগত বছরগুলোতে তেমন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। পরিবহন, টেলিকম ও আইসিটি, ব্যবসায়িক সেবা এবং পর্যটন, এ চারটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাত থেকে মোট সেবা রপ্তানির মাত্র ৪৭ শতাংশ অর্জিত হয়, যা অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। পরিবহন খাতে নিয়ন্ত্রণমূলক নীতি, কৌশল এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসৃজন এবং সেবা রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।
অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় পর্যটননীতির সফল বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। আইসিটির ক্ষেত্রে যুগোপযোগী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বিকাশের মাধ্যমে কর্মসৃজন তৈরির বিষয়টি অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় প্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান সরকার গত নির্বাচনি ইশতেহারের ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ নীতি অনুযায়ী নগর ও গ্রামের বৈষম্য ক্রমাগতভাবে দূর করার উদ্দেশ্যে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহ দ্রুত সমাপ্তকরণ, গ্রামীণ প্রবৃদ্ধি কেন্দ্র উন্নয়ন, স্থানীয় পণ্যের বাজার তৈরি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প ও কৃষি ভ্যালু-চেইন প্রতিষ্ঠা এবং ই-কমার্স ব্যবস্থা প্রসারের লক্ষ্যে কৌশল ও কর্মসূচি প্রহণ করা হয়েছে। সরকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০টি বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে যার মাধ্যমে ১ কোটি লোকের কর্মসংস্থান হবে মর্মে আশা করা হচ্ছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এ বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহ সরকার কর্তৃক সঠিকভাবে পরিচালনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিষয়টিতে জোর দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মেয়াদ সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছিল যার বাস্তবায়ন অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মেয়াদে অব্যাহত থাকবে। এর মধ্যে হচ্ছে পদ্মা সেতু প্রকল্প, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র, ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রসহ আরো বেশকিছু প্রকল্প। এ প্রকল্পসমূহের সঠিক বাস্তবায়ন হলে দেশে যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত সুবিধার উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক গতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মেয়াদে মোট ১ কোটি ২৯ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। উক্ত লক্ষ্যমাত্রার আলোকে ২০১৬-২০২০ পরিকল্পনা মেয়াদে ১ কোটি ৯ লাখ অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থান এবং ২০ লাখ বৈদেশিক কর্মসংস্থানের লক্ষ্য স্থির করা হয়েছিল। এ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মোট ৯৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থান (৬০ লাখ) লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অর্জিত না হলেও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের (৩৫ লাখ) ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধিত হয়।