চট্টগ্রামে হঠাৎ করে চালের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। চালের পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও দাম বেড়েই চলছে। গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারি ও খুচরা বাজারে চালের দাম বস্তাপ্রতি ১৫০-২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটরাও বলছেন, বাজারে চালের কোনো সংকট নেই, অথচ দাম বাড়ছে। এদিকে চাক্তাইয়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে টাঙানো চালের মূল্য তালিকা ও বিক্রয়মূল্যে হেরফের পেয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। কারসাজির বিষয়টি প্রমাণ হওয়ায় গত বৃহস্পতিবার বাবুল ট্রেডার্সকে ১০ হাজার টাকা এবং সাদ ট্রেডার্সকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হচ্ছে না। ভ্রাম্যমাণ আদালতের টিম বাজারে গেলে কিছুটা সময় এক ধরনের পরিস্থিতি থাকে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের টিম বাজার থেকে চলে গেলে আবার ব্যবসায়ীরা নিজেদের মতো করে বেশি দামে চাল বিক্রি করেন।
বাজারে পর্যাপ্ত চাল থাকা সত্ত্বেও চালের দাম কেন বাড়তি, তা খুঁজতে গিয়ে জানা যায় এক শ্রেণির অতিলোভী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে চট্টগ্রামে চালের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। সিন্ডিকেটের এই অসাধু চক্র ভাঙতে না পারলে চালের বাজার অস্থিতিশীলই থেকে যাবে। আর এর খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ক্রেতাদের। চালের এই মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে চট্টগ্রামের মিল-মালিক ও ব্যবসায়ীরা একে অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। মিল-মালিকরা বলছেন, সরকার নির্ধারিত দামে পোষাতে না পারায় মিলাররা চাল ছাড়ছেন না। এতে বাজারে দাম বেড়েই যাচ্ছে। অপরদিকে আড়তদারসহ অন্য ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রামে আগামী ৩-৪ মাসের প্রয়োজনীয় চাল মজুত রয়েছে। অথচ অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ে সংশ্লিষ্টরা চালের মজুত ছাড়ছেন না। এদিকে চাল নিয়ে চলমান চালবাজিতে নাভিশ্বাস চরমে উঠেছে সাধারণ ক্রেতাদের। এমন অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছে ভোক্তা ও ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণের বিভিন্ন সংগঠন।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের চালের পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পাইকারিতে ৫০ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা মোটা চালের (আতপ) দাম ১৮২০-১৮৫০ টাকা। ২৯ বেতি চাল বস্তাপ্রতি ১৯০০-১৯৫০ টাকা, ২৮ বেতি ২১০০-২২৫০ টাকা, জিরাশাইল (সিদ্ধ) ২৩০০-২৬০০ টাকা, মিনিকেট আতপ ২৩০০-২৩৫০ টাকা, কাটারিভোগ ২৬০০-৩০০০ টাকা। এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম রাইস মিল-মালিক সমিতির সভাপতি শান্ত দাশগুপ্ত বলেন, বন্যার কারণে নওগাঁ, দিনাজপুর থেকে চাল সংগ্রহ বন্ধ রয়েছে। তাছাড়া সরকার প্রতি কেজি আতপ চাল ৩৫ টাকা এবং সিদ্ধ চাল ৩৬ টাকা মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু মিল থেকে ধান ছাটাই করার পর বিক্রি পর্যন্ত কেজিপ্রতি ৪০-৪১ টাকা পর্যন্ত পড়তা পড়ছে। এ কারণে মিলাররা চাল ছাড়ছেন না। তাছাড়া সরকার শুল্কমুক্ত চাল আমদানির সুযোগ দিলে ব্যবসায়ীরা চাল আমদানি করতে পারবেন। ফলে চালের বাজার স্থিতিশীল হবে।
এ ব্যাপারে খাতুনগঞ্জের পাইকারি চাল ব্যবসায়ী মো. ফজলুল হক বলেন, আড়ত থেকে বেশি মূল্যে চাল কিনতে হচ্ছে। তাই আমাদের কিছু করার নেই। আমরা সীমিত লাভে চাল বিক্রি করছি। এদিকে চালের খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে বেতি চাল কেজি ৪০ টাকা, মিনিকেট কেজি ৪৫ টাকা, পাইজম সিদ্ধ ৫০ টাকা, জিরাশাইল সিদ্ধ ৫৪ টাকা, পাইজার ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
তবে কনজ্যুমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ চট্টগ্রাম সভাপতি নাজের হোসাইন বলেন, জেলা প্রশাসনের সাময়িক ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। প্রশাসনের মনিটরিং আরো জোরদার করতে হবে। তিনি বলেন, আমার জানামতে চট্টগ্রামে কমপক্ষে ৩-৪ মাসের চাল মজুত আছে। তাহলে চালের দাম বাড়বে কেন? কারা বাড়াচ্ছে দাম? প্রশাসনকে ব্যবসায়ী, আড়তদার, মিল-মালিক, ক্রেতাপক্ষ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আলী হাসান বলেন, আমরা অভিযান পরিচালনা করছি। বাজার ঘুরে দেখেছি চালের সংকট নেই। পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তবে আড়তদার ও পাইকারি বিক্রেতাদের দাবি, উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির কারণে নওগাঁ, দিনাজপুরসহ সংশ্লিষ্ট জেলা থেকে চালের সরবরাহ বন্ধ থাকায় দাম বেড়েছে।